Trump Greenland

ট্রাম্পের গ্রিন স্বপ্ন

সম্পাদকীয় বিভাগ

দ্বিতীয়বারের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পাবার পর মধ্যযুগীয় পরাক্রমশালী সম্রাটের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোরকম রাখঢাক না রেখে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন কানাডাকে তিনি আমেরিকার ৫১তম প্রদেশ হিসাবে দেখতে চান। অর্থাৎ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বিশ্বের সাত উন্নত দেশের (জি-৭) অন্যতম কানাডাকে তিনি আর আলাদা দেশ হিসাবে মানতে চান না। কানাডা দখল করে নিয়ে তিনি তাকে আমেরিকার সঙ্গে জুড়ে দেবেন। কানাডা শাসিত হবে ওয়াশিংটন থেকে। ট্রাম্পের সাম্রাজ্য বিস্তা‍‌রের সেই ঔপনিবেশিক যুগের ধ্যানধারণার প্রভাব শুধু কানাডাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর গলায় একই রকম সুর ধ্বনিত হয়েছিল মেক্সিকোকে ঘিরেও। উত্তরের প্রতিবেশী কানাডা এবং দক্ষিণের প্রতিবেশী মেক্সিকোকে দখল করে তিনি সমগ্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশকেই মার্কিন সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সঙ্গে হুমকি দিয়েছিলেন পানামাকে তারা যদি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করে তাহলে পানামা খাল দখল নিয়ে নেবে আমেরিকা। তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল গ্রিনল্যান্ড দখলের স্বপ্নও।
মাঝখানে শুল্ক আগ্রাসন নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন কিছুটা ফিকে হয়ে যায়। তাছাড়া রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে কবজা করতে এবং গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যাকে বৈধতা দেবার জন্য তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে এদিকটা বেশি নজর দিতে পারেননি। তাছাড়া শুল্ক যুদ্ধে চীনকে কোণঠাসা করা নিয়েও তিনি বেজায় উদ্বেগে ছিলেন।
হালে নতুন করে তার মনে হয়েছে সাম্রাজ্য দখলের কাজে ফের নামা উচিত। আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দাপট দেখাতে হলে তার সমরশক্তির প্রদর্শন জরুরি। যুদ্ধ ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। গত শতাব্দীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার খেয়ে এবং চলতি শতাব্দীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধে ব্যর্থ হবার পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন নতুন করে বড় কোনও যুদ্ধে জড়াবার সাহস পাচ্ছে না। তাছাড়া মার্কিন অর্থনীতি যেখানে এসে ঠেকেছে তাতে বড়সড় যুদ্ধের মূল্য চোকাতে গিয়ে ভয়াবহ সঙ্কট অনিবার্য। এই অবস্থায় বিশ্ব শ্রেষ্ঠের ঠাঁটবাট বজায় রাখতে আমেরিকা মুখে হুমকি কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প ফাঁপা আমেরিকাকেই বিশ্বের দরবারে অপরাজেয় মহা শক্তিমান হিসাবে জাহির করতে চাইছেন।
এই পর্বে তিনি নতুন করে গ্রিনল্যান্ড দখলে মরিয়া হয়েছেন। এখন তিনি গ্রিনল্যান্ডকেই আমেরিকার ৫১তম প্রদেশ বানাতে চান। উত্তর মেরু অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ চিরতুষারাবৃত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধী‍‌নে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ট্রাম্পের  কুনজর কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই দ্বীপে। চীন-রাশিয়া দ্বীপটি দখল করতে পারে এই আশঙ্কার গল্প বানিয়ে তিনি সেটা দখলের বৈধতা দাবি করছেন। আসল লক্ষ্য অবশ্য বিপুল মজুত খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিরল ধাতু এই অফুরন্ত সম্পদের দখল নিতেই ট্রাম্পের মাথায় দখলদারির লোভ তীব্র হয়েছে। কিন্তু তাতে সাম্রাজ্যবাদী বন্ধু ইউরোপের সঙ্গে বিচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেনা নামিয়ে জোর করে দখল করতে গেলে সামরিক সংঘাত অনিবার্য। অর্থাৎ ন্যাটো সদস্য দুই দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। ট্রাম্প সেনা পাঠানোর হুমকি দেওয়ায় ডেনমার্ক সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে। ইউরোপের অন্য অনেক দেশ ডেনমার্কের পাশে। সাম্রাজ্যবাদের ঘরেই এখন যুদ্ধের দামামা বাজছে। পুঁজিবাদের সঙ্কট সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে যে তীব্রতর করছে এটা তারই প্রমাণ।

Comments :0

Login to leave a comment