শমীক লাহিড়ী
ক্ষমতা কখনও কেবল শাসন করে না; সে ভাষ্য নির্মাণ করে। সেই ভাষ্যই ধীরে ধীরে সমাজে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে। এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের নির্বোধ আস্ফালন— যা নিজেকে যুক্তিসম্মত বলে প্রতিষ্ঠা করে, অথচ তার ভিত গড়ে ওঠে আতঙ্ক সৃষ্টি, দমন এবং বিকৃত সত্যের ওপর। এই ‘নির্মিত বাস্তবতা’র বিরুদ্ধে যে কণ্ঠ উচ্চারিত হয়, তাকে সমাজ প্রায়শই ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত করে।
এই ‘পাগল’ধারণাটি ক্ষমতার একটি কৌশলগত নির্মাণ, এবং উৎপল দত্ত তাঁর নাটকে এই নির্মাণকে উলটে দিয়ে প্রতিরোধের এক অনন্য ভাষা তৈরি করেন। পাগলামি, ভাষ্য ও আধিপত্য।
মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, ‘পাগলামি’ কোনও প্রাকৃতিক বা নিরপেক্ষ অবস্থা নয়; বরং এটা একটা ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত ‘Discourse’ মানে ‘ভাষ্য’ বা ‘বয়ান’। সমাজই নির্ধারণ করে কে যুক্তিসঙ্গত, আর কে উন্মাদ। এই নির্ধারণের মধ্যেই ক্ষমতা কাজ করে— কারণ ‘পাগল’কে চিহ্নিত করা মানে তার ভাষ্যকেই অগ্রাহ্য করা।
অ্যান্টোনিও গ্রামসি-র ‘Hegemony’ অর্থাৎ ‘আধিপত্য’-এর তত্ত্ব আমাদের শেখায়, ক্ষমতা কেবল দমন করে না— সে ‘সম্মতি’ আদায়ও করে। এই সম্মতি এমনভাবে গড়ে ওঠে যে, শোষিতরাও শাসকের ভাষ্যকে নিজের কথা বলে মেনে নেয়। ফলে ‘স্বাভাবিকতা’ হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক নির্মাণ।
এই দুই তত্ত্বকে বিবেচনা করলে দেখা যায়— ‘পাগল’ আসলে সেই ব্যক্তি, যে ‘Dominant Discourse’ অর্থাৎ শাসকের ভাষ্যর বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলে। আর তাই, তাকে অস্বাভাবিক বা ‘পাগল’ বলা হয়।
এই ধারণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ নাট্যরূপ আমরা পাই রক্তকরবী-তে বিশু পাগলার চরিত্রে। যক্ষপুরীর যান্ত্রিক, দমনমূলক সমাজে বিশু এক ‘পাগল’— সে নিয়ম মানে না, চলতি যুক্তির সরলরেখায় হাঁটে না, কিন্তু তার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয় মুক্তির স্বপ্ন। সমাজ তাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে চিহ্নিত করে, কারণ সে প্রতিষ্ঠিত বয়ানের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলে. ইতিহাসের পাগল, প্রতিরোধের উত্তরাধিকার ক্রমবহমান।
যখন তেভাগা আন্দোলনের কৃষক জমির অধিকার দাবি করে, যখন মেয়েরা নিজেরাই রাতের দখল নেয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে-বিদ্রোহে— তখন তাদের ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘পাগল’ বলা হয়।
