বই
মুক্তধারা
অবরুদ্ধ গণতন্ত্র: আজকের বাংলার ছবি
প্রসূন ভট্টাচার্য
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় যারা এখনও পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের দাবি করে থাকেন তাঁরা আর সামাজিক অর্থনৈতিক তথ্য ও যুক্তির ধারপাশ দিয়ে যাওয়ার খুব একটা প্রয়োজন বোধ করেন না। কেবল ভোটের ফলাফলে তৃণমূলের জেতার নিদর্শন তুলে ধরে উন্নয়নের জোয়ারে বঙ্গবাসীর সুখে থাকার দাবি করে থাকেন। বুদ্ধদেব ঘোষের লেখা প্রবন্ধ সঙ্কলনটি তাঁদের ফানুস ফুটো করে দিতেই পারে। কারণ তিনি তথ্য পরিসংখ্যান, যুক্তি এবং টুকরো টুকরো সংবাদের প্রাসঙ্গিক উল্লেখ সহযোগে যে বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধগুলি লিখেছেন তাতে পশ্চিমবঙ্গের অন্ধকার দিকটিই প্রতীয়মান।
প্রবন্ধ সঙ্কলনটিতে দশটি প্রবন্ধ রয়েছে যেগুলি মূলত পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদলের সাম্প্রতিক রাজনীতি ও তার ফলে রাজ্যের সঙ্কটকে তুলে ধরেছে। এই সঙ্কটকেই তিনি বইয়ের নামেও চিহ্নিত করেছেন-‘অবরুদ্ধ গণতন্ত্র: সাম্প্রতিককালের বঙ্গীয় রাজনীতির চালচিত্র’। সাম্প্রতিক বলতে মূলত তৃণমূলের সরকারে আসীন হওয়ার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক দিক থেকে বাংলার বিপন্ন দশার কথাই বলা হয়েছে। অধ্যাপক রতন খাসনবীশ বইটির যে ভূমিকা লিখে দিয়েছেন সেটাকেও বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ হিসাবে গণ্য করা যায়। তিনি দেখিয়েছেন রাজ্যের শাসকদল উন্নয়নের বামে কীভাবে দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি জাঁকিয়ে বসিয়েছে। অন্যদিকে অধিকারবোধহীন অনুগত একটি সমাজ তৈরি করে সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের দাতা গ্রহীতার সম্পর্ক তৈরি করছে।
বইটির লেখক বুদ্ধদেব ঘোষ তাঁর প্রবন্ধগুলিতেও এই তথাকথিত উন্নয়নের মোড়ক ছিঁড়ে ফেলেছেন। তৃণমূল সরকারের উন্নয়নের রাজনীতিকে দুর্বৃত্তরাজ হিসাবে চিহ্নিত করে তিনি দেখিয়েছেন, ‘যেখানে অর্থনীতি বহির্ভূত শক্তির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো অংশের বিকৃতি ঘটে, সেখানেই অর্থনীতিতেও দুর্বৃত্তদের প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়। সর্বত্রই তাই হয়, এরাজ্যেও তাই হয়েছে।’ জনবাদী রাজনীতির নামে এরাজ্যে যে ক্লায়েন্টেলিজম্ চালু করা হয়েছে তার উল্লেখ করে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন, এই কারণেই এরাজ্যের মানুষ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও এখানে তাঁদের অধিকার নয়। শাসকদলকে ভোটদানের মাধ্যমে আনুগত্য নিশ্চিত করলে তবেই মিলতে পারে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা। প্রাপ্যকে এভাবে আনুগত্যের শর্তাধীন করা হয়েছে। শাসকদলের নেতারাই বলেছেন যে পঞ্চায়েতে তাদের বড় ব্যবধানে জয় আসবে সেখানেই বাড়তি টাকা খরচ করা হবে। পশ্চিমবঙ্গে এভাবে উন্নয়নকে রাজনীতিমুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তের গ্রাসে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো শিল্প সংস্থা এরাজ্যে বিনিয়োগের ভাবনাচিন্তা করে তাহলেও তারা পিছিয়ে যাবে এই দুর্বৃত্তায়নের পরিবেশ দেখে।
