যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়বে! নির্বাচনী কাজের জন্য ৬৫০টি বাস রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ায় দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ব্যাপক বাস সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রথম দফার ভোটগ্রহণের সময়েও বাসের সঙ্কটের কারণে নিত্যযাত্রীরা ব্যাপক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের আগেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাজ্যের সর্বত্র। নির্বাচনী কাজের জন্য বিপুল সংখ্যক যাত্রীবাহী বাস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে প্রশাসন, যার ফলে মানুষের অসুবিধা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যা নাগাদ নির্বাচনী কাজের জন্য রাজ্যের একাধিক জেলা থেকে বহু যাত্রীবাহী বাস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন। বাসগুলি ভোটকর্মী এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাস মালিক ও জেলা প্রশাসনের মতে, ভোটগ্রহণের আগের দিন থেকে পরের দিন পর্যন্ত রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা খুবই কম। এতে যাত্রীদের, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার যাত্রীদের, ব্যাপক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে।
শিয়ালদহ হাওড়া স্টেশন থেকে বেড়িয়ে অসুবিধার সম্মূখিন হতে হচ্ছে নিত্যযাত্রীদের। স্টেশনের বাড়রে বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যদিও হাতে গোনা কয়েটি বাস রাস্তায় চললেও। সেই বাসে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে যাত্রীদের। ভীড় ঠাসা বাসে উঠতে পারছেন না শিয়ালদা বা হাওড়া বিভাগের ট্রেন যাত্রীরা। একদিকে রাস্তায় বাস নেই, আরেকদিকে অফিসে সময় মতো পৌঁছানোর তারা। বাধ্য হয়ে কেই পায়ে হেঁটে, কেউ ক্যাব বুক করে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁচ্ছাচ্ছেন। চরম অব্যবস্থার কারণে কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন নিত্যযাত্রীদের একাংশ।
রাস্তায় বাস না থাকায় চিকিৎসা, সরকারি অফিস বা কাজের জন্য দূরপাল্লার যাত্রীদের ওপর এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস না থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ও অটো-ট্যাক্সি চালকরা মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, যেখানে বাসই পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম। মানুষ এখন জরুরি প্রয়োজনে ছোট মালবাহী গাড়ি বা ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শুধু কলকাতা নয় উত্তরবঙ্গে পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। জলপাইগুড়ি সহ গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে বাস পরিষেবা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ নিত্যযাত্রীদের। বিভিন্ন রুটে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও বাস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। ফলে কর্মস্থল বা নির্দিষ্ট গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ কমিশন বিপুল পরিমান সরকারি বেসরকারি বাস ভোটের কাজে দক্ষিণবঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। শিলিগুড়ি, ধুপগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুটে বাসের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি বাস চললেও তাতে গাদাগাদি ভিড়—পরিস্থিতি এমন যে একাধিক বাস ছেড়ে দিয়েও উঠতে পারছেন না যাত্রীরা।
উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগমের নেতাজীপাড়া ডিপো, গোশালা মোড় কিংবা পাহাড়পুরের জাতীয় সড়কের ধারে সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে যাত্রীদের লম্বা লাইন। ডুয়ার্স থেকে শিলিগুড়িগামী বাসগুলিতেও উপচে পড়া ভিড়। যাত্রীদের একাংশের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বাস চালানোর আশ্বাস মিললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
শুধু বাস নয় ট্রেন পরিষেবাতেও একই চিত্র। উত্তরবঙ্গের প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই বহু পরিযায়ী শ্রমিক ফিরছেন নিজেদের কর্মস্থলে। আবার আসাম সহ ভিনরাজ্য থেকে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছেন ভোট দিতে। ফলে ট্রেনে টিকিট প্রায় অমিল, সাধারণ কামরায় দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও মিলছে না।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বাস সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার ভাড়া যেখানে সাধারণত ১৫০০-১৮০০ টাকার মধ্যে থাকত, সেখানে বর্তমানে অনলাইন বুকিংয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়। কাউন্টার থেকেও সরাসরি টিকিট না দিয়ে অনলাইন বুকিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। নদীর চরাঞ্চল থেকে শুরু করে চা-বাগান এলাকা—সব জায়গাতেই একই ছবি। ভোট দিতে বা ভোটের কাজে যোগ দিতে দক্ষিণবঙ্গে যাওয়া সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আসাম থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ এবং সেখান থেকে দক্ষিণবঙ্গ—তিন দফার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জেরে পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত। চরম অব্যবস্থার কারণে নিত্যযাত্রীদের একাংশ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন কমিশনের বিরুদ্ধে। নিত্যযাত্রী থেকে ভোটকর্মী সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন, ভোটের আগে এই চরম পরিবহণ সঙ্কটের দায় কার?
Comments :0