শমীক লাহিড়ী
বি আর আম্বেদকর ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর, ভারতের গণপরিষদে সংবিধানের খসড়া নিয়ে বিতর্কে অংশ নিয়ে বলেছিলেন— "যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— যার অনুপস্থিতিতে এই সংবিধান নিরর্থক হয়ে পড়বে— তবে আমি এই ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ছাড়া অন্য কোনও অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করতে পারব না। এটিই হলো সংবিধানের আত্মা এবং এর হৃদপিণ্ড।" উল্লেখ্য, এই অনুচ্ছেদটি ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার গ্যারান্টি দেয়, যার অন্যতম হলো ভোটাধিকার।
ভারতের গণতন্ত্র আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যে দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা শুরু হয় “We the People” (আমরা ভারতের জনগণ) শব্দবন্ধ দিয়ে, আজ সেই জনগণের প্রধান হাতিয়ার ভোটাধিকার সংশয়ের মুখোমুখি এবং ভোট পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশন— গুরুতর অনাস্থার মুখে। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান উৎসব হিসাবে পরিচিত নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়; এটা এক গভীর আস্থার লড়াই। যদি নাগরিকের মনে এই সন্দেহ দানা বাঁধে যে তাঁকে ধর্ম, ভাষা বা রাজনীতির ভিত্তিতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে তবে গণতন্ত্রের কঙ্কালসার চেহারাটাই বেরিয়ে আসে।
ভোটার তালিকা
৯০,৮৩,৩৪৫— অনেকের কাছেই এটা একটি সংখ্যা মাত্র। কিন্তু যে যোগ্য ভোটদাতাদের নাম এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে, তাদের অবস্থা কী? গত কয়েক মাসে যেভাবে ভোটদাতাদের নাম নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হয়েছে, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন লজ্জাজনক অধ্যায়। এই বিপুল পরিমাণ নাম মূলত দুটি ধাপে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপ খসড়া তালিকা প্রকাশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত তালিকায় প্রায় ৬৩.৬৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত বা অনুপস্থিত ভোটারদের নাম অবশ্যই ছিল। কারণ শাসক তৃণমূলের কৃপায় বহু মানুষের প্রয়াত বাপ-ঠাকুমা এই ভোটার তালিকায় বহাল তবিয়তেই ছিলেন। এই ভূতুড়ে ভোটারের সংখ্যা গড়ে বুথ পিছু অন্তত ৮০ থেকে ১০০। একটা বিধানসভায় যদি ৩০০টি বুথ থাকে, আর তৃণমূল প্রতি বুথে যদি গড়ে ৮০ থেকে ১০০ টি ‘ভুতের ভোট’ ভোট দেয়, তাহলে গণনা শুরুর আগেই বিপক্ষের চাইতে অন্তত ২৪,০০০-৩০,০০০ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকতো। ফলে ভোটার তালিকার ঝাড়াইবাছাই অত্যন্ত জরুরি ছিলই। প্রশ্ন হলো— এই বিপুল পরিমাণ 'ভূতুড়ে ভোটার' ১৪ বছর ধরে তালিকায় বহাল তবিয়তে থাকল কী করে?
এই কাজ এতদিন না করার দায়ভার দেশের নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। আর সঙ্গে কাঠগড়ায় অবশ্যই উঠবে তৃণমূল পরিচালিত রাজ্য সরকারের একাংশের আধিকারিকদের। বিএলও, মহকুমা শাসক, জেলা শাসক এমনকি মুখ্য সচিব পর্যন্ত প্রশাসনিক আধিকারিকরা শাসক দলের অনুগত কর্মীর মতো কাজ করেছে। প্রতি বুথে এই বিপুল সংখ্যক মৃত মানুষের নাম তালিকায় রেখে 'ভূতের ভোট' তৃণমূল দিয়ে এসেছে, তা আজ প্রমাণিত।
দ্বিতীয় ধাপ হলো বিচার বিভাগীয় স্ক্রুটিনি বা Adjudication। প্রায় ৬০.০৬ লক্ষ নামকে ‘সন্দেহজনক’ বা ‘অমীমাংসিত’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ৭ এপ্রিল ২০২৬-এর তালিকা অনুযায়ী, বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের স্ক্রুটিনির পর আরও ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে বাদ দেওয়া হয়েছে। স্ক্রুটিনির নামে চলল 'অপারেশন ছাঁটাই', যার নিশানা মূলত দরিদ্র প্রান্তিক মানুষ। তৃণমূলের 'ভূতুড়ে ভোটার' রোখার নামে নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরা যাদের 'অযোগ্য' ঘোষণা করলেন, তাদের পরিচয় কী? কেন এই কোপ মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা এবং নির্দিষ্ট বিধানসভা আসন টার্গেট করে দেওয়া হলো?
