ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে করা অমিত শাহের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করলো সিপিআই(এম)। গতকাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মন্তব্য করেছেন, ভারতের ১৯৬৯ সালে সিপিআই(এম) বা সিপিআই তৈরি হয়। দেশের উন্নতি বা দেশের মানুষের উন্নতির কোন লক্ষ তাদের ছিল না। তাদের লক্ষ ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের সংসদীয় ব্যবস্থাকে শেষ করার।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের বিরোধীতা করে এক্সহ্যান্ডেলে সিপিআই(এম) এর পক্ষ থেকে লেখা হয়েছে, ‘মিথ্যা প্রচার বন্ধ হোক। ১৯৬৪ সালে তৈরি হয়েছে সিপিআই(এম)। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির যেই অগ্রণী ভূমিকা তাকে মাথায় রেখে তৈরি হয় দল। প্রথম থেকেই সংসদে এবং রাস্তার আন্দোলনে মানুষের কথা তুলে ধরেছে সিপিআই(এম)। বিজেপিকে কটাক্ষ করে পোস্টে লেখা হয়েছে, যারা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমান সময় দেশের সংবিধানের ওপর আঘাত নামিয়ে এনেছে তাদের থেকে কোন সার্টিফিকেটের দরকার পরে না।
উল্লেখ্য ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আরএসএস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করেছিল। তাদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিল তারা। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের কোন ভূমিকা নেই। অন্যদিকে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্ফর আহমেদ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে, এস.এ ডাঙ্গে এবং নলিনী দাশগুপ্তকে জেলে থাকতে হয়েছে। পরবর্তী সময় একাধিক স্বাধীনতা সংগ্রামী যুক্ত হয়েছেন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে। ১৯২৮ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে কমিউনিস্টরাই প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার কথা তোলে। যা সমর্থন করেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।
উল্লেখ্য পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থা করে গ্রামের গরীব মানুষের হাতে যেই ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল তা গোটা বিশ্বে সমাদৃত। ১৯৪৬-৪৭ সালে তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে। রাজ্যে অপারেশন বর্গা গরিব কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিল জমির অধিকার। উদ্বাস্তু মানুষ পেয়েছিল জমির দলিল। আজ সেই কৃষককে কৃষি বিলের মাধ্যে জমি হারা করতে চাইছে মোদী সরকার। এসআইআর করে মানুষকে বেনাগরিক করতে চাইছে তারা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ করেছেন সিপিআই সাধারণ সম্পাদক ডি রাজাও। তিনি লিখেছেন, ‘‘লোকসভায় অমিত শাহের মন্তব্য ইতিহাসকে স্রেফ হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্তরে নামিয়ে এনেছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে রাশিয়ার কমিউনিসট পার্টির শাখা হিসেবে উল্লেখ করা কেবল বেঠিকই নয়, ইতিহাস সম্পর্কে অচেতনতাও।’’
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য বেয়ে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন রাজা। সেই সঙ্গে বলেছেন, ‘‘আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠার আগেই কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ব্রিটিশ ভারতে জেলবন্দি হয়েছেন। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধে তাঁদের বন্দি করা হয় জেলে। আরএসএস এমন কোনও উদাহরণ হাজির করতে পারবে কি?’’
শহীদ ভগৎ সিং, সূর্য সেন থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের নেতা সোহন সিং ভাখনা, শ্রমিক আন্দোলনের পত্তনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এম সিঙ্গারভেলুর মতো ব্যক্তিত্বের উল্লেখ করেছেন রাজা। তিনি বলেছেন, ‘‘হ্যাঁ এটা ঠিক যে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব দুনিয়াজুড়ে উপনিবেশের দেশগুলিতে জাতীয় মুক্তির আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রশ্নের চিন্তার রসদ জুগিয়েছিল। কমিউনিস্ট মতাদর্শে শানিত স্বাধীনতা সংগ্রামীরা প্রাণ দিয়েছেন। ব্রিটিশ ভারতে সেই সংগ্রামকে অপমান করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী।’’
রাজা আরএসএস’র বিদেশি যোগসূত্রের উল্লেখ করেছেন বিশদে। বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে বিএস মউঞ্জের যোগাযোগ, হিটলারের প্রতি এম এস গোলওয়ালকরের প্রশংসা মনে করিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘‘আরএসএস’র প্রথম সাধারণ সম্পাদক বালাজী হুদ্দর হেডগেওয়ারের ব্রিটিশ ভজনায় বিরক্ত হয়ে শেষে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।‘‘ রাজা বলেছেন, যে আরএসএস বিদেশি যোগসূত্র খুঁজে বের করতে সদা ব্যস্ত তারাই কর্পোরেটের স্বার্থে বিদেশি প্রভুদের দাসত্ব করে। তিনি বলেছেন আর এসএস-বিজেপি’র রাজনীতির কারণেই দেশে আদিবাসীরা ভূমিচ্যুত হচ্ছেন, অতি দক্ষিণপন্থী উগ্রপন্থা হিংস্র আক্রমণ নামিয়ে আনছে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হচ্ছে, পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে সহ নাগরিকদের। তিনি বলেন, সংসদ তথ্য দিয়ে আলোচনার জায়গা, নিজেদের পছন্দমতো প্রচার করার জায়গা নয়।
উল্লেখ্য, গত সোমবার লোকসভায় মাওবাদী দমন প্রসঙ্গে ভাষণ দেন শাহ। ৩১ মার্চের মধ্যে ‘নকশাল মুক্ত ভারত’-র ঘোষণা করেন।
Comments :0