Left Alternative

মোছা যাবে না বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য

বাংলা বাঁচানোর ভোট

গণতন্ত্র যখন সারা দেশে আক্রান্ত, সাতের দশকের আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসে বাংলার মাটিতে যখন প্রাণ দিয়েছিলেন শত শত বামপন্থী কর্মী তখনও বাংলাকে বাঁচিয়ে গণতন্ত্রের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছিল বামফ্রন্ট। জরুরি অবস্থার আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের সময়েও এরাজ্যের মানুষ আধা সামরিক বাহিনীর দাপট দেখেছে, কিন্তু তারা গণতন্ত্র বাঁচায়নি। বামপথ বেছে নিয়ে রাজ্যের মানুষই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিল। এখনও বাংলার মানুষকেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র রক্ষায় নামার আহ্বান জানিয়ে লড়াইতে নেমেছে বামপন্থীরা। বাংলাই আবার দেশকে পথ দেখাবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার
জরুরি অবস্থার শেষে ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হয়েছিল। সরকারে বসার পরে প্রথমেই জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সরকার সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিয়েছিল। কিছু রাজনৈতিক বন্দির বিরুদ্ধে মামলা ছিল অন্য রাজ্যেও। জ্যোতি বসুর নির্দেশে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেইসব রাজ্যে গিয়ে সেখানকার সরকারগুলিকেও অনুরোধ করেছিলেন মামলা প্রত্যাহার করতে। বাক্‌ স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিল বামপন্থীরা। 
শুধু মহাকরণ থেকে সরকার চলবে না, সরকার চলবে গ্রামে গ্রামে মানুষের ক্ষমতায়ন করে। এটাই ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘোষণা। সেই অনুসারে পশ্চিমবঙ্গেই সারা দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন করা হয় ১৯৭৮ সালে। গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন ব্যবস্থার প্রচলন হয়। এরপরে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পৌর নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পরবর্তীতে পঞ্চয়েত ও পৌর আইনে পরিবর্তন করে গ্রামসভা এবং ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হয়। বামফ্রন্ট সরকারই দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম পশ্চিমবঙ্গে ১৮ বছরে ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছিল পঞ্চায়েত ও পৌর নির্বাচনে। মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক সঙ্গী অজিত পাঁজা তখন এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি। বামফ্রন্ট সরকারই পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় এক তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করেছিল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মহিলাদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার সারা দেশকে পথ দেখিয়েছিল।

জমির অধিকার 
শুধু রাজনৈতিক অধিকারের সম্প্রসারণ নয়, গ্রাম বাংলায় হতদরিদ্র মানুষদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটাতে বামফ্রন্ট সরকার আসার পরেই ভূমিসংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছিল। সিলিং বহির্ভূত জমি খাস করে নিয়ে জমিদারি প্রথার অবসান ঘটানো হয়। পাট্টা বিলি করা হয় ভূমিহীনদের মধ্যে। খেতমজুরদের উচ্ছেদ ঠেকাতে বর্গা রেকর্ড করা হয়। বর্তমান তৃণমূলের তৎকালীন নেতারা বামফ্রন্টের সেই সব পদক্ষেপের বিরোধিতা করে এগুলিকে গ্রামাঞ্চলে বামেদের জমি ডাকাতি বলে প্রচার করেছিল। জমির অধিকার পেতে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে ব্যাপক সংগ্রাম করতে হয়েছিল লাল ঝান্ডা হাতে। কৃষক আন্দোলনের শক্ত জমিতে বামফ্রন্ট সরকারই জমির অধিকার নিশ্চিত করেছিল গরিবের। পশ্চিমবঙ্গের ৩০ লক্ষাধিক কৃষকের হাতে বণ্টন করা হয়েছিল ১১ লক্ষ ২৭ হাজার একর জমি। মহিলা এবং তফসিলি জাতি ও আদিবাসী মানুষের নামে পাট্টা ও বর্গা রেকর্ডের ফলে বাংলায় তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটেছিল। পরবর্তীতে বাস্তুজমিও দেওয়া হয়েছিল। দেশভাগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তু মানুষদেরও দেওয়া হয়েছিল নিঃশর্ত জমির স্বত্ব। সরকারি খাস জমিতে দীর্ঘদিন বসবাসকারীদের মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে জমির ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া হয়েছিল। শহরাঞ্চলে গরিবের বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে ঠিকা প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করা হয়েছিল।

