প্রায় এক যুগ পেরিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠির জবাব পায়নি সিঙ্গুর।
সেই তিনি, নরেন্দ্র মোদীর রবিবার আসার কথা সিঙ্গুরে। সভায় ভাষণ দেওয়ার কথা তাঁর। ইতিমধ্যেই মঞ্চ বাঁধার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিজেপি’র নেতারা প্রচার করছেন যে, তারা টাটাকে ফিরিয়ে আনবেন। সিঙ্গুরে কারখানা গড়বেন। সনাতন দাসের বক্তব্য, ‘‘অনেক রাজনীতি দেখেছি আমরা। ঠকেছি। আজ চাষও হয় না। কারখানাও হয়নি।’’ সেখ জিয়ারুল হকের কথায়, ‘‘আজ কেন, লকেট চ্যাটার্জি এমপি হওয়ার আগেও তো বলেছিল যে, বিজেপি শিল্প করবে সিঙ্গুরে। তৃণমূল তো জমিই ফেরত দিতে পারেনি ১৫ বছরে। সব ভাঁওতা। কিছু করার চেষ্টা ওই বুদ্ধবাবুর সময়েই যা হয়েছিল।’’ প্রসঙ্গত, ২০১৯-এর ৯ জুলাই লোকসভায় হুগলীর তৎকালীন বিজেপি সাংসদ লকেট চ্যাটার্জির একটি প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রকের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী রামেশ্বর তেলি জানিয়ে দেন,‘সিঙ্গুর টাটা ন্যানো প্ল্যান্ট’র জমিতে কোনও শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেই।
অর্থাৎ বিজেপি কখনোই সিঙ্গুরে কারখানার কথা ভাবেনি। রাজ্য থেকে বেশ কয়েকটি লোকসভার আসনে জেতার পরেও সিঙ্গুর নিয়ে মোদীর কোনও ‘ভাবনা’র চিহ্ন দেখা যায়নি।
এই সিঙ্গুর থেকে অনেক আশা নিয়ে চিঠি লেখা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। দিনটি ছিল ২০১৪’র ২৮জুলাই। ‘সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ ও উন্নয়ন কমিটি’র পক্ষ থেকে সেই চিঠিতে সিঙ্গুরের সেই ৯৯৭.১১ একর জমিতে শিল্পের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। সেই কমিটি তখন কোনও রেজিস্টার্ড সংস্থা ছিল না। এখন তা রেজিস্ট্রিকৃত। এখন কমিটির নাম ‘সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ কমিটি।’ তবে সেদিনও যিনি কমিটির সভাপতি ছিলেন, আজও তিনি সভাপতি। তিনি ডা. উদয়ন দাস। শুক্রবার তিনি জানালেন, ‘‘আমরা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল এবং প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি। তিনি প্রশাসনকে বলেছিলেন আমাদের চিঠির বিষয়ে খোঁজ নিতে। তারপর আমরা কমিটির রেজিস্ট্রি করি।’’
প্রধানমন্ত্রী কী করেছিলেন? উদয়ন দাস বলেন, ‘‘আমরা তাঁর সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিলাম। বিজেপি’র নেতাদের কাছেও সেই উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করেছিলাম। তাঁরা আমাদের বিজেপি-তে যোগ দিতে বলেন। কিন্তু আমরা তা করিনি। আমরা সিঙ্গুরে শিল্প চেয়েছিলাম। আজও তাই চাই।’’
নরেন্দ্র মোদী দেখা করেননি। চিঠির এক লাইন জবাব পাঠাননি। অথচ মোদীর কথাই সিঙ্গুরের ওই বাসিন্দাদের চিঠি লিখতে প্ররোচিত করেছিল। ২০১৪-র এপ্রিলে একটি ইংরাজি সংবাদপত্রে নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। সাক্ষাৎকারে মোদী জানিয়েছিলেন, ‘‘এখন, যখন আমি গুজরাটের বাইরে এসে সারা দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, আমার সিঙ্গুরের জন্যও একটি ভাবনা আছে।’’ সিঙ্গুরে যে কারখানা হওয়ার কথা ছিল, মমতা ব্যানার্জির ‘আন্দোলনে’র ধাক্কাতেই তা গুজরাটের সানন্দে নিয়ে গিয়েছিলেন রতন টাটা। গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদীই। সেই মোদীর ‘সিঙ্গুরের জন্যও একটি ভাবনা আছে’ পড়ে ‘সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ ও উন্নয়ন কমিটি’ চিঠি লেখে নরেন্দ্র মোদীকে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর।
নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রায় ১১বছর ৭ মাস পেরিয়েছে। সিঙ্গুরের সেই চিঠির জবাব আজও আসেনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। আগামী রবিবার সেই সিঙ্গুরেই সভা করার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।
সিঙ্গুরে শিল্পের সঙ্গে বিজেপি’র একটি যোগাযোগ আছে। ২০০৬-র ৪ ডিসেম্বর ধর্মতলায় মমতা ব্যানার্জি ধর্না শুরু করেছিলেন সিঙ্গুরে কারখানার উদ্যোগের বিরুদ্ধে। সেদিনই মঞ্চে এসেছিলেন বিজেপি’র তৎকালীন সভাপতি রাজনাথ সিং। সেদিনই বিকাল ৪টের পর ‘অনশন’ শুরু করেন তৃণমূল নেত্রী। বিজেপি সিঙ্গুর থেকে কারখানা তাড়ানোর আন্দোলনে মমতা ব্যানার্জির সহায়ক ছিল। রাজনাথ সিং সেই সহায়তার কথা জানিয়েওছিলেন।
সিঙ্গুরের ‘শিল্প বিকাশ কমিটি’র সদস্যরা এদিন জানান যে, তাঁদের চিঠিতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করে পদক্ষেপের আবেদনও ছিল। রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে কিছু হোক, তা তাঁরা চাননি। কেন তাঁরা এমন ভেবেছিলেন? কারন, ২০১৪ ফেব্রুয়ারিতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন,‘‘বাংলার মানুষ দুটো লাড্ডু পাবেন। এখানে বসে দিদি উন্নয়ন করবেন, আর দিল্লি থেকে আমি উন্নয়ন করবো বাংলার।’’ কিন্তু সিঙ্গুরের জন্য, কাজের জন্য বিজেপি কিংবা তৃণমূল—দু’দলই কিছু করেনি।
সিঙ্গুর তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা ব্যানার্জির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেরও সাক্ষী।
বামফ্রন্ট তৎকালীন পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বিধানসভায় প্রশ্ন করেছিলেন সিঙ্গুর নিয়ে ২০১৯-র জুলাইয়ে। ১০ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জবাবে স্পষ্ট হয়ে যায় সিঙ্গুরের হাল। সিঙ্গুরের জমিকে চাষযোগ্য করে জমিদাতাদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিধানসভায় মমতা ব্যানার্জি জানান, ‘‘চাষের দিক থেকে কোনও অসুবিধা নেই। সার, বীজ, কিষান মান্ডি, একস্ট্রা রেশন, মান্থলি টাকা, সরকার সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে। তারা যদি চাষ না করে আমি কী করতে পারি?’’ চাষের জন্য সরকারি খরচে মাটি পরীক্ষা হয়েছে। জমিদাতাদের ১০ হাজার টাকা এককালীন দেওয়া হয়েছিল। বীজ, সার চাষের জন্য যন্ত্রপাতি, সব তুলে দেওয়ার পরও কৃষিকাজে উৎসাহ দেখায়নি সিঙ্গুরের কৃষক।
গত কয়েকদিন সেই জমিই আবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছে প্রশাসন। আবার সিঙ্গুরে ‘চাষ হচ্ছে’ দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গুর-দর্শন উপলক্ষে।
২০১৬-র ৩১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গুরের কারখানার জন্য অধিগৃহীত ৯৯৭.১১ একর জমির পুরোটা কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ ছিল জমি ‘আগের অবস্থায়’ ফিরিয়ে দিতে হবে বারো সপ্তাহের মধ্যে। অর্থাৎ তিন মাস দেওয়া হয়েছিল সময়। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক যে জমিতে কারখানার নির্মাণ, যে জমিতে রাস্তা সহ অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরির কাজ হয়ে গিয়েছিল, সেই জমিকেই ‘আগের অবস্থায়’ বানানোর কাজ করতে হবে রাজ্য সরকারকে।
‘আগের অবস্থায়’ মানে কী? প্রকল্প এলাকায় জমি ছিল সেখ জিয়ারুল হকের। তাঁর বক্তব্য, ‘আগের অবস্থায়’ বলতে তো চাষযোগ্যই বোঝায়। জমি চাষযোগ্য, এই কথা বলেই তো মমতা ব্যানার্জি কারখানা আটকেছিলেন। কিন্তু জমিতে তো চাষ করতে পারছি না। প্রকল্প এলাকায় আমার ১০কাঠা জমি পড়ে আছে। শুধু কাগজ দিয়েছে। জমি চিহ্নিত করে দেয়নি। সেখানে এখন জঞ্জাল।’’
Modi Singur
মোদীকে এক যুগ আগে চিঠি লেখা সিঙ্গুরের কাছে আজ ‘সব ভাঁওতা’
×
Comments :0