মুক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
গল্প
শিউলি ফুলের ঘ্রাণ
ঊর্বশী সরকার
১৭ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
প্রতিবছর দুর্গাপূজা এলেই শিখার এই রোগ শুরু হয়। কীসের রোগ! বাড়ির সবাই বলে, শিখার ঢং। বাড়িতে আত্মীয়রা এলে যাতে কিছু করতে না- হয়, তার জন্য এরকম নাটক শুরু করে।
শিখা কয়েকদিন থেকে খায় না, ইচ্ছে হলে একমুঠো মুড়ি, নইলে আগের রাতের জল দেওয়া ভাত। একমাস বিছানায় পড়ে থাকে, সংসারের টুকিটাকি কাজ করে ঠিকই, কিন্তু মন দিয়ে করে না, সারাদিন উদাস উদাস ভাব। ওকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে সবাই, মনের ভাব এই, শিখা নকশা করার আর সময় পায় না, যত্তসব বেয়াদপি।
বাড়ির সবাই, শিউলির বাবাও, ঠাকুর দেখতে বেরোয়, ছোটো দুইমেয়ে সাথে নিজের ঠাকুমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সবার পরনে নতুন কাপড়, শিখাকেও দেয়।
ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে গেলে, শিখা উঠোনের কোণে শিউলি ফুল গাছটার নীচে এসে বসে, কুঁড়িগুলো একটু একটু ফুটছে, তার গন্ধে ম- ম করছে চারদিক, শিখা একাকী এইসময়ে সেই ফুলের ঘ্রাণ নেয় বুক ভরে, ঘনঘন নিশ্বাস টেনে নেয়, বুকটা মাঝে মাঝে ধকধক করে,চোখ বন্ধ করে দেখতে পায়, ওই দূর থেকে খেতের আল দিয়ে শিউলি দৌড়ে দৌড়ে আসছে, আর বলছে, এই যে শিউলি ফুলের চারা নিয়ে এসেছি, আসছে বছর থেকে এর ফুল দিয়েই অঞ্জলি দিতে পারব। নিজের হাতেই উঠোনের কোণে লাগিয়ে নেয় সাতবছরের শিউলি।
শিউলিগাছটার বয়স এখন এগারো বছর, শিউলি সেই বিকেলে পড়শিদের সঙ্গে যে পুজোর ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল আর ফেরেনি। দুদিন পর ওর ছিন্নভিন্ন দেহটা পাওয়া গেছিল ধানখেতের আলে।
কি করে হল, কারা করল, কেউ জানে না। সরকার ক্ষতিপূরণ দিল শিউলির বাবাকে একটা চাকরি দিয়ে। তা দিয়ে ঘর হল, মেয়েদের লেখাপড়া হল, শিউলির স্মৃতি হারিয়েও গেল।
কিন্ত শিখার অন্তরে শিউলির ঘ্রাণ তেমনভাবেই সজীব হয়ে রইল। তাই পুজো এলেই ওর আর কিছুই ভালো লাগে না। ওর এখন শোক পালনের দিন। শিউলিকে স্মরণ করার দিন।
Comments :0