সঞ্জয় পূততণ্ডু
স্বাধীন দেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কাজ চলছে। তবুও চলছে তীব্র খাদ্য সঙ্কট। তার উপর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির আঘাত। স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি। অপ্রাপ্তি থেকে অতৃপ্তি— ক্রমশ ক্ষোভ। সংযুক্ত বামপন্থী ফ্রন্টের ডাকে তিন মাসব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি চলছে। বর্ষার শেষে খাদ্য সঙ্কট তীব্রতর। জুন মাসে সফল সাধারণ ধর্মঘটের পরে, আগস্টের প্রথমে সমস্ত জেলার আইন অমান্যের কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হলো। দ্বিতীয় পর্যায়ে, ২০ আগস্ট থেকে কর্মসূচি চলছে। এ পর্যায় শেষ হওয়ার আগেই রাজ্যের সর্বত্র বামপন্থী নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার। ১৮ আগস্ট বসুমতি লিখছে, ১৫ জন বামপন্থী বিধায়ক গ্রেপ্তার। নিরঞ্জন সেন, বিনয় চৌধুরি, ভবানী সেন, গণেশ ঘোষ, মনোরঞ্জন রায়, সমর মুখার্জি, বিশ্বনাথ মুখার্জি, রবীন মুখার্জি, গোপাল বসু, যতীন চক্রবর্তী, নীরেন ঘোষ, প্রশান্ত শূর প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। ১৯ আগস্ট রাতে কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য দপ্তরে পুলিশ তল্লাশি করে। জ্যোতি বসু ও চিত্ত বসুর বাড়িতে রাতে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ তাদের পায়নি। জ্যোতি বসু পার্টির কর্মসূচি পালনে মণিপুর-আসামে গিয়েছিলেন। সাংবাদিকরা তাঁকে বিষয়টিতে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘বিনা বিচারে আটক করার জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হইয়াছে। অবশ্য আমি বার বার সরকারি নির্দেশ অমান্যকারী খাদ্য চোরদিগকে এবং উহাদের পৃষ্ঠপোষক মন্ত্রী শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে গ্রেপ্তার করার আবেদন জানাইয়া বিফল হইয়াছি।’’ ২৭ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে; রাজ্যে গ্রেপ্তার ৬৪০৮ জন। সকলেই নিবর্তনমূলক আটক আইনে (বিনা বিচারে) গ্রেপ্তার। অন্যান্য আন্দোলনের মতো অনেক নেতাই আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন সংগঠিত করছিলেন।
রক্তাক্ত ঐ দিনটিতে
মনুমেন্ট (বর্তমান শহীদ মিনার) ময়দানের বিরাট সমাবেশ শেষ। মিছিল এগিয়ে চলেছে আইন অমান্যে। কার্জন পার্ক পর্যন্ত পৌঁছাবার পর গ্রেপ্তার হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রেপ্তার নয়, সরাসরি আক্রমণ— আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ধর্মতলা চত্বরে। ইতিহাস সৃষ্টি— লাঠিপেটা করেই ৮০টি প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো। পরের দিন ১ সেপ্টেম্বর ছাত্র মিছিল। যুগান্তর লিখছে; ‘‘মিছিলের সম্মুখভাগ ডাঃ রায়ের বাড়ি (মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়) ছাড়াইয়া গেলে একদল পুলিশ প্রিন্সেপ স্ট্রিট হইতে বাহির হইয়া আসিয়া মিছিলটি তাড়া করে লাঠি চালাইতে চালাইতে ছাত্রদের পিছু ধাওয়া করে।’’ ঐ দিন রাত ৯টায় ঘরের দরজা বন্ধ করার সময় বউবাজার স্ট্রিটের সুধাকর মণ্ডল এবং তার পুত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
ব্রিটিশ আশ্রিত জমিদার-মজুতদারদের দৌরাত্ম্যেই চলত খাদ্য সঙ্কট। স্বাধীন দেশে এরা সকলেই কংগ্রেস নেতা। অনেকেই বিধায়ক, এমনকি মন্ত্রী। বামফ্রন্ট সরকার জমিদারি ব্যবস্থায় চরম আঘাত হানে। মজুতদার খাদ্য মজুত করার সাহস পেত না। বর্তমানের শাসক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় ফড়ে, এমনকি নেতা-কর্মীদের আদায়ের বোঝা বইতে হচ্ছে রাজ্যবাসীকে। আজ বণ্টিত জমি কেড়ে নেবার উদ্যোগ রুখতে আন্দোলন করতে হচ্ছে। কৃষি ও কৃষকের সর্বনাশ করতে কৃষিতে দেশি-বিদেশি মালিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ চলছে।
মূল্যবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি
’৫০-এর দশকের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আজ বিপরীত পথে। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে ব্যক্তি পুঁজির মালিকানায়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পারস্পরিক ভরতুকি ব্যবস্থায় গরিবের সহায়তা ছিল। আজ সরকারের উৎপন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করে মালিকরা লুটছে বিপুল মুনাফা। স্বাধীনতার পরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ করের অনুপাত ছিল ৮৭% এবং ১৩%। আজ সে অনুপাত বিপরীত অবস্থানে। বিপুল পরিমাণ পরোক্ষ করের বোঝা চাপছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উপর। সে বোঝা বইতে হচ্ছে জনগণকে। বিপরীতে ধনীরা ছাড় পেয়ে বিপুল সম্পদে স্ফীত হচ্ছে। তাই প্রত্যক্ষভাবে ধনীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সম্পদের স্ফীতি ঘটে চলেছে। তাই মানব উন্নয়ন রিপোর্টে ১৭৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১২৭তম। বুভুক্ষার তালিকায় ১২৭টি দেশের মধ্যে আমাদের স্থান ১০৫তম। প্রতিবেশী অধিকাংশ দেশের অবস্থান আমাদের উপরে।
ফলে খাদ্য ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্কট আজ তীব্রতর হয়েছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শিথিল করে নগ্নরূপে বৃহৎ মালিকদের সেবার ফলেই দেশবাসীর জীবন যন্ত্রণা। তাই দেশব্যাপী প্রকাশিত হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ। রাজ্যে ধর্মঘট নয়— ৯ জুলাই গোটা দেশই অচল হয়েছে।
Comments :0