ভগত সিং-এর স্লোগান, ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান, সুভাষ বসুর দেশপ্রেমের উদাত্ত আহ্বান — সবই একসময় শাসকের চোখে ছিল পাগলামি, আর সাধারণের চোখে উন্মাদনা।
এই ইতিহাস আমাদের শেখায়— ‘পাগল’ আসলে ভবিষ্যতের কথা বলে।
নাট্যমঞ্চে পাগলের পুনর্জন্ম দেখি উৎপল দত্তের নাটকে। তিনি ‘পাগল’-কে নাটকের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন বারেবারে। তাঁর কাছে ‘পাগল’ কোনও প্রান্তিক চরিত্র নয়; বরং সে সত্যের বাহক। টিনের তলোয়ার-এ আমরা দেখি, ক্ষমতা একটি মিথ্যা বাস্তবতা নির্মাণ করে। ব্যারিকেড-এ এই প্রতিরোধ সংগঠিত হয়। কিন্তু এই ভাবনার সবচেয়ে ঘনীভূত রূপ পাওয়া যায়— দুঃস্বপ্নের নগরী-তে।
এই ধারাটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্যভাবনায়ও আমরা এর পূর্বসূত্র খুঁজে পাই, যা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। রক্তকরবী’র বিশু পাগলা হলো সেই ‘পাগল’, যে ক্ষমতার নির্মিত যন্ত্রসভ্যতার বিরুদ্ধে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত, অনিয়ন্ত্রিত মানবিকতার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে যেখানে রবীন্দ্রনাথের বিশু অধিকতর প্রতীকী ও কাব্যিক, সেখানে উৎপল দত্ত সেই ‘পাগল’-কে আরও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বাস্তবতায় নামিয়ে আনেন।
মিলান ও লালবাজারের নাট্যসংলাপ যদি দেখা যায় তাহলে এই নাটকে কলকাতা শহর নিজেই এক রাষ্ট্রচরিত্র— নজরদারির, আতঙ্কের, বিকৃত বয়ানের শহর। এখানে লালবাজার হয়ে ওঠে ক্ষমতার কেন্দ্র, যেখানে সত্য ঢুকে মিথ্যায় রূপান্তরিত হয়।
এই নির্মাণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতালির সেই ঘটনা ‘Giuseppe Pinelli Death’ (জিউসেপ্পে পিনেল্লি মৃত্যুকাণ্ড)। যার প্রেক্ষিতে ইতালির নাট্যকার দারিও ফো লিখেছিলেন ‘Accidental Death of an Anarchist’। কিন্তু যেখানে দারিও ফো-র নাটকে ‘পাগল’ একটি নির্দিষ্ট চরিত্র, সেখানে উৎপল দত্ত সেই ধারণাকে ছড়িয়ে দেন দর্শকের মাঝে। তাঁর নাটকে ‘পাগল’ কেবলমাত্র একটি চরিত্র থাকে না, এটা সংক্রামিত হয় দর্শকদের মধ্যেও।
দুঃস্বপ্নের নগরী-তে ‘পাগল’ কখনো বন্দির কণ্ঠে, কখনো ভাঙা সংলাপে
কখনো নিঃশব্দ উপস্থিতিতে— এখানে ভাষা নিজেই ভেঙে পড়ে। সংলাপ আর সরলরৈখিক থাকে না। একই ঘটনার বহু ভাষ্য তৈরি হয়। এখানেই গ্রামসি বর্ণিত Hegemony বা আধিপত্য ভেঙে পড়ে, কারণ ‘পাগল’ সম্মতি দিতে অস্বীকার করে। এই ভাঙন ফুকোর discourse তত্ত্বকে নাট্যময় করে তোলে।
সত্যও নির্মিত হয়। পুলিশ হেপাজতে থাকা এক বন্দির মৃত্যুতে রাষ্ট্র বলে— ‘এটা নিছকই দুর্ঘটনা।’ অথবা ‘সে নিজেই পড়ে মরে গেছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি।‘পাগল’এই কথায় সম্মতি না দিয়ে প্রশ্ন তোলে — ‘কেন?’