গণতন্ত্র না রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ হলো একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। সদ্য প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় পদ্ধতিগত ত্রুটি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার, বিশেষ করে দরিদ্র, সংখ্যালঘু, মতুয়া সহ অন্যান্য দলিত এবং আদিবাসী সম্প্রদায়কেই মূলত লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একদিকে শাসক দল তৃণমূলের বিরুদ্ধে 'ভূতুড়ে ভোটার' পোষার অভিযোগ, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সংস্থার 'অ্যাডজুডিকেশন'-এর নামে বৈধ ভোটার ছাঁটাই — মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষ। তালিকায় স্বচ্ছতা আনার নাম করে আসলে বিজেপি শাসিত কেন্দ্রের এজেন্ডাকেই বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। নথিপত্রের সামান্য ত্রুটি বা নামের বানানে ভুল থাকার অজুহাতে যেভাবে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে 'সন্দেহজনক' তালিকায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে অলিখিত এনআরসি’র প্রথম ধাপ। জন্মসনদ নেই বা পৈতৃক ভিটের দলিল নেই বলে একজন আদিবাসী, দলিত বা সংখ্যালঘু মানুষকে তার জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কি গণতন্ত্র; নাকি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস?
সাংবিধানিক অবমাননা ও বিভাজনের রাজনীতি
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর ‘ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে দেশছাড়া করার’ হুমকি সংবিধানের প্রকাশ্য অবমাননা। ভোটার তালিকা কোনও চূড়ান্ত নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়; প্রশাসনিক ত্রুটির দায় নাগরিকের ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁকে অ-নাগরিক বলা যায় না। এর থেকেও উদ্বেগজনক, তাঁরই এক চেলা আরও একধাপ এগিয়ে এদের ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়েছে। প্রশ্ন হলো— কে নির্ধারণ করবে কে দেশপ্রেমী - সংবিধান, না আরএসএস-বিজেপি?
দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেই দিয়েছে, ‘ট্রাইব্যুনাল যাদের নাম ছাড় দেবে নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত, তাদের সকলকে এই নির্বাচনেই ভোটাধিকার দিতে হবে’। এই রায়কে অগ্রাহ্য করে এই ধরনের হুমকি প্রমাণ করে, ওদের কাছে সংবিধান নয়, শাসকের ইচ্ছাই শেষ কথা হয়ে উঠছে। আরএসএস-বিজেপি’র এই ঘৃণ্য রাজনীতি নাগরিকত্বকে আইনি অধিকারের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যে নামিয়ে আনছে।
মেরুদণ্ডহীন বশংবদ
ভারতের নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বাংলার ব্লক লেবেল অফিসার থেকে শুরু করে জেলাশাসক— রাজ্য সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তর আজ তৃণমূলীয় রাজনীতির রঙে রাঙানো। ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা কাটার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের বদলে তারা বেশি গুরুত্ব দেন স্থানীয় তৃণমূল নেতার 'নির্দেশ'কে। বিগত ১৪ বছর এই গরমিল চলাকালীন নির্বাচন কমিশনই নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল আর এখন নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নাগরিক জানতে পারছেন না কেন তার নাম বাদ দেওয়া হলো। এ আসলে গরিব উচ্ছেদের সুপরিকল্পিত নকশা।
'কাগজ' বনাম 'মানুষ'
যে মানুষটা এই মাটিতে চাষ করছে, কলকারখানায় ঘাম ঝরাচ্ছে, তাকে আজ নিজের দেশের ভোটার হতে গেলে শাসক দলকে কেন সন্তুষ্ট করতে হবে? ডিজিটাল ইন্ডিয়ার দোহাই দিয়ে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু একজন নাগরিক জানতে পারছেন না কেন তার নাম বাদ গেল! এ আসলে গরিব উচ্ছেদের এক সুপরিকল্পিত নকশা। যার টাকা আছে, সে নথি জোগাড় করবে; কিন্তু যে সংখ্যালঘু শ্রমিক বা আদিবাসী অথবা দলিত কৃষক কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে থাকে, তার নাম 'অনুপস্থিত' দেখিয়ে নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে যায়, তাদের নাগরিকত্ব বা দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না; প্রশ্ন ওঠে কেবল সেই সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে! আশ্চর্য কী বিচিত্র ভারতবর্ষ তৈরি করছে আরএসএস-বিজেপি!
