চন্দন দাস: কলকাতা
স্বামীর কেনা আছে ৩২টি সংস্থার প্রায় সাড়ে ১৭ লক্ষ টাকার শেয়ার। স্ত্রীর আছে ৪৭টি সংস্থার শেয়ার। টাকার পরিমাণ প্রায় ৫৯ লক্ষ টাকা। শেয়ার বাজার বোঝায় দক্ষতাসম্পন্ন দু’জনেই। সাম্প্রতিককালে স্বামী শেয়ার কেনার জন্য বেছে নিয়েছেন টাটা মোটরসকে। স্ত্রী কিনেছেন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট আদানির সংস্থার শেয়ার।
স্বামীর নাম ফিরহাদ হাকিম। সিঙ্গুর থেকে টাটার গাড়ি কারখানা তাড়ানোর ‘আন্দোলন’-এর দিনগুলিতেও তিনি ছিলেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত ঘনিষ্ট। এখন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের অবস্থা খিদিরপুরের চিত্রপুরী সিনেমা হলের মতো—বিধ্বস্ত। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করা আদানি পাওয়ার লিমিটেডের শেয়ার ফিরহাদ হাকিমের স্ত্রী ইসমত হাকিম কিনেছেন ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে। তিনি কিনেছেন আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের শেয়ারও।
বাজার তাঁরা ভালোই বোঝেন। কিন্তু এবার সেই বাজার-জ্ঞান যথেষ্ট নাও হতে পারে।
আশঙ্কা তৃণমূল কর্মীদেরই। তেমনই একজনের সঙ্গে দেখা পাহাড়পুরে। ‘‘অনেক ঝড় সামলেছে ববিদা। কিন্তু এবার লড়াইটা বেশ কঠিন।’’ সেই তৃণমূল কর্মীর গলায় মৃদু বেদনা।
এই এলাকাতেই ২০২৩-এর মার্চে জলাশয় বুজিয়ে বেআইনিভাবে ছ’তলা বানানো আবাসন ভেঙে পড়েছিল। ১৩জনের মৃত্যু হয়েছিল মাথার উপর সেই বাড়ি ভেঙে পড়ে। ‘ববিদা’র প্রতিক্রিয়া ছিল দার্শনিকের মতো। তিনি বলেছিলেন, ‘‘বেআইনি নির্মাণ এক সামাজিক ব্যাধি।’’ সেই বেআইনি নির্মাণ ভেঙে পড়া এবং ১৩জন গরিব ঝুপড়িবাসীর মৃত্যুর পর হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্যে বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে টাস্ক ফোর্স গড়তে। সেই টাস্ক ফোর্স দেখা যায়নি।
‘‘আরও অনেক ঝড় এসেছে।’’ চা শেষ করে ছোট কাচের গ্লাসটা দোকানির সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে তিনি বললেন,‘‘বাড়িতে রেড হলো না? দশ ঘণ্টা চলল। তখনও ববিদাকে এত চাপে দেখিনি আমরা।’’ সেটিও ২০২৩ -এর ঘটনা। অক্টোবরের। টানা দশ ঘণ্টা ফিরহাদ হাকিমের চেতলার বাড়িতে তল্লাশি করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট। সেটিও বেআইনি কারবার নিয়ে। সেবার ছিল পৌরসভায় বেআইনিভাবে নিয়োগের অভিযোগ। সেদিন মদন মিত্রর বাড়িতেও তল্লাশি হয়েছিল। হয়েছিল আরও দশ জায়গায়। ‘ববি’ সেবারও ভাব দেখিয়েছিলেন অকুতোভয়ের।
কিন্তু সাহসে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিয়েছিল ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন। ফিরহাদ হাকিমের কলকাতা বন্দর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল ‘লীড’ পেয়েছিল ৪২,৮৯২ভোটের। ১৩৪ নং ওয়ার্ডের সেই তৃণমূল কর্মীর কথায়, ‘‘২০২১-এর থেকে মার্জিন অনেকটা কমেছিল। তবু ৪২ হাজার কম নয়।’’ ঠিক। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতা বন্দর কেন্দ্র থেকে ফিরহাদ হাকিম জিতেছিলেন ৬৮,৫৫৪ ভোটে। অর্থাৎ লোকসভাতেই ব্যবধান কমে এসেছিল। এবার কথার খেই ধরলেন ওই ওয়ার্ডে তৃণমূলের নির্বাচনী কমিটির এক সদস্য। প্রবীণ মানুষ। আজন্ম এলাকার বাসিন্দা। বললেন, ‘‘আরে ভাই, এসআইআর-এ নামই বাদ পড়েছে ৭৭হাজারের বেশি। তাহলে লড়াই টেনশনের হলো কিনা?’’ পাশ থেকে আরও দুই যুবক তৃণমূল কর্মীর কথায়,‘ববিদা জিতে যাবে।’’ কিন্তু প্রবীণ অত নিশ্চিত নন। কেন? প্রবীণের কথায়, ‘‘অ্যাডজুডিকেশনে নাম কাটা গেছে ৩৮০০-র কিছু বেশি। বাকিটা ওই মৃত, এলাকা থেকে চলে যাওয়াদের।’’
