গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
ঝিনুক ও ডাক্তার দাদু
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"কি রে, কি হোলো তোর আবার?"
দশ বছরের ঝিনুককে ওর বাবার হাত ধরে তাঁর চেম্বারে ঢুকতে দেখা মাত্রই কথাকটা বললেন ডাক্তার সৌম্য ব্যানার্জি ঝিনুককে উদ্দেশ্য করে।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে নামকরা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার এই সৌম্য ব্যানার্জি। লোকে তাঁকে বলে ধন্বন্তরি। বয়স তাঁর আশির কোঠায়। তবে তা দেখে বোঝার উপায় নেই। শরীর স্বাস্থ্য এখনও বেশ মজবুত তাঁর। হাসিখুশি মানুষটাকে ভালোবাসে সবাই। তার মধ্যে আছে ঝিনুকের মতোন ছোটোরাও। ওদের তিনি ডাক্তার দাদু।
"ওর কিছু হয় নি। ও কি একটা বলতে এসছে আপনাকে ডাক্তারবাবু! আর কি যেন একটা..." ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে, চেম্বারের মধ্যে দু'পাশে যে দুটো লম্বা বেঞ্চি রাখা পেশেন্টদের বসার জন্য, তারই একটাতে বসতে বসতে কথাগুলো বলছিলেন ঝিনুকের বাবা প্রসেনজিৎবাবু। কিন্তু মেয়ে হঠাৎ ওনার হাতটা খামচে ধরে চোখের ইশারায় কি যেন একটা বলায়, শেষ বাক্যটা আর শেষ না করেই থেমে গেলেন তিনি।
ব্যাপারটা চোখ এড়ায় না ডাক্তার ব্যানার্জিরও। তবু সেটা নিয়ে তিনি আর উচ্চবাচ্য না করে ঝিনুককে বললেন, "আমাকে কিছু বলবি? ঠিক আছে। একটু বস্। এই দাদুটাকে দেখছি, দেখে নিই, তারপর শুনছি তোর কথা। তুই বস্।"
ঝিনুক ঘাড় নেড়ে বাবার পাশটাতে বসে।
ডাক্তার ব্যানার্জির মিনিট পাঁচেক মতোন লাগলো ফ্রি হতে। এখন চেম্বারে আর কোনো পেশেন্ট নেই। যে কলমটা দিয়ে প্রেসক্রিপসন লিখছিলেন এতোক্ষণ, সেটা সামনের টেবিলের উপর রাখা পেন-স্ট্যান্ডটায় গুঁজে রেখে, তিনি এবার সোজা তাকালেন ঝিনুকের দিকে। তারপর বললেন, "বল্ এবার, কি বলবি শুনি।"
ঝিনুক ওর বাবার দিকে তাকায়। বলে, "বাবা, ওটা বের করে দাও।"
প্রসেনজিৎবাবুর সাথে ছিল একটা কাপড়ের ব্যাগ। "হুঁ, দাঁড়া দিই।" বলে ব্যাগটার চেন খুলে একটা খবরের কাগজে মোড়া মাঝারি মাপের কি যেন একটা দেন তিনি মেয়ের হাতে। তারপর বলেন ঝিনুককে, "সাবধানে ধর্।"
ছোট্ট ঝিনুক জিনিসটা দু'হাতে ধরে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ডাক্তার ব্যানার্জির একেবারে সামনে, তাঁর মুখোমুখি। তারপর আলতো করে বলতে থাকে সে ধীরে ধীরে, "ডাক্তার দাদু, আমার মা-র সেদিন রাতে খুব শরীর খারাপ হোলো না, বাবা তোমাকে ডেকে নিয়ে গেল আমাদের বাড়ি, সারা রাত থাকলে তুমি সেখানে, মা-কে ভালো করে দিয়ে তবে সকালে তোমার বাড়ি ফিরলে, তাই, এটা তোমার জন্য এনেছি। তুমি নাও।" বলে হাতে ধরা জিনিসটা এগিয়ে দেয় ঝিনুক ডাক্তার ব্যানার্জির দিকে।
এতোদিন প্র্যাকটিস করছেন ডাক্তার ব্যানার্জি, পেশেন্ট ভালো করে অনেক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা পেয়েছেন, কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ের কাছ থেকে এমন আন্তরিক ভাবে কিছু পাওয়া তাঁর সুদীর্ঘ ডাক্তারি জীবনে এই প্রথম। তিনি তাই একপ্রকার কিংকর্তব্যবিমূঢ়ই হয়ে পড়লেন। চোখে জলও চলে এল তাঁর। তিনি কোনোমতে নিজেকে সামলে হাতে ধরা জিনিসটার মোড়ক খুললেন দ্রুত। আর খুলতেই দেখতে পেলেন, তাঁরই একটা ছবি এঁকেছে ঝিনুক। ছবিটায় তিনি বসে আছেন এই চেম্বারে। পেশেন্ট দেখছেন।
কাঠের ফ্রেমে সুন্দর করে বাঁধানো ছবিটা দেখে নিজের আবেগকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ডাক্তার ব্যানার্জি। ছবিটা সামনের টেবিলে রেখে ঝিনুককে দু'হাতে টেনে নিলেন তিনি তাঁর বুকের মাঝে। জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। ঝরঝরিয়ে কাঁদতেই থাকলেন তিনি।
Comments :0