নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা
নবমী নিশির গান
কৃশানু ভট্টাচার্য্য
২০ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
আজ তো নবমী। পূজার মধ্যে এই দিনটাতে প্রীতিসাদের বাড়িতে একটু ব্যস্ততা বেশি। কালকে ভোরবেলায় ওর ছোট কাকার ফ্লাইট। চলে যাবে ব্যাঙ্গালোরে। ওখানেই থাকেন। কাকু আইটি সেক্টরে চাকরি করে। সপ্তমীর দিন ভোরবেলা এসেছিল। আজকে আবার ওদিকে দশেরা। কাল থেকে অফিস শুরু। কাকাকে চলে যেতে হবে। সকাল থেকে এই মুখটা ভার করে ঠাকুমা নানা ধরনের খাবার তৈরি করছেন। নারকেল গুড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে নাড়ু। তৈরি হচ্ছে মুরকি। যদিও প্লেনে খাবার নিয়ে যাওয়া নিয়ে খুব সমস্যা তবুও ওই নানা রকম কায়দা কানুন করে কাকা নিয়ে যাবে খাবারগুলো। ওগুলো যে তার বড় প্রিয়। এবার পুজোয় কাকা প্রীতিসাকে একটা ক্যাপ বন্দুক কিনে দিয়েছে। যদিও বন্দুকটা দিয়ে প্রীতিসা কটা ফাটিয়েছে তার হিসেব নেই বেশি ফাটিয়েছে কাকাই। বাবা পাড়ার পূজো নিয়ে ব্যস্ত। তাই বাড়ির লোকদেরকে আনন্দে রাখার দায়িত্বটা যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল কাকা। কাল সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেবে কাকা। কাজেই বড়দের সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিসারও মনটা বড় খারাপ।
আজ দুপুরে পাড়ায় খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেলের দিকে বাবা বাড়িতে ফিরতে বাবার কাছে গিয়ে হাজির হলো প্রীতিসা।
" আচ্ছা বাবা, এই যে কাকা চলে যাচ্ছে কালকে তোমার মন খারাপ লাগছে না?"
"মন খারাপ করে হবে কি? এছাড়া আর কি কোন উপায় আছে। শুধু তোর কাকা কেন, কাল এয়ারপোর্টে রেল স্টেশনে গেলে দেখবি, হাজার হাজার লোক সব পুজোতে বাড়িতে এসেছিল, ছুটি শেষ ফিরে যাচ্ছে। তাদের বাড়িতেও তো মন খারাপ। আমাদের রাজ্যের অধিকাংশ পরিবারেই কেউ না কেউ আছে যাদের কাজের জন্য নিজেদের রাজ্যে আর থাকা হয় না। নিজেদের দেশেও থাকা হয় না। তাদের সবার পক্ষে ছুটিতে বাড়িতে আসা ও সম্ভব নয়। কিন্তু ওই পুজোর কদিন কেউ আসতে পারে। তাদেরকে আবার চলে যেতে হয়। সে কারণেই বলে নবমী রাত যেন না শেষ হয়।"
" আচ্ছা বাবা, কালকে তো দশমী। প্যান্ডেলে আলো খুলে নেবে, তারপর ঠাকুর বিসর্জন দিয়ে দেবে। ঠাকুর রেখে দেওয়া যায় না? "
" বোকা মেয়ে, মা দুর্গার চার দিন বাপের বাড়িতে আসেন। তার তো কত কাজ! আবার তাকে ফিরে যেতে হয় নিজের বাড়িতে। ঠিক যেমন তোর কাকা এসেছে , তাকে ফিরে যেতে হবে আবার কাজের জায়গায় ঠিক তেমনি। মন খারাপ তো হবেই । সেই কারণেই শুনিস না, আসছে বছর আবার হবে। এটাই তো পুজোর মজা, আবার পুজো শেষের কষ্ট- যা বলবি।"
বলতে বলতে বাবার গলাটা একটু যেন ধরে আসে। প্রীতিসা বুঝতে পারে বাবা আজকে বিশেষ কিছু বলতে চাইছে না। ওর মনে অনেক প্রশ্ন ছিল? কেন কাকাদের মত সবাই কাজ করতে বাড়ির বাইরে যায়? কেন তাদেরকে এখানে কোন কাজ দেওয়া যায় না? কিন্তু যত সময় এগোতে থাকছে তত যেন বাড়ির পরিবেশটা থমথমে হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুমা প্রায় চুপ করে আছে। মার মুখে ও সেরকম কোন কথা নেই। বাবা আর কাকা আস্তে আস্তে কি সব নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। হয়তো কোন দরকারী কাজের কথা। প্রীতিসা সেখানে গিয়ে আর নাক গলায় নি। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে এই চার দিনের আনন্দ শেষ হতে চলল।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে। হঠাৎ করেই পাড়ার প্যান্ডেল থেকে মাইকে একটা গান বেজে উঠলো- "ওরে নবমী নিশি, না হইওরে অবসান"।
Comments :0