রাজ্য সরকারের অর্থনৈতিক নীতি কতটা উন্নয়ন সহায়ক আর কতটা উন্নয়নের অন্তরায় সেই প্রশ্নও একটি প্রবন্ধে তুলেছেন লেখক। যদি তৃণমূল সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সত্যিই উন্নয়ন ঘটায় তাহলে মানব উন্নয়ন সূচকে তার প্রতিফলন কোথায় সেই তথ্য খুঁজেছেন তিনি। রাজস্বখাতে অমিত ব্যয়, সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন না ঘটিয়ে স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্য মালিকদের পকেটে অর্থ প্রদান, আইনি লড়াই থেকে দুর্গাপুজোর নামে দেদার টাকা খরচ ইত্যাদি পদক্ষেপে সরকার কতটা ‘জনপ্রিয়তা’ অর্জন করেছে, আর নাগরিকরা কতটা মানবোন্নয়নের সাফল্য পেয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে এই সরকারই স্থায়ী নিয়োগের বদলে ঠিকা নিয়োগ করে, কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা না দিয়ে রাজ্যের অর্থনৈতিক অবনমন ঘটিয়েছে। বিপুল ঋণভার এবং সরকারি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে ভবিষ্যৎকেও বিপদের মুখে ঠেলেছে বলে দেখিয়েছেন লেখক।
আইনের পথে যুক্তিসংগত পক্ষপাতশূন্যতা ও সমদর্শিতা আমলাতন্ত্রের এমন বৈশিষ্ট্য যা গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত। কিন্তু তৃণমূলের আমলে তা শিকেয় উঠেছে এমনভাবে যাতে আমলাতন্ত্রের সততা ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তথ্যের অধিকার আইন থাকলেও রাজ্যে তথ্য গোপনই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখক বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে আইনের শাসনের বদলে দলীয় শাসন কায়েমের বিপদের কথা বলেছেন। সেই সঙ্গে পঞ্চায়েতীরাজের মাধ্যমে ক্ষমতার যে বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল রাজ্যে তাকে ধ্বংসের অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের দলীয় শাসনের মাধ্যমে।
বাংলার গণতন্ত্রের এই পরিণতি আকস্মিক নয়, বরং কীভাবে তৃণমূলের রাজনীতির পথ বেয়ে এসেছে তা খানিকটা পূর্ব প্রেক্ষাপটের উল্লেখ টেনেই লেখক ব্যাখ্যা করেছেন। এই প্রবন্ধ সঙ্কলনের মধ্য দিয়ে বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক বিপদের উন্মোচন ঘটানো হলেও তা মূলত রাজ্যে তৃণমূলের অপশাসনের ভিত্তিতে বর্ণিত হয়েছে। দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির রমরমায় ও কেন্দ্রে বিজেপি’র শাসনের কারণে যে আঘাতগুলি বাংলার বুকে নেমে এসেছে তার কোনো বিস্তৃত ব্যাখ্যা এখানে নেই। রাজনৈতিক ঘটনাবলী যতো এগোচ্ছে ততোই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে বাংলার বুকে তৃণমূল আসলে আরএসএস’র একটি ঘুঁটি হিসাবে সঙ্ঘ পরিবারের সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনাই রূপায়ণ করে চলেছে। কিন্তু এই বইতে তৃণমূলের অপকর্মগুলির সহায়ক অংশ হিসাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিজেপি’র উল্লেখ থাকলেও দুই দলের মধ্যে যে গভীর সংশ্লিষ্টতা, তার বর্ণনার অভাব থেকে গেছে। এইরকম কিছু ঘাটতি সত্ত্বেও বাংলার সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্ধকারময় দশার পরিবর্তনে, ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে হলে যে বিপদগুলির বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে সংগ্রাম এখনই করতে হবে তা উপলব্ধিতে আনার জন্য এই বইয়ের প্রবন্ধগুলি সহায়ক হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ হোক বা না হোক, লেখাগুলি সাম্প্রতিককালের বঙ্গীয় রাজনীতির চালচিত্রই বটে, নথীভুক্ত করে লেখক নিঃসন্দেহে সময়ের প্রতি দায়িত্বপালন করেছেন।
অবরুদ্ধ গণতন্ত্র: সাম্প্রতিককালের বঙ্গীয় রাজনীতির চালচিত্র
বুদ্ধদেব ঘোষ। বহুস্বর। কলকাতা। ২৫০ টাকা
Comments :0