দিল্লিতে আরএসএস’র শতবর্ষ উপলক্ষে তিন দিনের সমারহে তাদেরই বাছাই শ্রোতাদের সামনে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ফের নতুন করে মথুরা ও কাশী বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। আরএসএস’র শতবর্ষে এই উসকানিই যে তাঁদের হাতিয়ার একথা বারেবারেই সদলবলে বুঝিয়ে দিচ্ছেন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত স্বয়ং আর তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীও। ভাগবতের দাবি, মুসলিম সম্প্রদায়কে এই দুই মসজিদ ছেড়ে দিতে হবে, সেটাই নাকি হবে দেশের ‘সম্প্রীতি’র উৎস। যদি পিছনের দিকে তাকানো যায় তাহলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর যে ঘটনা ঘটানো হয়েছিল দেশে, যার সঙ্গে আরএসএস প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল, যার রেশ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে দেশ, সঙ্ঘ পরিবারের দৌলতে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পর সংসদে একটি আইন করা হয়, যে আইনে ১৯৪৭ সালের আগে বিদ্যমান ধর্মীয় স্থাপনার চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না বলা হয়। এই আইন অনুসারে মথুরা ও কাশী সহ সমস্ত ধর্মীয় স্থানের স্থিতাবস্থা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক শক্তির দাবির পরোয়া না করেই এই আইনি সুরক্ষা। কিন্তু মোহন ভাগবতের এই দাবি আসলে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো, মানুষের দৃষ্টি ঘোরানো এবং সমাজকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করা। স্বাভাবিকভাবেই আরএসএস প্রধানের এই বক্তৃতার তীব্র নিন্দা করেছে সিপিআই(এম) এবং দেশের গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ অন্যান্য দলগুলো। আসলে এই বক্তব্য ভারতের সংবিধানের প্রতি আরএসএস’র অবজ্ঞা এবং দেশের আইনের সরাসরি লঙ্ঘনের ঔদ্ধত্য মাত্র।
তবে এই প্রথম নয়, নির্বাচনের আগেও বিজেপি সরকারের প্রতি বাড়তে থাকা জনরোষ ঢাকতে ভাগবত সচেতনভাবেই বারবার এই বিভাজনমূলক বক্তব্য রেখেছেন, এবং এই বিভাজনের রাজনীতিকেই হাতিয়ার করতে চেয়েছেন, তাঁর সঙ্গে একবাক্যে কথা বলেছেন মোদীও। আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলির চিরাচরিত কৌশলই হলো যখন জনজীবনে অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রকট হয়, তখনই সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়ে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক, দেশের দুর্বল অর্থনীতি, কৃষক ও শ্রমিকদের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি, এবং নির্বাচনী কারচুপি ও প্রভাব খাটানোর একের পর এক প্রমাণের ফলে জনগণ ক্রমশ বিজেপি সরকারের ব্যর্থতাগুলি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে। আর সেকারণেই বিভাজনের উত্তেজনা তৈরি করতে চাইছে আরএসএস।
যেমনটা দেখা গেল এবছর লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও। দেশের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের সময় স্বাধীন ভারত যাদের কাছে চিরকাল ঋণী সেই সকল শহীদদের স্মরণ, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটাই আমাদের দেশের ঐতিহ্য। কিন্তু এবার কি দেখলো দেশবাসী? লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে আত্মপ্রচার, দলীয় রাজনীতি প্রচার ও দেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলির পক্ষে প্রচার করলেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের স্বাধীনতার ৭৯তম বছরের ভাষণে মোদী একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের 'প্রচারক'-এর ভূমিকা পালন করলেন। এবারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে এমন একটি নির্দিষ্ট দিক রয়েছে যা দেশের মানুষের কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয়। স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে আরএসএস’র ভূয়সী প্রশংসা করলেন তা শুধু সবাইকে অবাক করেনি বরং বলা যায় এক অশনি সংকেত বয়ে নিয়ে এসেছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে ঘটে যাওয়া বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তদন্তে গঠিত সরকারি কমিশনগুলিও আরএসএস’র ভূমিকা নিয়ে, তাদের কার্যকলাপ নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তুলেছে। যে আরএসএস’র বিরুদ্ধে হিংসা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর ভূরি ভূরি অভিযোগ, তাদের এভাবে মহিমান্বিত করার পেছনে অন্য এক উদ্দেশ্য যে লুকিয়ে রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। বলা যেতেই পারে, প্রধানমন্ত্রী নিজের সীমারেখা অতিক্রম করেছেন এবং নিজেকে একজন আরএসএস’র প্রচারকে পর্যবসিত করেছেন।
তাই সকলকে সতর্ক থাকতেই হবে, আরএসএস’র বিভাজনের নীতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তা যে কোনও মূল্যে সুরক্ষিত রাখতে হবে দেশবাসীকেই।
Editorial
অশনি সংকেত

×
Comments :0