Sikkim Tunnel Collapse

সিকিমের টানেলে ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫

জাতীয় রাজ্য জেলা

সিকিমে নির্মীয়মান এনএইচপিসি টানেলে ব্যাপক ধস নেমে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫ জন। এখনও সুড়ঙ্গের ভেতরে অনেকের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রশাসনের তরফে। অন্যদিকে বিষাক্ত মিথেন গ্যাস লিক হওয়ার কারণে ও অবিরাম বৃষ্টিজনিত পরিস্থিতিতে উদ্ধার কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। ক্রমশ পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। মৃত ১৫ জনের মধ্যে বেশীরভাগই মালবাজার মহকুমা এলাকার বাসিন্দা। শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় গোটা ডুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গ জুড়ে গভীর শোকের ছায়া এবং জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন সূ্ত্রে জানা গেছে নিহতদের নাম তুফান দাস, জলপাইগুড়ির বাগানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। আনন্দ টোপনো নাগ্রাকাটার গ্রাসমোর চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। অমিতলাল গোরে মেটেলি ব্লকের নাগেস্বরী চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। মেটেলি ব্লকের কিলকোট চাবাগান ১১ নং লাইনের বাসিন্দা বিকেশ্বর ওরাও।  গাব্রিয়েল টিজ্ঞা, মেটেলি ব্লকের কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা। শিবা ওরাও কিলকোট চাবাগান ১১ নং লাইনের বাসিন্দা। অর্জুন সাওতাল নাগ্রাকাটার সুখানিবস্তির বাসিন্দা। বলো ওরাও নাগ্রাকাটার শুল্কাপাড়ার বাসিন্দা। মেটেলি বল্কের শ্যাম ওরাও ইনডং চা বাগানের টন্ডু লাইনের বাসিন্দা। বিন্নাগুড়ির বাসা লাইনে তেলিপাড়ার বাসিন্দা  আদেশ ওরাও। গোরা ওরাও পুর্ব খৈরবাড়ি বাসিন্দা। ইয়াশহোল পাঠানকোটের বাসিন্দা। বিবেক রাওয়াত দেরাদুন, বাবুলাল বরদোলুই আসাম এবং লাকপা দোরজি তামাং কাটাং  নামচির বাসিন্দা। প্রশাসন সূত্রে জানাচ্ছে,এখনও পর্যন্ত ১২জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, ভেতরে ঠিক কতজন আটকে রয়েছে সেই সংখ্যাটা স্পষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে নয়, এমনটাই জানিয়েছেন নামচির জেলাশাসক অনুপ তামাঙ। তবে সংবাদ মাধ্যমের  প্রতিবেদন অনুযায়ী নামচির পুলিশ সুপার সোনম দলমা ভূটিয়া জানিয়েছেন, সিকিমে নির্মীয়মান সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের ঘটনায় আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আধিকারিকদের মতে, ঘটনার সময় এডিআইটি-থ্রি টানেলের ভেতরে মোট ১৫ জন শ্রমিক, ২জন ইঞ্জিনিয়ার এবং ছয়জন এনএইচপিসি আধিকারিক সহ ২৭জন ছিলেন। ধসের কারণে টানেলের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথও বন্ধ হয়ে যায়। বিষাক্ত মিথেন গ্যাস ক্রমাগত বেরিয়ে আসতে থাকার কারণে টানেলের ভেতরে প্রবেশ করাটা অত্যন্ত ঝূঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারকার্যে বিপর্যয় মোকাবিল কর্মীদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এই অবস্থায় নিরাপদে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছেই। পাশাপাশি গ্যাসের মাত্রা পরর্যবেক্ষণ করে চলেছেন বিপর্যয় মোকাবিলা কর্মীরা। প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে মিথেন গ্যাস বের হয়েই চলেছে। ফলে সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য যারা ভেতরে ঢুকেছিলেন বিষাক্ত মিথেন গ্যাস লিক হওয়ার কারণে বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 
প্রায় ২৫০মিটার দীর্ঘ টানেলটি সিকিমের প্রথম ডাবল লেন টানেল। পূর্ব সিকিমের নামচি ও রঙপো সংলগ্ন মামরিং এলাকায় এই টানেল তৈরীর কাজ চলছে। বাংলা—সিকিম লাইফ লাইন  ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের তিস্তা স্টেজ ৪ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছাকাছি। এটি সিকিমের সাথে নাথুলা পাসের সংযোগকারী একটি কৌশলগত পথ। টানেলটির কাজ সমাপ্ত করে টানেলটি চালু করা হলে গ্যাঙটকমুখী পর্যটক ও নাথুলাপাসগামী সেনাবাহিনীর যানবাহনগুলির অনেক সহজে যাতায়াত করতে পারবে। আর সেই টানেল তৈরীর সময়তেই ঘটে গেলো এতো বড় বিপর্যয়। দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে কি কারণে এতো বড় ভূমিধস তা এখনও স্পষ্ট নয়। 

