শ্রীদীপ ভট্টাচার্য
আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সর্ব অর্থেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। চরম দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে মেহনতি জনগণের স্বার্থবাহী বামপন্থার সংগ্রামের মঞ্চ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাম পরিসরকে আরও বৃদ্ধি করে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে যুক্ত করে বামফ্রন্ট এই নির্বাচনী সংগ্রামে শামিল হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল এবং কংগ্রেসও এই নির্বাচনী ময়দানে শামিল হয়েছে।
আরএসএস পরিচালিত দুই চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি যথাক্রমে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস, এদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এদের রুখে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে শামিল হয়েছে।
হিন্দুত্ব ও কর্পোরেট মেলবন্ধনেই
আরএসএস-বিজেপি
১১ বছর অতিক্রম করে প্রায় ১২ বছর ধরে এদেশে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে আরএসএস-বিজেপি’র শাসন চলছে। কর্পোরেটের শক্তি ও শোষণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান ভারতে ৩০০-রও বেশি বৃহৎ কর্পোরেট পরিবার, যাদের প্রত্যেকের সম্পত্তির পরিমাণ লক্ষ কোটি টাকারও অধিক। ১৪২ কোটি ভারতবাসী চরম অসাম্যের শিকার। দারিদ্রজনিত অভাব, পুষ্টিহীনতা, গৃহহীনতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য-কাজ এগুলির অভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে সমগ্র দেশে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মেহনতি মানুষের প্রতিবাদের অধিকারগুলি জোর করে কেড়ে নেওয়ার জন্য ‘লেবার কোড’-এর মতো অসভ্য বর্বর ও দমনমূলক ব্যবস্থাও মোদী সরকার দেশবাসীকে উপহার (!) দিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদের নামে এক ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ সমগ্র ভারতে বিভাজন ও বিভেদের শক্তিগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ ভারতের মর্মবস্তু অর্থাৎ বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের চরমতম বিরোধী। আরএসএস ভারতের সংবিধানকে মানে না। নারী বিদ্বেষী ও পশ্চাৎপদ জনতার প্রবল বিরোধী ‘মনুবাদ’ই এদের সংবিধান। হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রভাবে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ ও রাজনীতি বর্তমান ভারতে প্রবল রূপে মাথাচাড়া দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের জীবন ও নিরাপত্তা আজ গুরুতরভাবে আক্রান্ত।
তৃণমূলের বদান্যতায়
আরএসএস-বিজেপি’র শক্তিবৃদ্ধি
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অর্থাৎ আরএসএস তার ভিত পশ্চিমবঙ্গে অতীতে গড়ে তুলতে পারেনি। একদিকে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির ব্যাপক প্রভাব এবং শক্তিশালী শ্রেণি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপস্থিতি এরাজ্যে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক আরএসএস-কে মাথা চাড়া দিতে দেয়নি। ২০১১ সালে এরাজ্যের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদেরই মদতে এরাজ্যে সঙ্ঘ পরিবারের ব্যাপক শক্তিবৃদ্ধি ঘটে চলেছে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা কমরেড জ্যোতি বসুর ঐতিহাসিক উক্তি বিশেষভাবে স্মরণীয়: ‘পশ্চিমবঙ্গের জনগণের প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো আরএসএস-বিজেপি’র মতো ভয়ঙ্কর শক্তিকে তারা হাত ধরে বাংলায় নিয়ে এসেছে।’
স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিবাজ
তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসন
