editorial

কিউবা একা নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সময়ের মতো সাম্রাজ্য বিস্তারের হিংস্রতায় মেতে উঠতে চাইছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা। বর্তমান বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি আমেরিকা তাতে সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আমেরিকা। তবে সমকালীন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশিক যুগের সাম্রাজ্যবাদ থেকে অনেকটা ভিন্ন। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ অন্য দেশকে সরাসরি দখলে রেখে শাসন ও শোষণ চালায়। উপনিবেশের সম্পদ লুট করে। আধুনিককালের সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি দেশ দখল না করে পুঁজির শোষণ কায়েম রাখে। যাকে নয়া উপনিবেশবাদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের তীব্রতার মধ্য দিয়ে বহু স্বাধীন দেশের আবির্ভাব হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশগুলি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির জোয়াল থেকে মুক্তি পায়নি। ফলে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থেকে গেছে সেই সাম্রাজ্যবাদীদেরই হাতে। আমেরিকার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে পুঁজির শোষণ তীব্র করে দু’হাতে মুনাফা লুটে যাচ্ছিল।
ইদানীং ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হবার পর (বিশেষ করে দ্বিতীয় দফায়) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদে ফিরতে চাইছে। সঙ্গী করতে চাইছে মধ্যযুগী‍‌য় বর্বরতাকেও। তিনি চান সরাসরি শাসন ও শোষণ। চান সাম্রাজ্য বিস্তার। তাই কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম প্রদেশ করার হুমকি দেন। অনুরূপ আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করেন মেক্সিকোর ক্ষেত্রে। মাদক ব্যবসার অজুহাতে সেখানে সাময়িক অভিযানেরও কথা বলেন। কানাডা সহ গ্রিনল্যান্ডকে তিনি মার্কিন ভূখণ্ড হিসাবে দেখতে চান। স্বেচ্ছায় যদি গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার অধীন না আসে তাহলে সেনা পাঠিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন বলে ঘোষণা করেন। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ পানামা ক্যানেল দখল করে আমেরিকার অধীনে আনার হুমকি দেন। আমেরিকার শর্ত ও নির্দেশ মতো চালাতে হবে পানামা ক্যানেল। আমেরিকার চোখের বিষ ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত ভাণ্ডার আছে এখানে। বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে এবং সম্পদ লুটের জন্য ভেনেজুয়েলার বিকল্প নেই। তাই সেনা পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক অপহরণ করে বন্দি করা হয় মার্কিন কারাগারে।
এবার ট্রাম্পের লক্ষ্য সমাজতান্ত্রিক কিউবা দখল। মার্কিন ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা প্রায় সাত দশক ধরে উন্নয়ন ও বণ্টনের বিকল্প ধারা অনুসরণ করে সবচেয়ে ধনী দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে সমতার আদর্শকে সামনে রেখে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে শোষণ মুক্তির পথে কিউবার যাত্রা আ‍‌মেরিকা কোনদিনই সহ্য করতে পারেনি। তাই জন্ম থেকে কিউবা মার্কিন অবরোধের শিকার। অর্থনৈতিকভাবে কিউবাকে দুর্বল ও নিঃস্ব করে দিতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। উলটে বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্তব্য পালনে নিজেকে ধ্রুবতারা রূপে প্রতিষ্ঠিত করে‍‌ছে কিউবা। ট্রাম্প তাই সবদিক থেকে ঘিরে ধরে কিউবাকে ধ্বংস করতে চায়। কিউবার জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। ২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থেকেও মাথা নত করেনি। তাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা রাউল কাস্ত্রোকে গ্রেপ্তার করার পরিকল্পনা করেছে। ট্রাম্প চাইছে কিউবার সমাজতন্ত্র ধ্বংস করে আমেরিকার অধীনে পুঁজিতন্ত্র কায়েম করতে। ট্রাম্পের সেই আশা কোনোদিনও পূরণ হবার নয়।

Comments :0

Login to leave a comment