গল্প
দাম
অভীক চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২৬ জুলাই ২০২৬
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে সেদিন সুমন দেখে একটি মেয়ে তার ছোট্ট একরত্তি বাচ্চাকে নিয়ে ঝলমলে আলো লাগানো বেলুন বিক্রি করছে। সাধারণত সে এই সব উপেক্ষা করেই এগিয়ে যায়, কিন্তু সেদিন, হঠাৎ কী মনে করে, দাঁড়ায় সে। জিজ্ঞেস করে বেলুনের দাম। মেয়েটি একটু ইতস্ততঃ করে বলে একশবিশ ভাইয়া। সুমন বলে, দিদি একশ তে দিয়ে দিন। সে আবার একটু ইতস্ততঃ করে কিছু একটা স্বগতোক্তি করে বলে, ঠিক আছে, দিন। বিজয় গর্বে গর্বিত সুমন তাকে একশ টাকা দিয়ে সেই বেলুন কিনে বাড়ি ফিরে আসে।
এপর্যন্ত গল্পে কোনো অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। হয়তো নেইও। পথচলতি এমন ঘটনা আঁখচার ঘটে।তবে, কেনো এই ঘটনার অবতারণা? কারণ,একটা স্বগতোক্তি, একটা সমর্পণ অথবা একটা দীর্ঘশ্বাস।
"দিজিয়ে ,খানা ভি খরিদনা হ্যায়। " এটুকুই ছিল সেই স্বগতোক্তি। অর্থাৎ সুমনের দেওয়া সেই একশ টাকায় সে ও তার একরত্তি রাতের খাবার পাবে। কিন্তু সে সেই কথাটি ওকে বলেনি, বা হয়তো বলতে আত্ম মর্যাদায় লেগেছে। হাজার হোক, মা তো!তবে মনের সে কথা দীর্ঘশ্বাসে শব্দ পেয়েছে হয়তো তার অজান্তেই।
এত গেলো মুদ্রার এক পিঠ। অন্য দিকে সুমন যখন সেই বেলুন বাড়ি নিয়ে আসে, তার কন্যার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে যায়। তবে সেই ঝলমলে বেলুনখানার আয়ু মেরে কেটে পাঁচ মিনিটের বেশি নয়। তারপর সেই বেলুন হয়ে যায় এক অচল খেলনা।
এখন প্রশ্ন হলো দাম চুকল কিসের? ছোট্ট কন্যার মুখের পাঁচ মিনিটের হাসির? নাকি এক মা ও তার সন্তানের রাতের পেট ভরা খাবারের। দুটোর দাম কি এক? সত্যিই কি আমরা দাম চুকাতে পারি? দাম কি হয় সব কিছুর? দাম হয় সেই মেয়েটির ইতস্ততঃ করা চোখের ,নাকি দাম হয় সেই ছোট্ট শিশুটির ক্ষুধার্ত কান্নার? আমাদের জানা নেই। কারণ সব ঝলমলে বেলুনের পেছনের রূঢ় অন্ধকার সবার নজরে আসে না যে!
কিন্তু সে দামের দরদস্তুর করতে আমরা ছাড়ি না। যখনই মেয়েটি দাম বলে একশ কুড়ি, আমাদের প্রশ্ন তাকে আক্রমণ করে, একশতে দিয়ে দিন। কেনো জানেন? কারণ মেয়েটি গরীব বলে। কারণ সে দুর্বল। তাকে চাপ দিলে সে অবস্থার কাছে নিরুপায় হয়ে দাম কমিয়ে দেবে বলে। কারণ আমরা সমাজের পিরামিডে তার চেয়ে অনেক ওপরে থাকি বলে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা জারার শোরুমে গেলে একটা পাঁচ হাজারের জামা কিনে আনি 50% ডিসকাউন্টে, কিন্তু রাস্তার পাশ থেকে দুশো টাকার জামায় পঞ্চাশ টাকা বেশি নিচ্ছে মনে করে দোকানিকে গালমন্দ করি। অদ্ভুত এই একুশে আইনেই আমরা চলেছি রোজ দিন। আর তো কয়েক মাস। তারপর জগন্ময়ী আসবেন বাপের বাড়ি। আপনিও সেই আনন্দ ভাগ করে নেবেন বৌ বাচ্চা প্রিয়জনদের সাথে। কিন্তু আর এক জগন্ময়ী তখনও অনিশ্চিত মুখে পথে পথে প্যারামবুলেটরে বেলুন বেচে বেড়াবে তার ছোট্ট একরত্তিকে নিয়ে। আর তারই পেছনে জ্বলজ্বল করবে জারা শো রুমের 50% ডিসকাউন্ট। আপনার হাসি মাখা মুখ ব্যাগ ভরা জামা নিয়ে বেরিয়ে আসবে অচিরেই।শুধু খেয়াল রাখবেন অর্থবস্থা যাই হোক, উৎসব সবার।
Comments :0