২০১১ থেকে ২০২৬, ১৫ বছর ধরে মেহনতি মানুষ সহ জনগণ প্রত্যক্ষ করছেন তৃণমূল কংগ্রেস দলের শাসনের নামে ভয়ঙ্কর অত্যাচার। ভোটাধিকার সহ মানুষের সমস্ত অধিকারের ওপর লাগাতার আক্রমণ সংঘটিত হয়ে চলেছে। কয়েক হাজার স্কুল ও মাদ্রাসা বন্ধ করে শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি লুটেরা পুঁজির দাপট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ‘মাল্টিস্পেশালিটি’র মতো গালভরা শব্দ ব্যবহার করলেও রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা বর্তমানে ভয়াবহ দুরবস্থার সম্মুখীন। উন্নত চিকিৎসার জন্য জনগণকে বেসরকারি ও মুনাফা সন্ধানী পুঁজির দ্বারা পরিচালিত নার্সিংহোম ও হসপিটালের দিকে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।
মিথ্যা প্রচারের ফানুস মমতা ব্যানার্জি সহ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস দল ও তাদের সরকারের পক্ষ থেকে ওড়ানোর চেষ্টা করা হলেও বিগত ১৫ বছরের তৃণমূলী শাসনে এরাজ্যে নতুন শিল্প ও শিল্পের জন্য নতুন বিনিয়োগ দুই-ই একেবারে তলানিতে এসে পৌঁছেছে। নতুন শিল্পের অভাবে এরাজ্যে কর্মসংস্থানের চিত্রটা বড়ই করুণ। ভিন রাজ্যে কাজের সন্ধানে চলে যাওয়ার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরাজ্যের কর্মপ্রার্থীরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
দুর্নীতিতে ভরে গেছে এরাজ্য। খাদ্য-রেশন-১০০ দিনের কাজ-নিযুক্তি সহ সমস্ত ক্ষেত্র নিয়েই দুর্নীতি। রাজ্য প্রশাসন, পঞ্চায়েত-পৌরসভা দুর্নীতিতে ভরে গেছে। দুর্নীতিবাজরা রাজ্য চালাচ্ছে। এরাজ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সর্বক্ষেত্রে ভয়াবহ দুর্নীতি। তৃণমূলীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, কে বড় দুর্নীতিবাজ।
এরাজ্যে ১৫ বছরের তৃণমূলী শাসনে নারীর সম্ভ্রম, মর্যাদা গুরুতরভাবে আক্রান্ত। বিগত ১৫ বছরে বহু মারাত্মক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নারীদের নিরাপত্তা রক্ষায় তৃণমূল কংগ্রেস সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। ধর্ষক, সমাজবিরোধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
এরাজ্যে আইনের শাসন নেই। তৃণমূলের দলদাস পুলিশ ও সমাজবিরোধী গুন্ডাদের রাজত্ব চলছে। সিন্ডিকেট-তোলাবাজ-অসৎ ঠিকাদারদের অসহনীয় দাপট চলছে পশ্চিমবঙ্গে। তৃণমূল আশ্রিত সমাজবিরোধীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।
তৃণমূল বিজেপি’র
বাইনারি রাজনীতি
আরএসএস’র বিবেচনায় কমিউনিস্টরা প্রধান শত্রু। শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের শক্তিকে ওরা ভয় পায়। আরএসএস’র ঘরে জন্ম নেওয়া ও সাম্রাজ্যবাদীদের মদতপ্রাপ্ত তৃণমূল কংগ্রেসের মূল শত্রু বামপন্থীরা, বিশেষত কমিউনিস্টরা। আরএসএস-বিজেপি ও তৃণমূলের বাইনারি অর্থাৎ বোঝাপড়ার রাজনীতির এটাই ভিত্তি। সেইজন্যই বিজেপি’র বহু নেতাই তৃণমূল থেকে আগত। লোকসভায় বিজেপি সরকারের বহু জনবিরোধী বিল পাশে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয় না। আবার রাজ্যের তৃণমূল মন্ত্রী ও নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের সিবিআই তদন্তও অগ্রসর হয় না।
বিকল্প কর্মসূচিই
বামেদের নির্বাচনী সংগ্রাম
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি’কে রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা অগ্রসর হচ্ছে। বিকল্প সরকার অর্থাৎ বিকল্প নীতির সরকার এরাজ্যে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বাম ও সহযোগীরা অগ্রসর হচ্ছে।
কেরালার বর্তমান বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সরকার ও এরাজ্যের ৩৪ বছরের বাম সরকার বিকল্পের নজির উপস্থিত করেছে।
