Transgender bill protest

ট্রান্সজেন্ডার বিলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীদের

জাতীয়

‘ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ নিয়ে প্রতিবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আইনজীবী, নারীবাদী, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মিলিয়ে ১৪০ জনেরও বেশি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তিনি যেন এই বিলে সম্মতি না দেন। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদেই যেন ফিরিয়ে দেন তিনি। 
‘অল ইন্ডিয়া ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স’ এবং ‘ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্টিস’, ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রাইটস’-এর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, বিলটি অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো করে সংসদে পাশ করানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আলোচনা, পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষদের থেকে কোনও পরামর্শও নেওয়া হয়নি। বিলটি স্ট্যান্ডিং কমিটি বা সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ভিত্তিতে মতামত নেওয়া উচিত ছিল। অভিযোগ উঠেছে, ১৩ মার্চ এই বিল সংসদে আনা হয়। অনেক সাংসদই তা পড়ে দেখার সময়টুকুও পাননি। ‘প্রি-লেজিসলেটিভ কনসালটেশন পলিসি, ২০১৪’ এক্ষেত্রে মানা হয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাশ করার আগে জনমত, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া মানা হলো না। ১১দিনের মাথায় ২৪ মার্চ লোকসভায় এবং পরের দিন ২৫ মার্চ রাজ্যসভায় বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। তার আগে  বিলটি বিবেচনার জন্য উত্থাপিত হলে বিরোধী সাংসদরা বারবার স্ট্যান্ডিং কমিটিতে বিল পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন। এমনকি ফিনান্স বিল নিয়ে আলোচনার জবাব স্থগিত রেখে হঠাৎ এই বিল পাশ করানো হয় বলেও অভিযোগ। বিজেপি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক এড়িয়ে বিল পাশ করিয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। লোকসভা থেকে বিরোধীরা ওয়াকআউট করলেও ধ্বনিভোটে বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। 
আবেদনকারীরা আরও অভিযোগ করেছেন, ট্রান্সজেন্ডারদের জাতীয় কাউন্সিল থেকে এই সংশোধনী আনার আগে কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। কাউন্সিলের সদস্যদের হঠাৎ করে দিল্লিতে ডাকা হলেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে দেখা করেননি। এই ঘটনার প্রতিবাদে কাউন্সিলের একাধিক সদস্য পদত্যাগও করেছেন। সংসদে বিল পেশ হওয়ার পর থেকেই বিরোধী সাংসদদের সঙ্গেই ট্রান্সজেন্ডাররাও বারবার অভিযোগ করেছেন, এই সংশোধনী বিল সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের ঐতিহাসিক নালসা রায়ের বিরোধী। সেই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্ব-নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয়কে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে সেই অধিকার কার্যত খর্ব করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ লাগবে এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সেই সুপারিশ পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ স্ব-পরিচয়ের বদলে প্রশাসনিক ও চিকিৎসাগত অনুমোদনের উপর নির্ভর করতে হবে। এই বিষয়টি সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করা হলেও কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নিজের শরীরের উপর নিজের অধিকার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের পুট্টাস্বামী মামলায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। এই বিল সেই অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে সংশোধিত ১৮ নম্বর ধারার নতুন নিয়ম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কাউকে জোর করে ‘বাহ্যিকভাবে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় প্রকাশ্যে বাধ্য করা’ অপরাধ। কিন্তু একই সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সংজ্ঞা সংকুচিত করায় স্ব-নির্ধারিত পরিচয়কেই সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে বলেও আশঙ্কা। ফলে ট্রান্সজেন্ডার এবং তাঁদের সহায়ক সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে আইন ব্যবহার করা হতে পারে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই বিল বাস্তবে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার সুরক্ষিত না করে তাঁদের আরও বেশি করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসবে। সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

Comments :0

Login to leave a comment