ANAYAKATHA | AML KAR | EADESE EKUSH ELE | MUKTADHARA | 2026 MARCH 2 | 3rd YEAR

অন্যকথা — অমল কর — এদেশে একুশ এলে — মুক্তধারা — ২ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

ANAYAKATHA  AML KAR  EADESE EKUSH ELE  MUKTADHARA  2026 MARCH 2  3rd YEAR

অন্যকথা  


মুক্তধারা

  ----------------------------
    এদেশে একুশ এলে
  ----------------------------

  অমল কর




একুশ এলে আমরা কেমন যেন হয়ে যাই, কিছু একটা করে দেখানোর জন্য চনমন করে উঠি,নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করি।কার্যত সব ফাঁপা।বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া।

চলুন খানিক সময় পিছিয়ে মাতৃভাষা বাংলার ইলোরা-অজন্তায় একটু ঘুরে আসি।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে(অধুনা বাংলাদেশ) রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনে স্লোগান ওঠে " রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না।"

১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকার বেলতলায় ছাত্র সমাজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল বিক্ষোভ দেখালে ঢাকা জেলার তদানীন্তন ম্যাজিস্ট্রেট দানব কুরেশির নির্দেশে বর্ষিত হয় নির্বিচারে গুলি। সালাউদ্দিন সালাম বরকত রফিক প্রমুখ শহিদের মৃত্যু বরণ করেন।ছাত্র আন্দোলন গণ আন্দোলনের রূপ নেয় " রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাংলা ভাষার রাষ্ট্র  চাই" স্লোগানে।

১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের প্রধানতম ভাষার স্বীকৃতি পায়। ১৯৭১ সালে বিশ্বে প্রথম একটি মাতৃভাষার রাষ্ট্র গঠিত হয় _ বাংলা ভাষার বাংলাদেশ।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর ঘোষণা করে যে ২০০০ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। শুধুমাত্র বাংলার, বাঙালির, মাতৃভাষা বাংলার জয় নয়, মাতৃভাষাপ্রেমী তামাম জাতির
কাছে এ জয় অভূতপূর্ব অবিস্মরণীয় অভিনব অভিনন্দনীয় ও প্রণিধানযোগ্য।


প্রশ্ন হল, আমাদের দেশে আমাদের রাজ্যে বাংলা ভাষার কদর কতটুকু!ভারতীয় সংবিধানে বাংলা ভাষা সহ ২২টি ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিতে আমরা চাই আনুপাতিক হারে ২২টি ভাষার সমান প্রসার প্রচার স্থায়িত্ব মর্যাদা ও কৌলিন্য রক্ষার জন্য বাজেটে অর্থের সংস্থান।

ইউনেস্কোর সুচিন্তিত অভিমত অনুযায়ী বিশ্বের মধুরতম ভাষার স্বীকৃতি থাকলেও এবং বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও  ক-দিন আগেও ভারত সরকারের কাছে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা পায়নি বাংলা।
ভাবা যায়!

বাংলা ভাষা অবহেলিত _ পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় সাংসদরা সকলে বাংলা ভাষায় শপথ গ্ৰহণ করেন না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় কিংবা পুরনিগমে বা মিউনিসিপ্যালিটি অথবা পঞ্চায়েতে,ন্যায়ালয়ে সবাই বাংলায় কথা বলেন ? সরকারি বা বেসরকারি কাজে ব্যাংকে আদালতে পাঠশালায় উচ্চ বিদ্যালয়ে মহাবিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রেলওয়ে ডাক্তারি বা আইনি পরীক্ষায় পঠনপাঠনে পাঠ্যপুস্তকে সাইনবোর্ডে রাস্তাঘাটে স্টেশনে বন্দরে দোকানের সাইনবোর্ডে সর্বত্র বাংলা ব্যবহৃত হয়?
আমরা ভাষণে আলোচনায় লেখালেখিতে শিক্ষার্থীদের সাথে সবসময় বাংলায় কথা বলি? ইংরেজি ভাষায় পাঠরত আপনার
ছেলেমেয়েদের সাথে আপনি কি মাতৃভাষায় কথা বলেন ? আমাদের সন্তানসন্ততিরা সবাই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে? এই যে রাজ্যজুড়ে আকাশচুম্বী আবাসনে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষজনে টইটুম্বুর, আপনার রাজ্যে তাঁরা বাস করে আপনার ভাষায় কথা বলেন?
আপনি তাঁদের সাথে আপনার মাতৃভাষায় কথা বলেন? বহির্বঙ্গ ভ্রমণে বা জীবিকার জন্য গেলে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারেন?