এই ‘কেন’ই বিপজ্জনক। কারণ এটি যুক্তির বিরুদ্ধে নয়— এ আসলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ এক প্রশ্ন।
এখানেই গ্রামসি বর্ণিত আধিপত্যবাদ ভেঙে পড়ে। কারণ ‘পাগল’ রাষ্ট্রের বয়ানে সম্মতি দিতে অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্ত কে পাগল? নাটকের শেষে প্রশ্নটি আর মঞ্চে সীমায়িত থাকে না — দর্শকের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।
এই অস্বীকৃতির সুর আমরা বিশু পাগলের মধ্যেও শুনতে পাই। সে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষায় কথা না বললেও, তার ‘অযৌক্তিকতা’ আসলে এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ। যক্ষপুরীর সোনার খনির অমানবিক শৃঙ্খলার মধ্যে বিশু’র ‘পাগলামি’ই হয়ে ওঠে একমাত্র মুক্ত ভাষ্য— যা আধিপত্যের বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিরোধ। নন্দিনীই একমাত্র তাঁকে বুঝেছিল, তাই সে তাকে বিশুভাই সম্বোধন করতো।
‘আমি কি খুব সহজে বিশ্বাস করি?’ ‘আমি কি প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি?’ - এই প্রশ্ন জাগার মুহূর্তেই ‘পাগলামি’ সংক্রামিত হয়। দর্শক নিজেই ‘স্বাভাবিকতা’-কে সন্দেহ করতে শুরু করে।
‘পাগল’ — এই শব্দটি তাই পুনর্নির্মাণের দাবি রাখে। এটা কোনও দুর্বলতা নয়; বরং এটা এক জ্ঞানসঞ্জাত প্রতিরোধ বা Epistemic Resistance। উৎপল দত্ত তাঁর নাটকে বারবার দেখিয়েছেন— ‘পাগল’ মানে সেই ব্যক্তি, যে সত্যকে প্রশ্ন করে না, বরং মিথ্যাকে প্রশ্ন করে। মিলান থেকে লালবাজার— একটি মৃত্যু, একটি শহর, একটি নাট্যভাষা— সব মিলিয়ে জন্ম নেয় এক নতুন রাজনৈতিক সত্তা। সে হাসে, সে ভাঙে, সে প্রশ্ন তোলে— আর সেই প্রশ্নই ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
উৎপল দত্ত আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন— অনাচার, দুর্নীতি, কণ্ঠরোধ, মানুষের অধিকার হরণ, নারীর সম্মান লুট, রাষ্ট্রশক্তির কুৎসিত আস্ফালনের বিরুদ্ধে অনেক পাগলের জন্ম হবে কী? কারণ ইতিহাসের অগ্রগতিতে এই ‘পাগল’রাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
মিলান থেকে লালবাজার ,স্পার্টাকাস থেকে ‘অভয়া’, ফুচিক থেকে সুদীপ্ত, স্তালিনগ্রাদ থেকে সিঙ্ঘু-টিকরি-ঘাজিপুর বর্ডার,এক একটি মৃত্যু, এক একটি চরিত্র, এক একটি শহর - তবে একই নাট্যভাষা — সব মিলিয়ে জন্ম নেয় এক নতুন রাজনৈতিক সত্তা। সে হাসে, সে ভাঙে, সে প্রশ্ন তোলে— আর সেই প্রশ্নই ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সেই অর্থে বিশু পাগল থেকে শুরু করে উৎপল দত্তের বিভিন্ন নাটকের ‘পাগল’চরিত্র— তারা সবাই একই ধারার উত্তরসূরি। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ সময়ে ‘স্বাভাবিকতা’-র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছে, এবং সেই প্রশ্নই ইতিহাসকে নতুন দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
আজ বাংলা এবং ভারতবর্ষ ক্রমশ এক দুঃস্বপ্নের রাজত্বে পরিণত হয়েছে— যেখানে বাস্তবতা আর ভাষ্যের সীমারেখা মুছে গিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ ‘স্বাভাবিকতা’ যা আসলে আতঙ্কিত মননের নীরবতারই প্রতিফলন। এই সময় তাই প্রয়োজন আরও অনেক ‘পাগল’-এর— যারা এসব অনাচারকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে অস্বীকার করবে। প্রয়োজন সেই প্রতিস্পর্ধার, যা নীরব সম্মতিকে ভেঙে দেয়; প্রয়োজন সেই কণ্ঠের, যা জমে থাকা ক্ষোভকে ভাষা দেয়। কারণ মানুষের সম্মিলিত অস্বীকৃতি যখন সঞ্চিত হয়, তখন তা নিছক ক্রোধ থাকে না— তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার বিপ্লবী শক্তি।
আজ রাজ্য ও দেশ অপেক্ষা করে আছে সেই প্রশ্নের, সেই অস্বীকৃতির, সেই প্রতিস্পর্ধার; যা কেবল শাসক বদলের দাবি তোলে না, বরং শাসনের ভাষাটাকেই বদলে দিতে চায়।
Comments :0