জাল ভোটের সুযোগ কমে গেছে তৃণমূলের এবার। ভুয়ো, মৃত নামগুলিকে ভিত্তি করে যে ‘লীড’ হাসিল হতো ‘ববিদা’র, এবার তার সুযোগ কম।
যদিও ৬৭ বছরের ফিরহাদ হাকিম অভিজ্ঞতায় বাজার ভালোই বোঝেন। ভূকৈলাশের বিজেপি কর্মী বললেন,‘‘আগে বলেছিল ওর এলাকা মিনি পাকিস্তান। এখন মমতা ব্যানার্জিকে দিয়ে বলালো যে, ওর মা ব্রাহ্মণ ছিল। ওর রক্তে নাকি দুই ধর্মের রক্তই আছে। ধর্ম নিয়ে নাকি বিজেপি রাজনীতি করে, তৃণমূল করে না?’’ বিজেপি’র এই প্রচারে সাম্প্রদায়িক অঙ্ক আছে। তৃণমূলের এই সংক্রান্ত প্রচারেও পালটা ধর্মের পাটিগণিত। কলকাতা বন্দর সংখ্যালঘু নিবিড় কেন্দ্র। কিন্তু হিন্দুরাও আছেন অনেক। ভাঙচুর, হাঙ্গামায় অভিযুক্ত রাকেশ সিংকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। সম্প্রীতি এই এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। সেই এলাকায় বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক হিসাব আটকাতে তৃণমূলও সেই একই অঙ্কে ডুবছে। মমতা ব্যানার্জি দু’দিন আগে ভূকৈলাশে সভা করে ফিরহাদ হাকিমের পারিবারিক এই সব বিবরণ দিয়ে গেছেন। অথচ বলার কথা ছিল তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য হিসাবে ফিরহাদ হাকিম কী কী করেছেন, সেগুলি। মুখ্যমন্ত্রী তার ধারেকাছ দিয়ে যাননি। কারণ? ডেঙ্গি, নিকাশি, আবর্জনা পরিস্কার, বেআইনি নির্মাণ আটকানো, জলাশয় বোজানো বন্ধ করা, বস্তির দুর্দশা— ফিরহাদ হাকিম সবকিছুতে ব্যর্থ। এক ব্যর্থ মন্ত্রী, ব্যর্থ মেয়রকে প্রায় বার্দ্ধক্যে পৌঁছে ভোটে জিততে নিজের বাবা, মা’র পরিচয়কে ঘুঁটি করতে হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর মা’কে তিনি রক্ত দিয়েছিলেন— এটি হচ্ছে তাঁর সার্টিফিকেট। কার্ল মার্কস সরণির দু’পাড়ে নিজের নামের আগে ছাপাতে হচ্ছে— ‘মমতা ব্যানার্জির বিশ্বস্ত।’
কার্ল মার্কস সরণি থেকে শাখানদীর মতো ঘিঞ্জি এলাকার ভিতরে ঢুকে যাওয়া পীতাম্বর সরকার লেনের মুখে দাঁড়িয়েছিলেন ফারহান খান। যুবক ছোট ব্যবসায়ী। বললেন,‘‘আমাদের হাল খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর উনি কে এমন যে বছর বছর টাকা বাড়ছে। এত রেইডের পরেও টাকা কোথা থেকে আসে?’’ কথাটি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। গত পাঁচ বছরে কলকাতা বন্দরের তৃণমূল প্রার্থীর অস্থাবর সম্পত্তি ৪ কোট ১৩ লক্ষ থেকে প্রায় ৭ কোটি ২৮লক্ষে পৌঁছেছে। তাঁর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তি ৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা থেকে ৯ কোটি ছাড়িয়েছে।
‘‘আর দেখুন এলাকায় কাজ নেই। একের পর এক কারখানা বন্ধ। চটকল ছিল। তাও বন্ধ। বন্দর এবং তার উপর নির্ভরশীল ক্ষেত্রগুলিতে সবই ঠিকাকর্মী। তাঁদের জীবন দুর্বিষহ। সামান্য মজুরি, তার উপর ঠিকাদারদের অত্যাচার।’’ বলছিলেন সিপিআই(এম) নেতা ইনোপ্রকাশ পাল। ২০১১-তে কলকাতা বন্দর বিধানসভা কেন্দ্রের উৎপত্তি। এই প্রথম এই কেন্দ্রে কাস্তে হাতুড়ি তারা প্রতীক। প্রার্থী কলকাতা কর্পোরেশনের প্রাক্তন মেয়র পরিষদ সদস্য ফৈয়াজ আহ্মেদ খান।
সাড়া কেমন? একটিই উদাহরণ থাক—তৃণমূল-পুলিশের বাধা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন বাদে লাল ঝান্ডার মিছিল দেখেছে ১৩৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
Comments :0