‘সুস্থ’ ও উন্নত বাংলা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর আমরা। কৃষি ও কৃষকের স্বার্থরক্ষা করে কৃষি অগ্রগতি সুনিশ্চিত করা, নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপন সম্ভব করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বর্তমান অধোগতি রুখে দিয়ে উন্নতি ঘটানো, মানুষকে যুক্ত করে গ্রাম-শহরের উন্নয়নের ধারা, উন্নয়নের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, কৃষি ও শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে আরও কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন, শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুর সহ মেহনতি মানুষের স্বার্থরক্ষা করা, পঞ্চায়েত-পৌরসভাগুলিকে শক্তিশালী করা, মহিলাদের নিরাপত্তার সুনিশ্চিতকরণ, সমবায়কে জোরদার করা, আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা করা, সন্ত্রাসের অবসান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ, খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া সহ বিকল্প নীতিগুলিকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই নির্বাচনী সংগ্রামে বামপন্থী ও সহযোগীদের শামিল করতে সিপিআই(এম) তৎপর।
বিশেষ উল্লেখযোগ্য, প্রায় ৬১ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বিচারাধীন করে রাখার বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম। সকলের ভোটাধিকার, এটাই আমাদের দাবি।
গড়তে হবে বৃহত্তর ঐক্য
আরএসএস-বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী শক্তিগুলিকে সর্বতোভাবে ঐক্যবদ্ধ করেই সিপিআই(এম) ও বামফ্রন্ট অগ্রসর হচ্ছে। আরও নতুন বামপন্থী দল ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসে ইতিমধ্যেই বেশ কিছুটা সাফল্য এসেছে।
লড়াইয়ে চাই দৃঢ়তা ও সংকল্প
দুই চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে রুখে দেওয়া তথা পরাজিত করার লক্ষ্যে এবারের বিধানসভা নির্বাচন। মেহনতি মানুষ সহ জনগণের সাথে নিবিড় সম্পর্কই ব্যাপক মানুষকে আমাদের পক্ষে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। নির্বাচনী সংগ্রামে সভা-সমাবেশ সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘরে ঘরে প্রচার। সরাসরি মানুষের মধ্যে যাওয়া, আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের বক্তব্য তাদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া। একমাত্র প্রতিটি বুথে সংগঠন গড়েই একাজ করা সম্ভব। প্রতিটি বুথে কমিটি অর্থাৎ সংগঠন গড়বোই — এই সংকল্প গ্রহণ করেই অগ্রসর হতে হবে। শুধু বুথ সংগঠন গড়লেই হবে না, বুথ কমিটিকে হতে হবে সক্রিয় ও সচল।
একমাত্র সক্রিয় ও সচল বুথ সংগঠনই জনগণের সাথে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম। বিরোধীদের প্রলোভন ও মিথ্যা প্রচার চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে সঠিক বক্তব্য ও যুক্তি উপস্থিত করে প্রচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিপিআই(এম) ও বামকর্মীদের বলার মতো রয়েছে বহু বিষয়। সেগুলি সম্পর্কে অবহিত হয়েই এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সংগ্রামে আমাদের সকলকে অবতীর্ণ হতে হবে।
রাজ্যে শ্রেণি শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও আরএসএস-বিজেপি বিরোধী বিকল্প শক্তিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। বামফ্রন্ট ও সহযোগী শক্তিকে জয়যুক্ত করতেই হবে।
এই রাজ্যে এক নতুন ইতিহাস গড়ে তুলতে আমাদের অগ্রসর হতেই হবে।
চরম দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে মেহনতী জনগণের স্বার্থবাহী বামপন্থার সংগ্রামের মঞ্চ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। বাম পরিসরকে আরো বৃদ্ধি করে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে যুক্ত করে এই নির্বাচনী সংগ্রামে সামিল হয়েছে বামফ্রন্ট। বিজেপি, তৃণমূল এবং কংগ্রেসও এই নির্বাচনে সামিল । আরএসএস পরিচালিত বিজেপি ও তৃণমূল, এদের রুখে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
Comments :0