কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি
‘‘দেশ বাঁচাতে হলে লালঝান্ডাকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। একসময় সবাই বলেছিল ‘লাল হটাও দেশ বাঁচাও’। তখন শুভেন্দু আর মমতা এককাট্টা ছিলেন। লাল হটেছে ঠিকই, কিন্তু দেশ আজ চরম বিপন্ন। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে নয়া ফ্যাসিবাদী চক্রান্ত শুরু হয়েছে, তাকে রুখতে বামপন্থীদের জয়ী করা আজ সময়ের দাবি।’’ বুধবার ধূপগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায়ের সমর্থনে গাদং ক্লাব মোড়ে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় এই ভাষাতেই শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
এদিনের জনসভায় উপচে পড়া ভিড়ে সেলিম মনে করিয়ে দেন বামফ্রন্ট আমলের সোনালী দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকার চেয়েছিল একশো শতাংশ এনরোলমেন্ট। মানুষের হাতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নতুন নতুন স্কুল, মাদ্রাসা, আর বৃত্তিশিক্ষা কেন্দ্র গড়া হয়েছিল। আর আজ ছবিটা ঠিক উলটো। তৃণমূল ও বিজেপির যোগসাজশে স্কুল-মাদ্রাসা সব বন্ধ হতে বসেছে। বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করে বলছে স্কুল আলাদা, মাদ্রাসা আলাদা, কিন্তু আখেরে ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদেরই। বাম মানেই শিক্ষার প্রসার, আর তৃণমূল-বিজেপি মানেই অন্ধকারের দিকে যাত্র।’’
রাজ্যের বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে সেলিম বলেন, ‘‘বামফ্রন্ট আমলে গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পরিচালন সমিতিতে নিয়মিত নির্বাচন হতো। আজ সেই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করলেই বামপন্থীদের জেলে পাঠানো হচ্ছে, সাজানো হচ্ছে মিথ্যা মামলা।’’ কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে বিঁধে তিনি বলেন, ‘‘ওরা বলছে ৬ মাসে শূন্যপদ পূরণ করবে। ১২ বছর তো কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে, কটা নিয়োগের বিজ্ঞাপন আপনারা দেখেছেন? উলটে সেনাতেও এখন লটারির মতো চুক্তিতে ‘অগ্নিবীর’ নিয়োগ হচ্ছে।’’ ধূপগুড়ির সিপিআই(এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায়ের লড়াকু মানসিকতার কথা উল্লেখ করে রাজ্য সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য জিয়াউল আলম বলেন,‘‘বিপদের দিনে যাকে পাশে পাওয়া যায়, সেই তো আসল জনপ্রতিনিধি। গত নভেম্বরে জলঢাকার বন্যায় হোগলারটারির মানুষ যখন সর্বস্ব হারিয়েছিলেন, নিরঞ্জন রায় তিন মাস সেখানে কমিউনিটি কিচেন চালিয়ে মানুষের অন্ন জুগিয়েছেন। এই ত্যাগী ও যোগ্য মানুষকে বিধানসভায় পাঠানো মানেই সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা।’’
জনসভায় ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সভাপতি গোবিন্দ রায় বলেন, ‘‘বাংলার যুবক আজ ভিনরাজ্যে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছে। প্রতিদিন মা-বোনেদের ওপর অত্যাচার আর লুঠপাট চলছে। তৃণমূল আর বিজেপি এখন মিলেমিশে একাকার। কাল যে তৃণমূল ছিল, আজ সে বিজেপি প্রার্থী! ওরা শুধু হিন্দু-মুসলমান নয়, জাতিসত্তার নামেও বিভাজনের বিষ ছড়াচ্ছে।’’
ধূপগুড়ির জনসভায় প্রার্থীদের নিয়ে মহম্মদ সেলিম।
জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্র কৃষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘‘বাম জমানায় সরকার সরাসরি ফসল কিনত। আজ আলুর দাম নেই, কোল্ড স্টোরেজের সামনে কৃষকের কান্না। তৃণমূল চুরি করছে আর বিজেপি কেন্দ্রীয় প্রকল্প বন্ধ করে গরিবকে ভাতে মারছে। আমাদের দাবি স্পষ্ট- গ্রামে ২০০ দিনের কাজ এবং ৬০০ টাকা মজুরি দিতে হবে।’’
মহম্মদ সেলিম তাঁর ভাষণে আরও বলেন, ‘‘কোচবিহার থেকে শুরু হওয়া ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ আজ সারা রাজ্যের মানুষের মধ্যে সাহসের সঞ্চার করেছে। নবান্নের চোরদের হটাতে কোনো ‘৫৬ ইঞ্চি’ বা ‘৩৫৬ ধারা’র প্রয়োজন নেই, মানুষের ঐক্যবদ্ধ জোটই যথেষ্ট। তৃণমূল আসলে আরএসএস-র রোবট। বাংলার মাটিতে লালঝান্ডাকে নিকেশ করতে আরএসএস এই তৃণমূলকে নামিয়েছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। মানুষ আজ নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝছেন, লালঝান্ডাই তাঁদের আসল রক্ষাক।’’
এদিন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সেলিম। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন আজ ‘নির্যাতন কমিশনে’ পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম রাখা নিয়ে মানুষকে মহকুমা ও জেলা শাসকের দপ্তরে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। নোটবন্দির পর এবার ‘ভোটবন্দি’র মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে। বামপন্থীরা ক্ষমতায় এলে প্রত্যেক প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকায় নিশ্চিত করা হবে।’’
প্রার্থী নিরঞ্জন রায় তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘‘গত ১৫ বছরে এরাজ্যে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য- সব আজ লুণ্ঠিত। এই পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতিকে আড়াল করতেই সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিচ্ছে বিজেপি। এই মেকি লড়াইয়ের মুখোশ খুলে রুটি-রুজির লড়াইকে সফল করতে হবে।’’
এদিনের জনসভায় ছিলেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সলিল আচার্য, জেলা কমিটির সদস্য প্রাণ গোপাল ভাওয়াল, মমতা রায়, মুকুলেশ রায় সরকার সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সভাপতিত্ব করেন তুষার বসু। সমাবেশ শেষে ধূপগুড়ির রাজপথ লালঝান্ডার মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে, যা আগামী দিনের পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী।
Comments :0