আজ মাতৃভাষা বাংলা সর্বত্র  বিপন্ন। রক্ষক হয়েও পরোক্ষে আমরা বিপন্নতায় ইন্ধন
জোগাচ্ছি। অবাঙালির ক্রমেক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বৃদ্ধি , অন্যান্য ভাষার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র আক্রমণ ও হিন্দি পোষণা, হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান স্লোগানে জাতিভেদ, কেন্দ্রীয় বাজেটে হিন্দি ও দু-একটি ভাষা ছাড়া বাজেট বরাদ্দ না-রাখা, রাজ্য সরকারের বাংলা ভাষার প্রতি ঔদাসীন্য  এবং বাজেটে ভাষার উন্নতি ও
সুরক্ষার জন্য বাজেট বরাদ্দ না-রাখা  ইত্যাদি কারণে হয়তো একদিন বিশ্বজুড়ে বিলুপ্ত বহু ভাষার মতো  একদিন বাংলা ভাষারও একই পরিণতি হতে পারে।

অনেক উপল-চড়াই বহু শীত  অনেক উপত্যকা পেরিয়ে নির্মাণের দীর্ঘ ইতিহাস  সৃষ্টি করে রামমোহন বিদ্যাসাগর বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ নজরুল-এর বাংলায়  বাংলা ভাষার অনেক পরম্পরা ঐতিহ্য ইলোরা-অজন্তা রয়েছে।আমাদের দেশে আমাদের রাজ্যে আমাদের মাতৃভাষা আজ শ্বাস নিতে পারছে না।
এই বিষয়বিষবিকারজীর্ণ রাজ্যে মাতৃভাষা তো এখন শুধু কিছু অভিমানলিপি।দগদগে বুকের ভেতর এত কান্না এত অভিমান কোথায় রাখব আমরা!আমরা শুধু হেরে যাব অনন্ত পরাজয়ে? দাসত্বের বিনিময়ে শুধু এ হার মেনে নেব? কী তামাশা, একে একে কখন যেন ,পুড়ে পুড়ে যায় সব আশা! ভাষা তো মানুষের পরিচয়ের অধিকার, হৃদয়ের রক্ত, চোখের অশ্রু!
আমরা চাই, যেখানে অনন্তের উপর শুয়ে অনন্ত প্রান্তর, যেখানে ফুরায় না নান্দনিক প্রকৃতি, যেখানে সোনালি রোদ্দুর টানটান
হেঁটে যায়, যেখানে পদ্মজ্যোৎস্নায় অঢেল দিগন্ত ভেসে যায়, ভুবনজুড়ে যেখানে মেঘে মেঘেcছয়লাপ ,যেখানে সবুজ ধানের শিষে টইটুম্বুর দুধ নেচে ওঠে, শালগাছের আদিমে যেখানে
অনবরত ঝিঁঝি ডাক দিয়ে যায়, কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়া চেপে যেখানে ওড়ে বসন্ত, যে যে প্রান্তরে কিষান-কিষানি পরম যত্নে নিড়েন দেয়, দীর্ঘ এক বৃষ্টিযুগে যেখানে নতুন নতুন জন্মের ইশারা, যেখানে অঙ্কুরেরা রচনা করে আজন্ম বন, যেখানে মাঠের বোঝা হাতে হাতে ঘাড়ে পিঠে চড়ে খামারে যায়, যেখানে উড়ান ফেলে উজ্জ্বল পাখিরা সীমানা হারায়, যেখানে নিবিড়ে শোনা যায় বনদোয়েলের গান,গাঁয়ের পথে সুর যেখানে বাউল হয়ে পথ হারায়,যেখানে সংগীতে মাদলে মহুয়া লাগে, যেখানে নিকোনো উঠানে ঝোলানো নদী, যেখানে চুপচুপ নীরবতা কথামালা, নারীর মতো যেখানে করতোয়া খরস্রোতা, সমুদ্রের গর্ভে যেখানে নদীরা হারায় নিশানা, যেখানে তুলোর মতো বিছানো ভোর, যেখানে হাওয়া ছুঁয়ে থাকে একান্ত শৈশব ,যেখানে মানুষের শরীরে হৃদয়ের আত্যন্তিক ডাক, ভালোবাসার মিছেও যেখানে উৎসবের সাজ, যেখানে টানটান অজস্র সপ্রেম  প্রাণ, যেখানে চেতনাচৈত্যে ছড়ানো মানবিকতা, যেখানে হাতুড়ি-ছেনিতে যাপন-গুজরান, যেখানে মিছিলে সংগ্ৰামে সংহত একতা, নিজের ক্ষমতার আগুনের উপর যেখানে হাঁটা_ সেই সবখানে আমাদের অহংকারী মাতৃভাষা বাংলা সসম্মানে সসম্ভ্রমে সশ্রদ্ধায় সর্বত্রগামী হয়ে ওঠুক।

Comments :0

Login to leave a comment