Assembly 2026 Mahishadal

মহিষাদল: জরিমানা নৌকাতেও, খাল সংস্কার বন্ধ, শিল্পাঞ্চল লাগোয়া তল্লাটে পরিযায়ীর সারি

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

মহিষাদলের অমৃতবেড়িয়ায় সিপিআই(এম) প্রার্থী পরিতোষ পট্টনায়কের প্রচার।

রামশঙ্কর চক্রবর্তী

রূপনারায়ণ, হলদির পাড়ে অনেক গল্প জমা আছে। আপন খেয়ালে নদী যখন বয়ে চলে তখন তার সঙ্গে চলে কিছু মানুষ। নদীতে নৌকা নিয়ে নামলে তবেই চলে পেট। হাঁড়ি চড়ে উনুনে। পরিবর্তে কোনও দাবি করেনা বটে বহমান রূপনারায়ন বা হলদি। কিন্তু তার বিস্তৃতির ফলে ভাঙে নদী পাড়। সব তছনছ হয়ে যায় মুহূর্তে। ভেসে যায় অসংখ্য ঘর বাড়ি। 
সব হারিয়েও নদীই ভরসা কয়েকশো মানুষের। তাঁরা নৌকাজীবী। নদীতে সাদা বালি তুলে চলে সংসার। তাও কয়েকমাস। মাসে বড়জোর ১৫দিন বালি তোলা যায়। বাকি সময় মাছ ধরা। নদীতে নৌকা নিয়ে নামলে জরিমানা দিতে হয়। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কাকে দিতে হয়? প্রশাসনকে, পুলিশকে। তবে কোনও রসিদ মেলে না। জানালেন কয়েকজন নৌকাজীবী।
প্রতি নৌকায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে পুলিশ। কখনও কখনও থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে সেই জরিমানার টাকা আদায় করা হয়, এমনই দস্তুর এখন নিত্যদিন। মহিষাদল ব্লক এলাকার নৌকাজীবীরা তাই আর কোনও প্রতিবাদ করেন না। শতাধিক মানুষ ভোর থেকে পেটের টানে নৌকার দাঁড় টানেন রূপনারায়ণ, হলদি নদীর বুকে।
নদীমাতৃক পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল বিধানসভার বড় অংশ নদী তীরবর্তী এলাকায়। নাটশাল ১ ও ২, অমৃতবেড়িয়া, গেঁওখালি এলাকার অধিকাংশ মানুষজন নদীকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকেন। তাঁদের জীবন জীবিকার সবটাই নদী নির্ভরশীল। কয়েকশো মানুষের জীবিকা চলে নদী থেকে সাদা বালি তুলে। মোটর চালিত এক একটি নৌকায় ৩০০ ফুট করে সাদা বালি ধরে। শ্রমিক দরকার হয় চারজন। প্রত্যেকের মজুরি ৪০০ টাকা করে। মোটরের তেল খরচ আরও ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ হয় ২১০০ টাকা। আর এক নৌকা সাদা বালি বিক্রি হয় ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকাতে। সেই বালি মূলত ইটভাটাতে বিক্রি হয়। আবার বাড়ি তৈরির জন্যও বিক্রি হয়। 
এক নৌকা বালি তুলতে সারাদিন লেগে যায়। ভয় থাকে নদীতে জোয়ার চলে আসার। তবে মাসে বড়জোর ১৫দিন বালি তুলতে পারা যায়। বাকি দিনগুলি নদীর মাছ ধরে জীবিকা চলে এই দরিদ্র পরিবারগুলির। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা আছে কী এদের জন্য? না। 
প্রতি বর্ষায় দনিপুর, অমৃতবেড়িয়ায় নদী বাঁধ ভাঙন রুখতে দীর্ঘস্থায়ী কোনও পরিকল্পনা প্রশাসন গ্রহণ করেছে? না। মহিষাদল বিধানসভা এলাকার মানুষজনের প্রয়োজন যা তার কোনও কিছুই পূরণ করেনি তৃণমূল সরকার। এখানে একদিকে যেমন নদী ভাঙনের সমস্যা রয়েছে তেমনি পৌরসভার দাবি রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র মহিষাদল। গেঁওখালি থেকে তেরপেখিয়া, অন্যদিকে দাড়িবেড়িয়া থেকে নামালক্ষ্যা পর্যন্ত মূলত মহিষাদল বিধানসভা। এই বিস্তীর্ণ এলাকা আধা শহর। প্রাচীন ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আর সংস্কৃতির পীঠস্থান এই এলাকা।
২০০৮ সালে মহিষাদলকে পৌরসভা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। তৃণমূল সরকারে আসার পর সেই কাজ এগোয়নি। এমনকি পূর্ব মেদিনীপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ হয়ে থাকার পরেও স্থায়ী ভবনের কাজ শুরুই হয়নি। অস্থায়ীভাবে মহিষাদল রাজ কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন চলছে। কিন্তু কেন প্রায় আট বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন তৈরি শুরু হলো না? 
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাটমনি আর তোলাবাজির কারণে ঠিকাদাররা কাজই করতে চায়নি। 
মহিষাদল প্রধানত কৃষিপ্রধান। এই বিধানসভা এলাকার কৃষিকাজে প্রধান ভরসা হিজলি টাইডাল ক্যানেল। এই ক্যানেল একদিকে রূপনারায়ণ অন্যদিকে হলদি নদীতে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু তার সংস্কার হয় না দীর্ঘদিন। দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটারের এই খাল সংস্কারের জন্য প্রায় ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু সেই বরাদ্দকৃত অর্থে কাজই হয়নি। বাসিন্দাদের অভিযোগ এই খালের উপর প্রায় ২০টির বেশি ব্রিজ ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। খাল আগাছায় ভর্তি। ফলে কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় জল পাওয়া যায় না। 
"এবারের বিধানসভার নির্বাচনে মানুষ একটু অন্য ভাবে ভাবছেন। আসলে পাশের বিধানসভা হলদিয়া। মহিষাদল এলাকার বহু মানুষ শিল্পাঞ্চলে কাজ করতেন। হলদিয়ার যা অবস্থা সেখানে এখন কাজ নেই। ঘরের পাশে শিল্পাঞ্চল থাকতে এখানকার যুবকদের পরিযায়ী হয়ে অন্য রাজ্যে কাজে যেতে হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। যারা হলদিয়া গড়ে তুলেছিল তারাই পারবে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।’’ সিপিআই(এম) প্রার্থীর মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন গোপাল দাস। বছর ত্রিশের এই যুবক পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁর মতো অনেকে মিছিলে ছিলেন। 
এই বিধানসভার সিপিআই(এম) প্রার্থী পরিতোষ পট্টনায়েক বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন। সিপিআই(এম) এর ইস্তাহার নিয়ে যাচ্ছেন মানুষের কাছে। শুনছেন তাঁদের কথা। আর পড়ন্ত বিকালের সূর্যালোকে রূপনারায়ণ তখন আরও মোহময়। তার পাড় ধরে চলেছে লাল পতাকার মিছিল।

Comments :0

Login to leave a comment