Cooch Behar

কোচবিহার: বরাদ্দ বাড়েনি ৮ বছর, রোগীর পাতের পুষ্টি উধাও

জেলা

মাথাভাঙা মহকুমা হাসপাতালে।

জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙ্গা
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর সাড়ে বারোটা। বৃহস্পতিবার মাথাভাঙা মহকুমা হাসপাতালে রোগীদের লাঞ্চ দিচ্ছেন ঠিকাদারের লোকেরা। জলের মত ডাল, সবজি ছোট্ট মাছের টুকরো আর ভাত! খাবার দেখেই বোঝা যায় এতে আর যাই থাকুক পুষ্টি উধাও! মিড-ডে মিলের নাম মাত্র বরাদ্দ দিয়ে পড়ুয়াদের পাতে পুষ্টি দেবার কেন্দ্র ও রাজ্যের পরিকল্পনা নিয়ে এ রাজ্যে কম সমালোচনা হয় নি, কিন্তু সবার অলক্ষ্যেই রয়ে গেছে সরকারি হাসপাতালে রোগী পিছু নাম মাত্র বরাদ্দে কি করে পুষ্টি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে? আদৌ কি রোগীর পুষ্টি মেলে এই নাম মাত্র বরাদ্দে?
বরাত পাওয়া ঠিকাদারের লোকেরা বলছেন, রোগী পিছু প্রতিদিন বরাদ্দ মাত্র ৫৬ টাকা ৬৪ পয়সা! আর তাতেই দিতে হয় তিনবেলার খাবার! সেই সামান্য বরাদ্দ থেকে আবার বরাত পাওয়া ঠিকাদারকে লাভের অংক খুঁজে নিতে হয়! ফলে হাসপাতালে রোগীদের বরাদ্দ হওয়া দুধে জল, নাকি জলে দুধ বোঝা দুস্কর! আবার ভাতের সাথে দেওয়া ডাল যেন হলুদ মেশানো জল ছাড়া কিছুই নয়। মাছের টুকরোর সাইজ দেখলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। রোগীর জন্য বরাদ্দ কলার সাইজ দেখলে ভিমরি খাবার জোগাড়। তবে এভাবেই চলছে বছরের পর বছর  রোগীদের পুষ্টি নিয়ে তামাশা! জেলা- মহকুমা আর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রোগীদের খাবারের মান বাস্তবেই কহতব্য নয়।
এতদিন রাজ্য জুড়ে দান- খয়রাতি চলেছে দেদার। হাল ফেরে নি রোগীর খাবারের। সরকার বদলেছে। নতুন সরকারের আমলে রোগীর পাতের তিনবেলার খাবারের চিরচেনা দৈন্যতা কি ঘুঁচবে আদৌ! জিজ্ঞাসা রোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্য এমনকি বরাত পাওয়া ঠিকাদারদের। ঠিকাদারের লোকেরা বলছেন, সাধ্যমত চেষ্টা করি ভালো খাবার দিতে। গ্যাস কিনতে হচ্ছে কালোবাজারিতে। মাসে ৯ টা গ্যাস সিলিন্ডার লাগে। রেট না বাড়ালে চালানোই দুস্কর। আসলেই মিড ডে মিলের খাবার যদিও বা শিক্ষকেরা মুখে দিতে পারেন কিন্তু হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবার কোন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্তা মুখে তুলতে পারবে না সেটা হলফ করেই বলা যায়।
মহকুমা হাসপাতালের ঠিকাদারের কথা মিথ্যে নয়, স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রেই জানা গেছে ২০১৮ সালে খাবারের জন্য রোগী পিছু বরাদ্দ হয়েছিল ৫৬ টাকা ৬৪ পয়সা। তারপর অতিমারি এসেছে। বাড়ে নি বরাদ্দ। এরপর ২০২৩ এ নতুন দরপত্র ডাকা হয়েছিল। কিন্তু পরে ২০২৫ সাল অব্দি পুরনো বরাদ্দই রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর খাবার সরবরাহকারী এজেন্সীগুলির একাংশ মামলা করে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য। তারপর আর কিছুই হয় নি। বরাদ্দ বাড়ে নি এক টাকাও!
একনজরে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক, রোগীদের জন্য খাদ্য তালিকাটা ঠিক কিরকম? মেডিকেল কলেজ থেকে সব স্তরের হাসপাতালের মেনু একই। সকালে তিন/চার পিস পাউরুটি, একটা সেদ্ধ ডিম, ২০০ মিলিলিটার দুধ ও কলা, দুপুরের মেনুতে ভাত, ডাল,সবজি, এক পিস মাছ, সপ্তাহে অন্তত দুদিন দুপিস করে চিকেন। আর রাতে ভাত /রুটি, ডাল, সবজি, ডিম। এই মেনু পাতে দিতে গেলে খাবার সরবরাহকারী সংস্থার দশা কি হবে সেটা বোঝাই যায়। ফলে রোগীর পাত থেকে উধাও হচ্ছে পুষ্টি। মাংসের বালাই নেই অনেক হাসপাতালেই। কোথাও বা একদিন দুদিন পাতে পড়ে দু পিস চিকেন। রাজ্যের অধিকাংশ হাসপাতালেই নেই ডায়েটিশিয়ান। ফলে কে ভাত আর কে রুটি খাবে সেটাও ঠিক হয় আন্দাজেই। অধিকাংশ হাসপাতালেই গরম খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে ঠান্ডা খাবারই দিতে বাধ্য হয় বরাত পাওয়া ঠিকাদারের লোকেরা। শীতকালে যা সত্যিই কষ্টের।
মাথাভাঙা মহকুমা হাসপাতালের রান্নাঘর বেশ ঝা চকচকে! কিন্তু রান্না ঘরের পাশেই জমে আছে নোংরা জল। যা পরিবেশকে করছে অস্বাস্থ্যকর। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। সরকার আসে, সরকার চলেও যায়। হাল ফেরে না রোগীদের তিনবেলার খাবারের গুনগত মানের। হাসপাতালের সুপার ডাঃ সৈকত দাস সবে কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি বললেন, দেখছি ড্রেনের বিষয়ে কি করা যায়। তবে খাবারের মান নিয়ে তিনি কিছুই বলতে রাজি হননি। তার কথায়,‘‘আমরা নজর রাখি উপস্থিত রোগীরা প্রত্যেকে খাবার পেল কিনা।’’ আসলেই বরাদ্দ না বাড়লে রোগীর পাতে পুষ্টি ফেরা অসম্ভব।

Comments :0

Login to leave a comment