 

মেটলি ইংডং বাগানে শ্যাম ওঁরাওয়ের পরিবারের পাশে পীযুষ মিশ্র। 

মঙ্গলবার দুপুরেই সিপিআই(এম) জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্রের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মেটেলি ও নাগরাকাটার নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রসঙ্গে জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্র বলেন, ‘‘স্বাধীন দেশ কিংবা তার আগে ব্রিটিশ আমলের পরাধীনতা সব যুগেই শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য লড়াই করে আইন আদায় করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই আইনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। তারই এক করুণ পরিণতি শ্রমিকদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু। পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার চরম অবহেলার কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু ঘটছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘শ্রমিকের মৃত্যু হলে কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, মালিকপক্ষের কঠোর আইনি শাস্তির বিধান থাকার কথা। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই আইনি ব্যবস্থা গুলোকে দুর্বল করে ফেলায় মালিকেরা দায়মুক্তি পাচ্ছে। আইনি শাস্তির ভয় না থাকায় জেনে শুনেই শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অত্যন্ত জটিল ও দুর্গম পরিবেশে যেখানে সাধারণত কেউ পৌঁছাতে পারে না, সেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শ্রমিকদের পাঠানো হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকেরা সেই কাজ সম্পন্ন করার পরই সেখানে কর্পোরেট কার্যক্রম শুরু হয়। কর্পোরেটের রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়ে জীবন বাজি রেখে কাজ করার এই সংস্কৃতি শ্রমিক-বিরোধী শ্রম কোড ও জনবিরোধী নীতিরই ফল।’’ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থরক্ষার দাবিতে এবং এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে আগামী ১০ আগস্ট দেশব্যাপী 'জেল ভরো' কর্মসূচি পালিত হবে বলে তিনি ঘোষণা করেন।
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তবে প্রাথমিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব এবং পাহাড়ের ভঙ্গুর প্রকৃতির তোয়াক্কা না করে চলা এই ধরনের কাজের কারণেই বারবার শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে উদ্ধার কাজ শুরু হতেই একের পর এক দেহ উদ্ধার হতে থাকে। মালবাজার মহকুমার মেটেলি ব্লকের এলাকার ৬ জন এবং নাগরাকাটা ব্লকের  ৩ জনের দেহ উদ্ধার হয়। জেলা প্রশাসনের কাছে খবর আসতেই এদিন কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনে মৃত শ্রমিকদের বাড়িতে মাটিয়ালির বিডিও সুমন্ত ভৌমিক এবং মেটেলি থানার আইসি মিংমা লেপচা সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধিরা যান। তাঁরা শোকার্ত পরিবার গুলির সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান। ওই এলাকা থেকে ঠিক কতজন শ্রমিক সিকিমের ওই টানেলে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তার বিশদ তথ্য সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি নাগরাকাটা থানা ও ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকরাও মৃতদের বাড়িতে যান। জলপাইগুড়ি জেলা পুলিশ সুপার সুজাতা কুমার বীণাপাণি জানান, ‘‘আমাদের জেলার নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মেটেলি ব্লকের ছয়জন এবং নাগরাকাটা ব্লকের তিনজন রয়েছে। মৃতদের পরিবারের সদস্যরা সিকিমে যেতে চেয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের আইজি, জেলার একজন অতিরিক্ত জেলাশাসক পদমর্যাদার আধিকারিক এবং একজন ডিএসপি রেঙ্কের পুলিশ আধিকারিক ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন।’’ 
 

Comments :0

Login to leave a comment