নতুনপাতা
জানা অজানা
১৮৯৩খ্রিস্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর বিবেকানন্দর বক্তৃতা ও জীবনের নতুন মোড়
তপন কুমার বৈরাগ্য
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
মানবসেবার জ্বলন্ত প্রতীক ছিলেন মার্গারেট এলিজাবেথ
নোবেল নামক এক বিদূষী রমণী।তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডের
ছোট্ট শহর ডাঙ্গাসনে ১৯৬৭খ্রিস্টাব্দের ২৮শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ
করেন।১৮৯৩খ্রিস্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বর শিকাগো ধর্মসম্মেলনে
বক্তৃতা দেওয়ার পর বিবেকানন্দর নাম সারাবিশ্বে ছড়িয়ে
পড়ে।মার্গারেট এলিজাবেথ তার সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব
হয়ে ওঠে।এই ধর্মসম্মেলনে বক্তৃতা বিবেকানন্দর জীবনের
সম্পূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
১৮৯৫খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে ইংল্যান্ডে বিবেকানন্দের সাথে তার প্রথম পরিচয় ঘটে।১৮৯৬খ্রিস্টাব্দের ৭ই জুন বিবেকানন্দ মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলকে এক চিঠি লিখলেন।যে চিঠিতে তিনি তার মনের কথা লিখলেন---তোমার মধ্যে জগৎ আলোড়নকারী শক্তি প্রচ্ছন্ন আছে।আমাদের এখন প্রয়োজন সাহসী বক্তার চেয়ে সাহসী কর্মী।হে মহাপ্রাণা ওঠো জাগো,জগৎ যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে। তোমার কি এমন সময় নিদ্রা সাজে।
চিঠি পেয়ে মার্গারেট নোবেল ভারতবর্ষে আসতে রাজী হয়ে গেলেন। বিবেকানন্দ তাকে আবার লিখলেন--এদেশের দুঃখ-দুর্দশা,
কুসংস্কার,দাসত্ব যে কত ভয়ানক তা তুমি ধারণা করতে পারবে না।
এই দেশে আসবার পর দেখবে নিজেকে অর্ধ উলঙ্গ অসংখ্য নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে।তারা শ্বেতাঙ্গদের ভয়ে হোক ঘূণায় হোক সব সময় এড়িয়ে যেতে চায়। শ্বেতাঙ্গরাও এদের
এড়িয়ে চলে।একদিকে আমার ভারতবাসীরাও অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গরাও তোমায় ঘৃণার চোখে দেখবে।তোমার প্রতিটি গতিবিধি
সন্দেহের চোখে দেখবে।এমতবস্থায় তোমার যদি এখানে আসতে
প্রবৃত্তি জাগে তবে তুমি আসতে পারো।
তিনি বিবেকানন্দকে লিখলেন--আমি মনে প্রাণে ভারতবর্ষে গিয়ে অসহায় মানুষদের সেবা করতে চাই।
বিবেকানন্দ আর আপত্তি করলেন না।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে ফেব্রুয়ারী তিনি জাহাজে করে ভারতের
মাটিতে এসে নামলেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতার
বাগবাজারে শ্রীমা সারদামণির সাথে দেখা হলো।মা সেদিন
পরম স্নেহে এক বিদেশিনীকে আপন করে নিলেন। ১৮৯৮খ্রিস্টাব্দের ২৫শে মার্চ বিবেকানন্দ মার্গারেটের
নতুন নাম দিলেন নিবেদিতা। ১৮৯৯খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় দেখা
দিল প্লেগ মহামারী।নিবেদিতা নিজের হাতে জঞ্জাল পরিষ্কার
করে,আর্তের সেবা করে কলকাতাকে ধীরে ধীরে প্লেগ মুক্ত
করলেন। বিবেকানন্দ নিবেদিতার কাজ দেখে খুব খুশি
হলেন। বিবেকানন্দ বললেন--আজ থেকে তুমি হলে
ভগিনী নিবেদিতা। নিবেদিতাকে নিয়ে বিবেকানন্দ সারা
ভারতবর্ষ ভ্রমণ করলেন।চিনলেন তিনি ভারতবর্ষকে ।চিনলেন
তিনি ভারতবাসীকে।ভারতবর্ষ তার আত্মার সাথে যোগসূত্র স্থাপন
করলো।তিনি দেখলেন ভারতবাসীরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন।এই
জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে এদের আগে শিক্ষিত করে গড়ে
তুলতে হবে।সেইসাথে বুঝলেন ভারতবাসীকে পরাধীনতার শৃঙ্খল
থেকে মুক্ত করতে হবে। নারীদির এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
বাগবাজারের ঘোষপাড়া লেনে তিনি প্রথম বালিকা বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করলেন।বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী জোগাড় করলেন।
তিনি বিবেকানন্দের কাছ থেকে শরীরবিদ্যা,ইতিহাস,উদ্ভিদবিদ্যা,
চিত্রবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা নিলেন।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা জুলাই বিবেকানন্দ মাত্র ৩৯বছর
বয়েসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮৯৩খ্রিস্টাব্দে শিকাগো
ধর্মসভায় যাবার আগে বিবেকানন্দ নামটা দিয়েছিলেন
ক্ষেত্রির মহারাজা অজিত সিং। নিবেদিতার কাছে বিবেকানন্দই ছিলেন একমাত্র আদর্শ পুরুষ। বিবেকানন্দর মৃত্যুর
পর তার অসমাপ্ত সব কাজের দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তার অবদান কোনো অংশে
কম নয়। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু তার নাম দিয়েছিলেন শিক্ষাময়ী।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু খুব অসুস্থ
হয়ে পড়লে নিবেদিতার সেবায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।যার জন্য
জগদীশচন্দ্র বসু নিবেদিতাকে অন্য চোখে দেখতেন।রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর লোকমাতা বলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
সাথেও নিবেদিতার মধুর সম্পর্ক ছিলো।তার সাথে শ্রী অরবিন্দ
এবং ডন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে
স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক ছিলো।
অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য ভগিনী নিবেদিতা মাত্র ৪৪(চুয়াল্লিশ বছর)বছর বয়েসে দার্জিলিংয়ে মারা যান। ভারতের সেবায় নিবেদিত প্রাণ ভগিনী নিবেদিতা।তিনি মৃত্যুর আগে তার সঞ্চিত সব অর্থ বেলুড় মঠের হাতে তুলে দিয়ে যান।একটাই উদ্দেশ্য সেই অর্থ নারী শিক্ষার জন্য ব্যয় করা।আজ নিবেদিতার নাম সমগ্র ভারতবাসীর অন্তরে সাড়া জাগায়।
Comments :0