Potato farmers cricis

উদাসীন প্রশাসন, শেষ সম্বল বন্দক দিয়ে চাষ করেও মেলেনি আলুর দাম

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

রক্তে ভেজা ধূপগুড়ির মাটি, সহায় সম্বলহীন কৃষকের একমাত্র ভরসা লালঝান্ডাই

উত্তরবঙ্গের অন্যতম শস্যভাণ্ডার ধূপগুড়িতে আজ হাহাকার। যে মাটির বুক চিরে সোনালি আলু গোলায় ওঠার কথা ছিল, সেই মাটি আজ কৃষকের চোখের জলে ভিজছে। একদিকে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা, অন্যদিকে রাজ্য সরকারের চরম অমানবিক উদাসীনতা—এই দুই সাঁড়াশি পীড়নে পিষ্ট হয়ে ধূপগুড়ির প্রান্তিক চাষিরা আজ দিশেহারা। পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ যে, ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে ঋণের দায়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অন্নদাতারা। সম্প্রতি গধেয়ারকুঠির এক প্রান্তিক কৃষকের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এই পচনশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক চরম ধিক্কার।
চলতি মরসুমে যখন আলু তোলার সময় এল, ঠিক তখনই ধেয়ে এল অসময়ের বৃষ্টি। বিঘার পর বিঘা জমির আলু মাঠেই পচে নষ্ট হল। আর যেটুকু রক্ষা করা গিয়েছিল, বাজারে তার কোনও দাম নেই। খোলা বাজারে আলুর যা দর, তাতে চাষের খরচ ওঠানো তো দুরস্ত, বস্তার দাম মেটানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ চাষের মরসুমে সার ও বীজের কালোবাজারির জেরে কৃষকদের চড়া সুদে মহাজন ও ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হয়েছিল। আজ মাঠভরা আলু পড়ে থাকলেও তা কেনার লোক নেই।
চাষের খরচ জোগাতে ধূপগুড়ির হাজার হাজার কৃষক সমবায় ব্যাংক বা বেসরকারি সংস্থা থেকে লোন নিয়েছিলেন। অনেকেই স্ত্রীর শেষ সম্বল বিয়ের গয়নাটুকু বন্ধক রেখেছিলেন ‘গোল্ড লোন’-এর আশায়। একটি বেসরকারি ব্যাংকের গোল্ড লোন বিভাগের আধিকারিক অরিজিৎ সরকারের দেওয়া তথ্য রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। গত বছর মার্চ মাসে যেখানে ৭০-৭৫ শতাংশ স্বর্ণ ঋণ পরিশোধ হয়েছিল, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ২০-২৫ শতাংশে। তথ্য বলছে, শুধুমাত্র একটি সংস্থা থেকেই কৃষকরা কোটি টাকার ওপর স্বর্ণ ঋণ নিয়েছিলেন। অথচ এখন মাত্র ৩০ শতাংশ গ্রাহক সেই বন্ধকি সোনা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য দেখাচ্ছেন। ধূপগুড়ির প্রত্যন্ত গ্রামে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে যন্ত্রণার গোঙানি—মায়ের হাতের শেষ স্মৃতিটুকুও আজ ব্যাংকের সিন্দুকে বন্দি।
এই চরম সংকটের মুহূর্তে ধূপগুড়ির মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বামফ্রন্ট। এদিন নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মানুষের ক্ষোভ ও কান্নার সাক্ষী হলেন বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায়। সাধারণ কৃষকরা প্রার্থীকে কাছে পেয়ে নিজেদের অসহায়তার কথা তুলে ধরেন এবং একমাত্র বামপন্থীদেরই তাদের পাশে থাকার আর্জি জানান। কৃষকদের ক্ষোভের জবাবে নিরঞ্জন রায় বলেন, "বিপর্যয়ের আগে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল সরকার ৯ টাকা ৫০ পয়সা দরে আলু কিনবে। কিন্তু বাস্তবে সেই কেনাবেচার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। আলু পচে নষ্ট হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিমার টাকা কৃষকদের হাতে পৌঁছায়নি। সরকার শুধু উৎসব আর মেলায় ব্যস্ত, আর ওদিকে ধূপগুড়ির কৃষকরা অভাবী বিক্রির চোটে সপরিবারে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা এই অপদার্থ সরকারের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই চালাব।"
সারা ভারত কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল বলেন, "চাষিদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। সরকার আলু কেনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কেবল কাগজ-কলমেই থেকে গিয়েছে। কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকায় ফড়ে ও বড় ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিচ্ছে। আমরা অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে আলু ক্রয় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক প্যাকেজের দাবি জানাচ্ছি।"
কৃষি উন্নয়ন সমিতি বা সমবায় থেকেও বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন কৃষকরা। এক রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের ম্যানেজার অর্ণব বিশ্বাস কৃষকদের অবস্থার কথা স্বীকার করে সামান্য লেনদেন বজায় রাখার পরামর্শ দিলেও, রিক্ত কৃষকের হাতে সেই ন্যূনতম অর্থটুকুও নেই। কৃষিপ্রধান ধূপগুড়িতে আজ হাহাকার, অথচ নবান্ন উৎসবের রঙে মগ্ন। এমতাবস্থায় গ্রামের মেঠো পথে লালঝান্ডাই এখন কৃষকের একমাত্র আশ্রয়ের স্থল। লড়াইয়ের শপথ নিয়ে কৃষকরা আজ বলছেন, এই বঞ্চনার জবাব তাঁরা ব্যালট বক্সেই দেবেন।

Comments :0

Login to leave a comment