গল্প
মুক্তধারা
-------------------------------
কিস্তির জলছাপ
-------------------------------
অয়ন মুখোপাধ্যায়
শালিকাপুরে ভোর আসে চোরের মতো, খুব সাবধানে। অন্ধকার প্রথমে সরে বাঁশবাগান থেকে, তারপর রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলোর চোখের মণি থেকে। নির্মল সর্দার যখন সেকেন্ড শিফট সেরে ফেরেন, আলো তখনও পাড়ায় ঢোকার পারমিশন পায়নি।
এ পাড়ায় সকালের একটা নিজস্ব গিল্ট কমপ্লেক্স আছে। যেন সে জানে, এই জানলাগুলোর ওপারে একদিন মানুষ মুঠো মুঠো স্বপ্ন গুনেছিল, আর আজ সেখানে শুধু শূন্যতা ঝুলে থাকে।
নির্মলের বয়স বাহান্ন। কিন্তু শরীরটা একটা পাবলিক নোটিশ বোর্ড। যেখানে রাগ, সন্দেহ আর প্রতারণার দাগগুলো নীল হয়ে আছে। মার খেলে মানুষের শরীর নিজের থাকে না, সেটা হয়ে যায় পাবলিক প্রোপার্টি।
বাড়ির সামনে রাখা নীল বালতিতে বৃষ্টির জল জমেছে। সেই জলে ভাঙা আকাশের রিফ্লেকশন। নির্মলের মনে হয়, জীবনটাও তো ওই বালতির জল— ওপর থেকে আকাশ দেখা যায়, কিন্তু ভেতরে সবটাই পরের ধার করা ছবি।
ভেতর থেকে স্ত্রী দরজা খুললেন। শব্দহীন। বারো বছরে সংসারের ডিকশনারি বদলে গেছে। এখন সেখানে ভালোবাসার চেয়ে কিস্তি, ঋণের খাতা আর ওষুধের স্ট্রিপ শব্দগুলো বেশি জ্যান্ত।
টেবিলের ওপর চিরধরা স্ক্রিনের পুরোনো স্মার্টফোন। শিরোনামের সবটা নির্মল পড়তে পারেন না, চোখ ঝাপসা। শুধু দুটো শব্দ স্ক্রিন থেকে তীরের মতো ধেয়ে আসে— জামিন আর সুদীপ্ত সেন।
নির্মল ফোনটা উল্টে রাখলেন। বললেন, “তাহলে শেষ মানুষটাও বেরিয়ে গেল।” স্ত্রী জল বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “শেষ মানুষটা? শেষ মানুষটা তো তুমি। যে এখনও কিস্তি শোধ করছ।”
২০১৩-র সেই ব্ল্যাক ফ্রাইডে। নির্মল তখন স্রেফ একজন এজেন্ট ছিলেন না, ছিলেন পাড়ার ভরসা। কারণ বিশ্বাস তো কোনো বড় কাঁচের অফিসে তৈরি হয় না; বিশ্বাস তৈরি হয় চটি পায়ে হেঁটে আসা পরিচিত কাশির শব্দে।
যেদিন স্কিমটা ভাঙল, বিশ্বাসটাও টুকরো হয়ে গেল। পাড়ার মানুষ কোম্পানির মালিককে চিনত না, তারা চিনত নির্মলকে। যে মুখটা কাছে থাকে, থুতুটাও প্রথমে তার ওপরই পড়ে।
তিরিশ লাখ টাকা ধার করে নির্মল কিছু লোকের মুখ বন্ধ করেছিলেন। এখন সেই মহাজনের ছেলে আসে টাকা নিতে। হাতে লেটেস্ট আইফোন, চোখে বরফশীতল হিসেব। সময় বদলেছে, সুদের পলিসি বদলায়নি।
রাজনীতি আসলে মানুষের দুঃখ ছাড়া ডিনার করতে পারে না। তারা দুঃখটাকে একটু চাটনির মতো নেড়েচেড়ে দেখে, ভোট ফুরোলে কাপ-ডিসসহ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।
মেঘলা মণ্ডলদের বাড়িতেও একই গল্প। মেঘলার বাবার রিটায়ারমেন্টের সব টাকা ওই স্কিমের ব্ল্যাক হোলে ঢুকে গেছে। আজও আলমারি খুললে পুরোনো রসিদগুলোর গন্ধে মেঘলার মাথা ধরে যায়। ওর মনে হয়, এই দেশটাই আসলে একটা বিশাল রসিদ। নাগরিকদের শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু ভাঙাতে গেলে দেখা যায় সবটাই ইনভ্যালিড।
তদন্ত, ট্রায়াল, সিবিআই ড্রামা— সবটা এখন একঘেয়ে ওয়েব সিরিজের মতো। মানুষ বুঝে গেছে, এদেশের বিচার ব্যবস্থা একটা অন্তহীন করিডোর। যেখানে করিডোরের শেষে বড়লোকেরা দামি গাড়িতে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়, আর লগ্নিকারীরা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বুড়ো হয়ে যায়।
মেঘলা বলে, “সবই তো ভেসে যায়, তাই না?” নির্মল বলেন, “না। যা ভেসে যায়, তা কপাল। যা ডুবে থাকে, তা মানুষ।” ক্ষত মানুষকে ভাষা শেখায়। এই ভাষাটা ডিকশনারিতে নেই, এটা স্রেফ লস থেকে উঠে আসা।
এই গল্পের কোনো হিরোইক এন্ডিং নেই। কাল ভোরে নির্মল আবার কাজে যাবেন। মহাজনের কিস্তি দেবেন। রাজনীতি আবার নতুন কোনো দুর্নীতির গল্প শোনাবে। পুরনো ক্ষতগুলো গুগল সার্চের দশ নম্বর পেজে চলে যাবে।
শালিকাপুরের অন্ধকার এখনো কাটেনি। নির্মল জানেন, সব নীরবতার পর বিচার আসে না, শুধু আরেকটা সকাল আসে। আর স্মৃতি পকেটে ভরে, মাথা নিচু করে ডিউটিতে যেতে হয়।
জল আর কাদা এক নয়। জল বয়ে যায়। কাদা দাগ রেখে দেয়। নির্মলদের শরীরে সেই কাদার দাগ এখনো শুকোয়নি।
Comments :0