কৃষি উৎপাদনে সাফল্য
পশ্চিমবঙ্গ ছিল খাদ্যাভাবের রাজ্য। ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে সাফল্য এসেছিল। সেই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কৃষিতে পরিকল্পনা করে উন্নয়ন ঘটিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। উন্নত বীজ, সার, গণবণ্টন ব্যবস্থা, চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি, সেচের মাধ্যমে একফসলি জমিকে দুই এবং তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা ইত্যাদির ফলে পশ্চিমবঙ্গ খাদ্যে উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৭৬-৭৭ সালে রাজ্যে ৭৪ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য উৎপাদন হয়েছিল। ২০১০-১১ সালে এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৭০ লক্ষ মেট্রিক টন। শুধু খাদ্যশস্য নয়, মাছ উৎপাদনেও ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটিয়ে দেশে প্রথম স্থান লাভ করে পশ্চিমবঙ্গ। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যাবস্থা করে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ানো হয়েছিল, কর্মসংস্থানও করা হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে গ্রাম বাংলার এই সাফল্যের কারণেই পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ দারিদ্র হ্রাসে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখাতে পেরেছিল। সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে দারিদ্রসীমার নিচ থেকে ওপরে তুলে আনতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকারই।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য
বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে আনা। শিক্ষা জগৎকে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত করা। ২০১০-১১ সময়কালের মধ্যে রাজ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়, ৪৫০টি ডিগ্রি কলেজ, ২৯টি আইটিআই, ৪৩টি পলিটেকনিক কলেজ, ৬৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ৪৫টি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট, ১২৮টি বি এড কলেজ, ২৩টি আইন কলেজ এবং ৪টি আর্ট কলেজ এবং ২৯টি শারীরশিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ রয়েছে। রাজ্যে উচ্চশিক্ষায় ৫১০টি নতুন বিষয় পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। ২০০৬-১১ সময়পর্বের মধ্যে গঠিত হয়েছিল ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭৩টি কলেজ। পাশাপাশি রাজ্যে শিক্ষায় গণতন্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করতে গঠন করা হয় কলেজ সার্ভিস কমিশন, পশ্চিমবঙ্গ উচ্চশিক্ষা সংসদ, স্কুল সার্ভিস কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ড।
১৯৭৭ সালে রাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল মাত্র ৯টি। ২০১১ সালে রাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯০টি। আসন সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৭৫১। ২০০১ সালে কারিগরি, প্রযুক্তি সংক্রান্ত এবং ম্যানেজমেন্ট শিক্ষাকে সংহত করতে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি নামে একটি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯২-৯৩ সালে উচ্চশিক্ষায় রাজ্যে বরাদ্দ হয়েছিল ২২০
কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। ২০০০-০১ সালে উচ্চশিক্ষায় রাজ্য সরকার খরচ করেছে ৫২৬ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা। সেই বরাদ্দের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ২০১০-১১ সালে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা। ১৯৭৬-৭৭ সালে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে রাজ্য সরকার খরচ করত ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। ২০০৯-১০ সালে ৬১০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে যে সমস্ত শিশুরা স্কুলে যেত, তার ৮৫.৪ শতাংশ সরকার পরিচালিত স্কুলে যেত। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৬৬টি। বামফ্রন্ট সরকার ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৩৪৮টিতে পরিণত করে। ১৯৯৮ সাল থেকে বামফ্রন্ট সরকার সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নয় বার শিক্ষক নিয়োগ করেছে। কখনো কোনো নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ কেউ তুলতে পারেনি।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সাফল্য
বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের উন্নয়ন ঘটানোয় স্বাস্থ্যসূচকগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছিল। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুর সংখ্যা কমেছিল উল্লেখযোগ্য হারে। প্রসূতি মৃত্যুর সংখ্যা সারা দেশে ২০১০ -১১ সালে ছিল প্রতি লক্ষে ২৫৪ জন, পশ্চিমবঙ্গে তা ছিল ১৪১ জন। শিশুমৃত্যুর হার সারা দেশে ছিল প্রতি হাজারে ৫৩ জন, পশ্চিমবঙ্গে ছিল ৩৫ জন। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ১৩২৬টি। ২০১০ সালে বামফ্রন্ট সরকার তা বাড়িয়ে ১২ হাজারে নিয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ও টিকাকরণে রাজ্যের সাফল্য ছিল দৃষ্টান্ত। সারা দেশে যখন ৪১ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা পেতেন তখন পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে রাজ্যের ৭৩শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা পেতেন।

শিল্পায়ন
কৃষিতে উন্নয়নের সাফল্যের ভিতের ওপরে দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল শিল্পায়নের। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যের শিকার হয়েছিল বাংলা। এরাজ্যে শিল্পায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের লাইসেন্স নীতি ও মাসুল সমীকরণ নীতি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নয়ের দশকে তা উঠে যাওয়ার পরে বামফ্রন্ট সরকার সাফল্য পেতে শুরু করে শিল্পায়নে। এর আগেই শিল্প পরিকাঠামো উন্নত করতে ও বাংলায় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল বক্রেশ্বর বিদ্যুৎ প্রকল্প। হলদিয়াতে গড়ে তোলা হয় পূর্ব ভারতের প্রথম পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প। সল্টলেকে গড়ে তোলা  হয় ইলেকট্রনিক্স শিল্প। পরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, রাজারহাটে গড়ে তোলা হয়েছিল জ্যোতি বসু নগর। বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগের কারণে শেষ দশ বছরের প্রতি বছরে গড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি শিল্প বিনিয়োগ আসছিল। ২০০৯ সালে বিনিয়োগ এসেছিল সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার হিসাবে উঠে আসা তথ্যে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে ছোটো ও মাঝারি শিল্পে। এরই মধ্যে সিঙ্গুরে অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল টাটারা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের জেরে তা পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে যায় গুজরাতটে।  
 

Comments :0

Login to leave a comment