দিল্লিতে সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় দপ্তর একেজি ভবনে পুলিশের অভিযান ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বুধবার রাজ্যসভায় দাবি করেছেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ। বিরোধীরা অযথা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রং দিচ্ছে এবং চাঞ্চল্য তৈরি করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বুধবার রাজ্যসভায় সিপিআই(এম)’র সাংসদ জন ব্রিটাস একেজি ভবনে পুলিশের অভিযানের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের একটি দল এসএফআই-এর দিল্লির রাজ্য সম্পাদক তথা প্রাক্তন জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি ঐশী ঘোষ-কে ২০২১ এর একটি পুরনো মামলার সূত্র ধরে আটক করার উদ্দেশ্যে একেজি ভবনে পৌঁছায় বলে অভিযোগ। সেই সময় সিপিআই(এম) নেতাদের সঙ্গে পুলিশের তর্কাতর্কি হয়। শেষ পর্যন্ত ঐশীকে আটক না করেই পুলিশ সেখান থেকে ফিরে যায়।
ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্যসভায় নাড্ডা বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত পরিস্থিতি। শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই পুলিশ পদক্ষেপ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনও ছাত্র যদি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তাকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি, পুলিশ সম্পূর্ণ আইন মেনেই কাজ করেছে। এই ঘটনাকে বিরোধীরা অকারণে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে সিপিআই(এম)’র অভিযোগ, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে ঐশী ঘোষের ভূমিকার জেরেই এই পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দলের দাবি, একটি পুরনো মামলাকে সামনে রেখে ছাত্রনেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।
এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে মঙ্গলবার বিকালে সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর এ কে জি ভবনে হানা দেয় দিল্লি পুলিশ। যন্তর মন্তরের ছাত্র আন্দোলনের জেরে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসাবেই এসএফআই’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায় দিল্লি পুলিশ বলে অভিযোগ। কিন্তু কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে, তা স্পষ্টভাবে জানাতে পারে না পুলিশ। কিন্তু সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ স্পষ্টই জানিয়ে দেন, কোনও সরকারি নথি বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। খবর পেয়ে এ কে জি ভবনে তড়িঘড়ি পৌঁছান সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস। পার্টি নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তার না করেই চলে যেতে বাধ্য হয় দিল্লি পুলিশ। বস্তুত, সুপ্রিম কোর্ট যন্তর মন্তর আন্দোলনের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দিয়েছিল, তাই কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি পুলিশকে একটি পুরানো মামলা ফের সামনে এনে ঐশীকে তিহার জেলে বন্দি করার ফাঁদ পেতেছিল। পার্টি দপ্তরে দিল্লি পুলিশের এই অবৈধ প্রবেশের চেষ্টাকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক বিরোধিতার ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে অভিযোগ করেছে সিপিআই(এম)।
এদিন বিকালে সরকারি নয়, একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে কয়েকজন দিল্লি পুলিশ বলে পরিচয় দিয়ে এ কে জি ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে। সাদা পোশাকে এসেছিলেন কয়েকজন, এমনকি নামফলকও ছিল না জামায়। মহিলাও ছিলেন। কেন গ্রেপ্তার করা হবে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা খুব স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। শুধু জানান, ২০২১ সালের একটি মামলায় তাঁরা ঐশীকে গ্রেপ্তার করতে এসেছেন। এই সময় সাংসদ ব্রিটাস তাঁদের নথিপত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত পুলিশকর্মীদের তর্কাতর্কি করতে দেখা যায়। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, নিয়মকানুন না মেনে একটি জাতীয় দলের সদর দপ্তরে হানা দেওয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে। ব্রিটাস সেই অফিসারকে জিজ্ঞাসা করেন, যিনি আদালতের আদেশ কার্যকর করতে এসেছেন, তাঁর ইউনিফর্ম এবং নেমপ্লেট কোথায়? অফিসার দাবি করেন, বৃষ্টি এবং ভিড়ের কারণে তিনি তাঁর ইউনিফর্ম পরতে পারেননি। এরপর, সেই অফিসার এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ অফিসাররা বিব্রত হয়ে রণে ভঙ্গ দেন।
এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ঐশীকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে, এই খবর শুনে দিল্লির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রী ও দলীয় কর্মীরা একেজি ভবনে ভিড় জমান।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে বাংলা ভবন অভিমুখী ছাত্র মিছিল সংক্রান্ত একটি মামলায় পাতিয়ালা হাউস কোর্ট ১৫ এপ্রিল ঐশী ঘোষের বিরুদ্ধে একটি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কয়েক মাস পরেও, এই বিষয়ে তাঁকে কোনও সমন বা নোটিশ দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার যখন আদালতে মামলাটির পুনরায় শুনানি হওয়ার কথা ছিল, তখন দিল্লি পুলিশ মঙ্গলবার সকালে তাঁকে ফোন করে পরোয়ানার বিষয়ে জানায়। ঐশী জবাবে জানান যে, বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে তিনি হাজিরা দেবেন এবং অবিলম্বে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করবেন। তবে, এর পরেও দিল্লি পুলিশ পার্টির সদর দপ্তরে গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করে।
ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় সিপিআই(এম)। পার্টির সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এক বিবৃতিতে জানান, ‘এ কে জি ভবনে এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে দিল্লি পুলিশের অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ওপর এক বিপজ্জনক আঘাত। একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে পুলিশ সেখানে আসে। তাদের মধ্যে কয়েকজন সদস্য সাদা পোশাকে এসেছিলেন। সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিটাস এবং অন্যান্য পার্টিকর্মীরা দৃঢ়ভাবে বাধা দিয়ে তাদের এই বেআইনি পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানালে পুলিশ শেষ পর্যন্ত বিফল হয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এও জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরে ঐশী ঘোষের ওপর লাগাতার নজরদারি চালানো হচ্ছিল, যা ছাত্রনেতাদের ভয় দেখানোর একটি প্রকাশ্য অপচেষ্টারই প্রমাণ। গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের কৌশলের কোনও জায়গা নেই। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির জবাব দেওয়ার পরিবর্তে মোদী সরকার পুলিশকে ব্যবহার করে ভিন্নমতকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে।’ এই ভয় দেখানোর রাজনীতির তীব্র ভাষায় নিন্দা করার পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি পুনরায় জানিয়েছে সিপিআই(এম)। গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের প্রতিটি অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও জানিয়েছেন বেবি।
CPIM
সিপিআই(এম) দপ্তরে পুলিশের অভিযানে বিতর্ক, ‘আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পদক্ষেপ’ বলে দাবি জে পি নাড্ডার
×
Comments :0