মলয়কান্তি মণ্ডল: রানিগঞ্জ
রানিগঞ্জ জামুুড়িয়া কয়লাঞ্চলে দামোদরের অববাহিকায় বয়ে যাওয়া সিঙ্গারণ নদী আজ চরম বিপন্নতার শিকার। ঠিক কী কী কারণে সিঙ্গারণের এমন সংকটজনক অবস্থা?
পরিবেশপ্রেমীরা জানাচ্ছেন, জামুড়িয়া লাগোয়া এলাকায় কারখানার বর্জ্য নদীকে দূষিত করছে। শহরের বিভিন্ন নিকাশি নালার জলও মিশছে এই নদীতে। তার ওপর ধুয়ে যাওয়া মাটি, বালিতেও খাত ভরেছে। অথচ কোনকালেই নদীর খাত সংস্কার বা খনন করে নাব্যতা বাড়ানো চেষ্টা হয়নি।
যে নদীর জলে একসময় কৃষি কাজে সেচের প্রয়োজন মেটাতো, নদীর জল নিত্য ব্যবহার্য ছিল, মৎসজীবীরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো সেই স্রোতস্বিনী সিঙ্গারণ নদী নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায়।
কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অপরাজিত' উপন্যাসে সিঙ্গারণ নদী থেকে কৃষক বধূর জল সংগ্রহের উল্লেখ আছে। কথিত আছে, রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলে ভবানী পাঠক সিঙ্গারণ নদী থেকে স্বচ্ছ জল ব্যবহার করতেন। ভবানী পাঠকের স্মৃতি বিজড়িত সেই নদীই এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে জর্জরিত।
জামুড়িয়ার ইকড়া থেকে দামোদর পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত সিঙ্গারণ নদী তার নাব্যতা হারিয়েছে।
নদীপাড়ের দু’পাশে রয়েছে অনেকগুলি আদিবাসী গ্রাম।আদিবাসী সহ কয়লাঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষের জীবনচর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত এই নদী। বাসিন্দাদের ক্ষোভ, ইকড়া, শেখপুর, ধসল, তপসিগ্রাম লাগোয়া এলাকায় নদীর ধারে তৈরি হওয়া অন্তত ১৪টি স্পঞ্জ আয়রন কারখানা থেকেই মূলত ছড়াচ্ছে দূষণ। তার প্রভাব পড়ছে সিঙ্গারণ নদীতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি কারখানা বর্জ্য ও রাসায়নিক সামগ্রী নদীতে ফেলছে। তা জমে নদীর নাব্যতা এবং স্বাভাবিক গতিপথেও প্রভাব পড়ছে। ইকড়া থেকে তপসিতে নদীর জলের রং লাল হয়ে গিয়েছে। কারখানা গ্রাস করেছে নদী।
কংক্রিটের পাঁচিল তুলে নদীর জমি দখল করছে স্পঞ্জ আয়রন কারখানাগুলি। বাসিন্দাদের ক্ষোভ, দু’শো ফুট চওড়া নদী কুড়ি ফুটের নালায় পরিণত হয়েছে।
কারখানাগুলি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে জল তোলার ফলে লাগোয়া গ্রামের পুকুর, কুয়োর জলস্তর কমে গিয়েছে। আরও অভিযোগ, নদীর নানা জায়গায় ‘ব্যারিকেড’ বানিয়ে ‘বোরহোল’ তৈরি করে জল তুলছে কারখানাগুলি। এমনকি, ইকড়ার অদূরে নীলবনের কাছে নদীতে মাটি ও কারখানার ছাই ফেলে নদীর উপরে দু’টি অস্থায়ী রাস্তা বানানো হয়েছে।
ইসিএল'র এমডিও প্রকল্পের জন্য বরাত পাওয়া একটি বেসরকারি সংস্থার ২৫ বছরের লিজ নিয়ে দু’হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করছে। সেই সংস্থা বেলবাদ-পরাসিয়া এলাকায় জবরদস্তি সিঙ্গারণ নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করছে। বেপরোয়াভাবে অসংখ্য গাছ কেটে ফেলেছে।
প্রশ্ন উঠছে, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের অনুমতি কে দিয়েছে? প্রশাসন নির্বিকার।
নদীপাড়ের বিভিন্ন ইটভাটাও অবৈধভাবে নদীর পাড়ে মাটি ভরাট করে নদীপাড়ের জমি দখল করছে।
ইকড়ায় রবি চাষ প্রায় বন্ধ। ইকড়া, মহিশাবুড়ি, তপসি সহ ছয়টি শ্মশান বিপন্ন। শ্মশান যাত্রীরা শবদাহ করার পরে নদীর জল ব্যবহার করতে পারেন না। নদীর ধারে নীলবন পর্যন্ত শীতকালে পিকনিক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নদী-দূষণের মাত্রায় গভীর উদ্বেগ এলাকায়।
কারখানা মালিকদের হাত থেকে নদী-পরিবেশ-প্রকৃতি বাঁচাতে ২০২৩ সালে কনভেনশন করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘সিঙ্গারণ নদী বাঁচাও কমিটি’। সিঙ্গারণ বাঁচানো এবং পরিবেশ রক্ষার ডাক দিয়ে জামুড়িয়া থেকে অন্ডালের শ্রীরামপুর পর্যন্ত দীর্ঘ পদযাত্রা হয়েছে। রাস্তা অবরোধ, ডেপুটেশন হয়েছে। পথসভা, পথনাটক করে সচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে। সিঙ্গারণ নদী বাঁচাও কমিটির আহ্বায়ক অজিত কোড়া জানান, পরিবেশ রক্ষা করেই উন্নয়ন হোক। নদীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। জেলার ছোট নদীগুলো দামোদর ও অজয় নদীকে পরিপুষ্ট করছে।
জন সচেতনতা গড়ে সাধারণ মানুষকে নদী বাঁচাও আন্দোলনে যুক্ত করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, সর্বভারতীয় নদী বাঁচাও কমিটি সহ স্থানীয় ক্লাব ও সংগঠনগুলি সহযোগিতা করছে।
কোড়া জানান, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে বারবার বিষয়টি নিয়ে তদ্বির করেও লাভ হয়নি। শাসকদলের মদতপুষ্ট প্রভাবশালী শিল্প মহলের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি। প্রকাশ্যে নদী চুরি হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন উদাসীন। নদী বাঁচানোর দাবি উঠলেই ঢেউ ওঠে প্রতিশ্রুতির। প্রতিশ্রুতি পালন না হওয়ায় নদী মরছে নীরবে, নিঃশব্দে।
Comments :0