ভোটার তালিকা নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার শেষ কোথায়? একদিকে তৃণমূলের 'ভূতুড়ে ভোটারের' রাজনীতি, অন্যদিকে বিজেপি’র 'নাগরিকত্ব' কেড়ে নেওয়ার রাজনীতি— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলায় ২০২৬-এর নির্বাচন কি আদৌ অবাধ হবে? রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিককে চিনতে অস্বীকার করে, তখন সেই রাষ্ট্র আর 'গণতান্ত্রিক' থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি 'ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র'।
আজ যার নাম তালিকায় নেই, কাল তার ভিটেও থাকবে না— অমিত শাহ্ প্রকাশ্যেই এই ক্রোনোলজির কথা বলেছেন। তাই এই লড়াই কেবল ভোটাধিকারের নয়, এই লড়াই অস্তিত্বের। এই রাষ্ট্র কি কেবল শাসক আর অতি ধনীদের, নাকি আমাদেরও? জবাব না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন থামতে পারে না।
২০২৪ সালের নির্বাচনে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের ফলাফল ও পরিসংখ্যানগত গরমিল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশে 'মধ্যরাতের ম্যাজিক'
অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে চন্দ্রবাবু নাইডুর জোটের বিপুল জয় নিয়ে প্রশ্ন নেই, কিন্তু ভোটের শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তা রীতিমতো রোমহর্ষক। বিজেপি সরকারের বর্তমান অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের স্বামী এবং অর্থনীতিবিদ পারাকালা প্রভাকর যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা মারাত্মক। ভোট শেষ হওয়ার সময় অর্থাৎ বিকেল ৫ টায় যেখানে ভোটদানের হার ছিল ৬৮.০৪ শতাংশ, কয়েকদিন পর চূড়ান্ত হিসাবে দাঁড়ায় ৮১.৭৯ শতাংশ। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,
সময় ভোটদানের হার
বিকেল ৫টা- ৬৮.০৪ শতাংশ
রাত ৮টা - ৬৮.১২ শতাংশ
রাত ১১:৪৫ - ৭৬.৫০ শতাংশ
চূড়ান্ত - ৮১.৭৯ শতাংশ
অর্থাৎ ভোটের নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টায় শেষ হওয়ার পরে ভোটদানের হার ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়।
রাত ৮টা থেকে ২টো’র মধ্যে প্রায় ৫২ লক্ষ ভোটদান রেকর্ড হয়েছে, তার মধ্যে মধ্যরাতের পরেই প্রায় ১৭ লক্ষ ভোট পড়েছে। প্রায় ৩,৫০০ বুথে রাত ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলেছে। মোট ভোটের প্রায় ৪.১৬ শতাংশ পড়েছে রাত ১১:৪৫ থেকে রাত ২ টোর মধ্যে। আর এই নির্বাচনে শাসক জোট টিডিপি-বিজেপি-জন সেনা জোটের সঙ্গে বিরোধী ওয়াই এস আর কংগ্রেস দলের মধ্যে মোট পর্যাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিল ৫৩.৭ লক্ষ। এই তথ্যগুলো দেখে যে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই জাগে— ভোট শেষ হওয়ার পরে মধ্যরাতে পড়া ভোট, আর শাসক ও বিরোধী দলের পর্যাপ্ত ভোটের সংখ্যা প্রায় একই কেন?
ইভিএমে একটি ভোট সম্পন্ন হতে গড়ে ১০–১৫ সেকেন্ড সময় লাগে, বোতাম চাপা এবং রিসেটের সময় সহ। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ভোটের হার দাঁড়াচ্ছে প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি ভোট পড়েছে সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে। যদি ইভিএম রিসেট হতে ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে, তাহলে কি প্রতি ৫ সেকেন্ডে একটা করে ভোট পড়েছে? একজন ভোটা্রের ঢোকা, ভোটার কার্ড দেখানো, তালিকায় নাম খুঁজে বের করা, হাতে কালি লাগানো – এতগুলো কাজ মাত্র ৫/৬ সেকেন্ডে করা সম্ভব? এটাই আগামীর জন্য অশনি সংকেত!
মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়েছিল। ইভিএম-এ পড়া ভোট এবং গণনাকৃত ভোটের মধ্যে ৫ লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধান কেন ছিল? যখন বিরোধী দলগুলো ১০০ শতাংশ ভিভিপ্যাট (Voter Verifiable Paper Audit Trail) স্লিপ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছিল, তখন নির্বাচন কমিশন কেন তা মানতে রাজি নয়? বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেখানে প্রযুক্তির ঝুঁকি এড়িয়ে পুনরায় ব্যালট পেপারে ফিরে গেছে, সেখানে ভারত কেন ইভিএম এবং বিশেষ করে ভিভিপ্যাট স্লিপ গণনায় এত অনীহা দেখাচ্ছে? প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের মাত্র ৫টি বুথের ভিভিপ্যাট মেলানো কি বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট? যদি পদ্ধতিটি স্বচ্ছই হয়, তবে ১০০ শতাংশ স্লিপ মেলাতে কয়েক ঘণ্টা দেরি হলে গণতন্ত্রের কী এমন ক্ষতি হবে?
গণতন্ত্রের নীরব মৃত্যু
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাতত্ত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো 'বিশ্বাস'। ভোটারের বিশ্বাস, ‘আমি যাকে ভোট দিচ্ছি, সেই ভোটটা পাবে।’প্রার্থীর বিশ্বাস, ‘সবার জন্য সমান সুযোগই থাকবে।‘ পরাজিতের বিশ্বাস, ‘হারলেও প্রক্রিয়াটি সঠিক ছিল।’ এটি মনে করিয়ে দেয় যে, ভোটের বাক্স হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি প্রক্রিয়া মাত্র, কিন্তু তার দর্শন লুকিয়ে আছে, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধায়।
আজ ভারতের রাজনীতিতে এই তিন স্তরের আস্থার ভিতই ভেঙে পড়ছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর অতি-সক্রিয়তা এবং নির্বাচন কমিশনের রহস্যময় একপেশে কার্যকলাপ প্রমাণ করেছে, শাসক দল বিজেপি’কে খুশি করতেই তারা বেশী আগ্রহী।
সমাধানের পথ, চাই সংস্কার
গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে কেবল অভিযোগ করলেই হবে না, প্রয়োজন আমূল সংস্কার।
রিয়েল-টাইম ট্রান্সপারেন্সি— ভোটগ্রহণের প্রতি ঘণ্টায় বুথ ভিত্তিক তথ্য ডিজিটাল পোর্টালে আপলোড করলে সাধারণ মানুষ সরাসরি দেখতে পাবে।
ভিভিপ্যাট গণনা— ১০০ শতাংশ ভিভিপ্যাট স্লিপ গণনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে সময় কয়েক ঘণ্টা বেশি লাগলেও মানুষের আস্থা অটুট থাকবে।
কমিশনের নিয়োগে স্বচ্ছতা— নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগ এবং বিরোধী দলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কমিশন কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হয়ে না পড়ে।
তথ্য যাচাই: ভোটগ্রহণ শেষে এবং গণনার আগে যদি বাড়তি ভোট দেখা যায়, তার একটি যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা কমিশনকে দিতে হবে।
প্রশ্ন তোলাই নাগরিকের ধর্ম
ভারতের গণতন্ত্র আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তথ্য গোপনের আড়ালে যদি জনগণের রায়কে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
মাঝিই যদি নৌকা ডোবায়— তাহলে সেই নৌকার হাল যাত্রীদেরই ধরতে হয়। গণতন্ত্র মানে, কেবল পাঁচ বছর অন্তর বোতাম টেপা নয়; গণতন্ত্র টিকে থাকার শর্তই হলো প্রতিটি মুহূর্তে সরকারকে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। মনে রাখতে হবে, শাসকের শক্তি অসীম হতে পারে, কিন্তু সেই শক্তির উৎস হলো জনগণের একটি ভোট। সেই ভোটের অধিকার রক্ষা না পেলে গণতান্ত্রিক ভারতের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। প্রশ্ন তোলা বন্ধ করবেন না, কারণ যেদিন প্রশ্ন তোলা বন্ধ হবে, সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটবে।
প্রশ্নই গণতন্ত্রের প্রাণভ্রমরা; আর পারস্পরিক আস্থাই তার ভিত্তি।
Highlights
ভারতের গণতন্ত্র আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তথ্য গোপনের আড়ালে যদি জনগণের রায়কে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
Post Editorial
রাষ্ট্র তুমি কার?
×
Comments :0