গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
কেকের গুড়ো
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"মা, ওগুলো ফেলে দিচ্ছ কেন? ফেলো না। ফেলো না।" হঠাৎই বলে উঠল আমার মেয়ে কুঁড়ি। ওর মা রান্নাঘরে কাজ করছে। কুঁড়ি রান্নাঘরের পাশ দিয়ে শোওয়ার ঘরের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ তখুনি ওর মাকে কি যেন একটা ফেলে দিতে দেখে কথাগুলো বলল ও চেঁচিয়ে উঠে। আমিও বসেছিলাম কাছেই। একটা চেয়ারে বসে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলাম। এর পর স্নান করতে যাবো। তারপর খেয়ে তৈরি হয়ে অফিস। আমি কাছেই বসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু ওখান থেকে দেখা যায় না কিচেনের ভিতরটা। তাই বুঝতে পারলাম না, ঠিক কি ফেলে দিতে যাচ্ছিল আমার স্ত্রী কেয়া। মা-মেয়ের মধ্যে ব্যাপার, তাই ওতে আমার ঢুকে কাজ নেই, মনে মনে বললাম নিজেকে। ফের কাগজটা পড়ায় মনোনিবেশ করতে যাব, কেয়া বলে উঠল, "কেন, কি করবি এগুলো?"
"বলছি না, ফেলো না! বাবা, মাকে বলো না, না ফেলতে।"
"আরে বলবি তো, কি করবি গুড়োগুলো?" ফের রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর গলা ভেসে আসে।
আজ যে খবরের কাগজ পড়া কপালে নেই, বুঝতে অসুবিধা হয় না। কাগজটা ভাঁজ করে পাশের টেবিলটায় রেখে, উঠি চেয়ার থেকে। "কি হয়েছে কি?" বলতে বলতে পা বাড়াই কিচেনের দিকে।
"দ্যাখো না বাবা, মা গুড়োগুলো ফেলে দিচ্ছে। বলছি, আমার লাগবে। তুমি বলো না বাবা মাকে, না ফেলতে।"
"আগে তো বলবি, কিসের গুড়ো? তারপর তো বলবো, তোর মাকে।" বলি মেয়েকে।
"আরে বাবা, এই কেকের গুড়োগুলো ফেলতে দিচ্ছে না তোমার মেয়ে। ওর নাকি লাগবে! কি কাজে লাগবে এই এক মুঠো গুড়ো কেক ওর, তা ওই জানে!" রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে কেয়া। ওর হাতে একটা প্লাস্টিকের বড় কৌটো। কৌটোটা চিনতে পারলাম। ক'দিন আগে বড়দিন গেল। তখন একটা মাঝারি মাপের গোটা কেক এনেছিলাম বাড়ির জন্য। তারপর, বাড়িতেই ছুরি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে, রেখেছিলাম পিসগুলো এই কৌটোটায়। কাটার সময় কয়েকটা পিস একটু একটু ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেছিল। এখন আর কৌটৌটায় কেক নেই। কিন্তু পড়ে আছে নিচে, সেই কাটার সময় ভেঙ্গে যাওয়া কেকের এক্কেবারে ছোট্ট ছোট্ট টুকরোগুলো, যেগুলো এখন এই ক'দিনের কৌটোটার নাড়াচাড়াতে প্রায় গুড়ো হয়ে গেছে, সেইটা। ব্যাপারটা এতোক্ষনে পরিস্কার হয়। মেয়ে কোনো কারণে ঐ কৌটোর তলানিতে পড়ে থাকা কেকের গুড়োগুলো ফেলে দিতে চাইছে না। কিন্তু কেন, সেটা বোধগম্য না হওয়ায় মেয়েকে জিজ্ঞেস করি, "ঠিক আছে মা ফেলবে না। কিন্তু কি করবি তুই এই গুড়োগুলো দিয়ে?"
"আমি পাখিদের দেবো বাবা। ঐ যে পাখিগুলোকে, প্রতিদিন সকালে যাদের আমি খাবার দিই দোতলার ব্যালকনিতে, ওদের। ওরা তো প্রতিদিন বিস্কুট, মুড়ি, এইসবই খায়। তাই-ই তো দিই। বাড়িতে কেক এসছে, ওরা কি খাবে না একটু কেক!" আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে মেয়ে। কুঁড়ির কাছ থেকে এমন উত্তর যে পাব ভাবি নি আমি। আমি স্ত্রীর দিকে তাকাই। দেখি, ও-ও স্তব্ধ হয়ে গেছে মেয়ের উত্তর শুনে। কয়েকক্ষণ লেগে যায় দু'জনেরই সামলাতে নিজেদের। ঘর জুড়ে ততক্ষণ শুধুই নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে প্রথম কথা বলে কেয়াই। সে মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলে, "এখনই দিবি?"
"এখন নয়, কাল দেবো, মা। তখনই তো সব রকম পাখি আসে। তখন দিলে কাক, পায়রা, চড়াই, শালিক, সবাই খেতে পাবে। আর এখন দিলে শুধু কাক আর পায়রা। মা, এখন না দিলে তুমি ফেলে দেবে না তো গুড়োগুলো?"
"না মা, ফেলবো না। তুই কালকেই দিস।" মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলল আমার স্ত্রী।
Comments :0