প্রসূন ভট্টাচার্য
ওডিশায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন, গত জুন মাসে নদীয়ার কালীগঞ্জে বিধানসভার উপনির্বাচনে ভোট দিতে এসেছিলেন মোলান্দি গ্রামের বাসিন্দা হোসেন শেখ। ভোট দিয়ে আবার ওডিশায় রওনা হওয়ার আগে দশ বছরের শিশুকন্যা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তামান্না খাতুন বাবার কাছে আবদার করেছিল ‘বাবা এবার ফেরার সময় একটা ক্লিপ কিনে দিও, মাথায় দেবো।’ ওডিশায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই আবার গ্রামে ফিরে আসতে হয় হোসেন শেখকে। কারণ তাঁর দশ বছরের মেয়েকে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে মেরে ফেলেছে। দরিদ্র পরিবারের তামান্নাকে আর চুলের ক্লিপ এনে দেওয়ার সুযোগ হয়নি হোসেন শেখের। তামান্নার মা সাকিনা বিবি চিৎকার করে কেঁদে চলেছেন, ‘আমার মেয়ের দোষ কী ছিল?’
হ্যাঁ, হোসেন শেখ এবং তাঁর পরিবারের অপরাধ ছিল তাঁরা সিপিআই(এম)’র সক্রিয় সমর্থক। গ্রামে তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের চোখ রাঙানি, দাপট সত্ত্বেও তাঁরা লাল পতাকা হাতে নিয়েছিলেন এবং গত জুন মাসে কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনেও সেই পতাকা ছাড়েননি, তৃণমূল এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন সিপিআই(এম) সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থীকে। ২৩ জুন তখনও উপনির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হয়নি, কিন্তু কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের পলাশির মোলান্দি গ্রামে তৃণমূলের বাহিনী জয়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে সবুজ আবির উড়িয়ে শুরু করে সশস্ত্র বিজয় মিছিল। গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় এই মিছিল থেকে একের পর এক বাড়িতে বোমা ছোঁড়া হয়। তীব্র আওয়াজে কেঁপে চারিদিক। হোসেন শেখের বাড়ি দেখিয়ে তৃণমূলী বাহিনীর একজন বলে, ‘এইদিকে মার, এরা সিপিএম করে।’ বাড়িতে বাবা নেই, মা সাকিনা বিবি ঘরের ভিতরে কাজ করছিলেন। বাড়ির সামনে খেলছিল ছোট্ট তামান্না। তৃণমূলীদের ছোঁড়া সকেট বোমায় তার ছোট রোগা শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। রক্তাক্ত শরীরের মাংস এলোমেলোভাবে বেরিয়ে এসেছে, মা সেই শরীরটা জড়িয়ে আর্ত চিৎকার করছে। কিন্তু তামান্নাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও কেউ সেই মূহূর্তে ছিল না, কারণ গ্রামে তখন তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের বিজয়োল্লাস চলছে। তৃণমূলের সশস্ত্র কর্মীদের বোমা ছুঁড়ে বিজয়োল্লাসে বাধা দিতে কোথাও কোনও পুলিশের দেখা মেলেনি গ্রামে। ফুলের মতো ফুটফুটে তামান্না শহীদ হয়ে গেল দুষ্কৃতীরাজের দাপটে।
শাসকের দুর্নীতি কায়েমের জন্য দুষ্কৃতীরাজ আর দখলদারিতে প্রত্যক্ষ মদত দিচ্ছে পুলিশ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এর ভয়াবহ ফলাফল দেখা যাচ্ছে রাজ্যে। আর জি কর হাসপাতালের ঘটনায় রাজ্যবাসী শিউড়ে উঠেছে। বেপরোয়া দুষ্কৃতীদের সামনে কোনও আইনি বাধা ও শাস্তির ভয় নেই। গত ৩০ মে নদীয়া জেলারই চাপড়ার শক্তিনগরে এক আইসিডিএস কর্মীকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে খুন করেছে দুষ্কৃতীরা। সিপিআই(এম)’র সদস্য ঐ মহিলা আইসিডিএস কর্মীর রক্তাক্ত মৃতদেহ তাঁর টিনের চালার বাড়ির ভিতরে পাওয়া যায়। মিশুকে জনপ্রিয় এই আইসিডিএস কর্মী ছাত্রাবস্থা থেকেই বামপন্থী রাজনীতি করতেন। এভাবে তাঁর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেননি তাঁর এলাকার মানুষজন।
পশ্চিমবঙ্গে শুধু দুষ্কৃতীদাপটের সঙ্গে নয়া বিপদ এসেছে সাম্প্রদায়িক শক্তির হিংসা। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফায়দা তুলছে দুই শাসকদল তৃণমূল ও বিজেপি। গত এপ্রিল মাসে এই সাম্প্রদায়িক হিংসাকেই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে বাড়তে দিয়েছে প্রশাসন। ওয়াকফ আইন সংশোধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘিরে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদী শক্তিগুলি মাঠে নেমে ঘৃণা বিদ্বেষ এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। সাম্প্রদায়িক উসকানিতে যখন জাতীয় সড়কের হিংসাত্মক কার্যকলাপ চলছিল তখন গোড়াতেই পুলিশ সক্রিয় হয়নি, কঠোর হয়নি। আগুন যখন ছড়িয়েছে তখন পুলিশ দুষ্কৃতী ও সাধারণ মানুষ নির্বিচারে মারমুখী হয়েছে। ১২ এপ্রিল কাশিমনগরে টোটো থেকে নামতেই স্থানীয় বাসিন্দা ইজাজ আহমেদ পুলিশের গুলিতে আহত হন। জঙ্গীপুর হাসপাতালে তাঁর শরীর থেকে চিকিৎসকরা বুলেট বের করা মাত্র পুলিশ সেটা নিয়ে চলে যায়। কিন্তু গুরুতর রক্তক্ষরণের পর ইজাজ আহমদের রক্তের দরকার ছিল। পুলিশ প্রশাসন তাঁর পরিবারের সদস্যদের রক্ত জোগাড় করে দিতে কোনও সাহায্য করেনি, এমনকি বহরমপুর হাসপাতালে স্থানান্তরেও সাহায্য করেনি। এভাবেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ইজাজ আহমেদ। অন্যদিকে জাফরাবাদে হিংসাত্মক কার্যকলাপে দুষ্কৃতীদের বাধা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাস। তাঁরা নিহত হয়েছেন দুষ্কৃতীদের হাতে। এই দুষ্কৃতী হামলার সময়েও গ্রামের মানুষ বারে বারে ফোন করেও পুলিশের কোনও সাহায্য পায়নি।
গত একবছরে এই শহীদদের মৃত্যুর ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ এখন কোন রাজনৈতিক সামাজিক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে। ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট যখন কলকাতায় ধর্মতলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন তখন তাঁদের দাবি ছিল খাদ্যের, মূল্যবৃদ্ধি রোধের। পুলিশ তাদের ওপরে নৃশংস আক্রমণ চালায়, কলকাতার বুকে পুলিশের আক্রমণে প্রাণ হারান অন্তত ৮০ জন। রাজভবনের পাশ থেকে কার্জন পার্কের ধারে, ধর্মতলার রাস্তায় পুলিশের মারে মৃতদেহগুলি পড়ে ছিল। পরদিন ছাত্র ধর্মঘটে ছাত্রদের মিছিল সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালিয়ে ৬জন ছাত্রকে হত্যা করে। খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের এবং পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের শহীদদের প্রতিবছর ৩১ আগস্ট শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়। শহীদদের মৃত্যু বৃথা যায়নি, গণআন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করেছিল, বাংলায় ভূমিসংস্কার, কৃষির উন্নয়ন, গ্রামে ও শহরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান, কাজের সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার সহ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বড়রকমের সাফল্য এসেছিল বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরের সময়কালে।
কিন্তু সমস্ত প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলি একজোট হয়ে ২০১১ সালের মে মাসে বামফ্রন্ট সরকারকে হটিয়ে তৃণমূলকে রাজ্যের সরকারে ক্ষমতাসীন করার পর থেকে পরিস্থিতির আবার পরিবর্তন ঘটেছে। ২০১১ সালের মে মাসে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে গত চোদ্দ বছরে তামান্না সহ ২৪৭ জন শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন দক্ষিণপন্থী শক্তির হাতে। অবাধে লুট ও দুর্নীতি চালাতে, গণতান্ত্রিক পরিসর সঙ্কুচিত করতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। কিন্তু এসব করেও যখন মানুষের প্রতিবাদকে দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না, লাল ঝান্ডা হাতেই মানুষ যখন প্রতিবাদকে সংগঠিত করতে নেমেছে, তখন মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঘৃণ্য কৌশল নামিয়ে এনেছে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকদল বিজেপি ও তৃণমূল। ভয় দেখিয়ে যাদের দমন করা যাচ্ছে না, তাদের বিভ্রান্ত করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে ভাষা ধর্ম বর্ণকে ব্যবহার করা হচ্ছে। খাদ্যের সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধের দাবিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ধর্মতলায় এসেছিলেন ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট। আজকে যাতে মানুষ সেভাবে আর একজোট না হয় তার জন্যই বিদ্বেষের বিষ ছড়ানো হচ্ছে মিডিয়া এবং আধুনিক যাবতীয় কমিউনিকেশন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। সেদিনের পঁয়ষট্টি বছর পরে আজও ভারত বিশ্বক্ষুধা সূচকে ১৬৪টি দেশের নিচে, ক্রমশ অবস্থান নামছে। ট্রাম্পের শুল্ক ফতোয়ায় বেকারি ও মূল্যবৃদ্ধি আরও কত ভয়াবহ হবে আঁচ করা যাচ্ছে না। রাজ্যে কাজ নেই, স্কুল কলেজের শিক্ষার পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। বাংলার গ্রাম ছেড়ে দলে দলে বেকার যুবরা ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন ছাড়া উপায় কোথায়? গণআন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো যেতে পারে সেই পথেই।
Mass Movement
গণআন্দোলনই পারে পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে

×
Comments :0