ক্যালেন্ডারের পাতায় চৈত্র শেষ হতে চললেও হোগলারটারির আকাশে জমাট বাঁধছে আশঙ্কার কালো মেঘ। গত বছরের ৫ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলঢাকার দুকূল ছাপানো বন্যায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা আজও সারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ প্রশাসনিক লাল ফিতের ফাঁসে আটকে থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক হাজার পরিবার। অভিযোগ, রেল দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের টানাপোড়েনে থমকে আছে মেরামতি, আর এর মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সোমবার সকাল থেকেই হোগলারটারি ও সংলগ্ন এলাকার বন্যার্ত মানুষজন নদীপাড়ে জমায়েত হন। রেলের পদস্থ আধিকারিক তথা ডিআরএম’র এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি না আসায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। স্থানীয়দের দাবি, রেল দপ্তর বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ বরাদ্দ করলেও রাজ্য প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণেই কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, জলপাইগুড়ি জেলাশাসকের দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা এনওসি না মেলায় থমকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।
এলাকার বাসিন্দা শম্ভু চরণ মন্ডল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘‘গত বন্যায় ঘরবাড়ি, সর্বস্ব হারিয়েছি। চোখের সামনে আবার বর্ষা আসছে। বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম নেই। রেল বলছে তারা চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু ডিএম সাহেব এনওসি দিচ্ছেন না। কেন কাজ আটকে রাখা হচ্ছে? আমরা কি তবে এবারও ভেসে যাব? সাধারণ মানুষের জীবনের কি কোনো দাম নেই?’’
এলাকাবাসীর এই দুর্দশার পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের ‘টালবাহানা’র বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বামপ্রার্থী নিরঞ্জন রায়। সোমবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তিনি সরাসরি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘‘আজ ডিআরএম’র এখানে এসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল। আমরা বন্যার্তদের নিয়ে জমায়েত হয়েছিলাম যাতে সরাসরি সমস্যার কথা বলা যায়। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে রেল দপ্তর চিঠি দিলেও জেলা প্রশাসন থেকে এনওসি দেওয়া হচ্ছে না। জলপাইগুড়ির জেলাশাসক কেন ফাইল আটকে রেখেছেন, তার জবাব চাই। এনওসি না দেওয়ার অজুহাতে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে। মানুষ বন্যায় ভেসে যাবে আর প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, এটা হতে পারে না।’’ তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে কাজ শুরু না হলে সাধারণ মানুষ বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না হলে প্রয়োজনে রাস্তা ও রেল অবরোধের পথে হাঁটবে বামপন্থী সংগঠনগুলো।
রাজ্য ও রেলের এই দড়ি টানাটানির মাঝে পড়ে এখন ঘর হারানোর আতঙ্কে প্রহর গুনছে জলঢাকা তীরের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা গোপাল রায়, অনাথ মন্ডল, শান্তি মন্ডলদের বক্তব্য, রাজনীতির রং না দেখে দ্রুত নিরাপত্তার স্বার্থে বাঁধ সংস্কার করাই এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। বর্ষার ঢল নামার আগেই যদি ভাঙা বাঁধ মেরামত না হয়, তবে ফের এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সাক্ষী হতে পারে ধূপগুড়ির এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এখন দেখার, নড়েচড়ে বসে কি না প্রশাসন।
Comments :0