Bangla Bachao Yatra

নিবারণ পণ্ডিতের মাটি ছুঁয়ে শুরু ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’

রাজ্য জেলা ফিচার পাতা বাংলা বাঁচাও যাত্রা

জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা
জরুরি অবস্থার সময় আকাশবাণীতে নিষিদ্ধ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানও। ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’ গান নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে নিবারণ পণ্ডিত লিখেছিলেন অমর ভাওয়াইয়া গান ‘আগুন বাদ দিয়া শুধু জল দিয়া কি করে গান গাই...’। ‘গীদালের যন্ত্রণা’র সেই গান আজও শোনা যায়।
জনযুদ্ধের গান ও কবিতার সংকলন যাকে ঘিরে সেই প্রয়াত নিবারণ পণ্ডিতের বিচরণভূমি কোচবিহারের মাটি থেকেই আগামী ২৯ নভেম্বর লাল ঝান্ডার ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ শুরু হচ্ছে। প্রয়াত নিবারণ পণ্ডিত সারাজীবন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামের জয়গাঁথা লিখে গেছেন। তাঁর গান আর কবিতা জনগণকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছে বারবার।
এই লোকশিল্পী কতটা সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদবিরোধী ছিলেন সেটা বোঝা যায় ইংরেজ আমলে আর স্বাধীনতা পরবর্তী আমলে অন্তত ৬বার জেলে কাটিয়েছেন। লোকশিল্পীকে কাছে থেকে দেখা গণনাট্য শিল্পী শ্যামল বরণ রায় বলেন,নিবারণ পণ্ডিতের লেখা গান কবিতা যতটুকু সংরক্ষিত হয়েছে, তাতেই স্পষ্ট লোককবি নিবারণ পণ্ডিত ছিলেন এমন একজন লোকশিল্পী যার রচনায় প্রলেতারিয়েত জীবন দর্শন এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর গান ও কবিতা গীতিকাব্য সহজ সরল কিন্তু উচ্চ সাহিত্য গুণে ভরপুর। আসলে তাঁর মানুষের প্রতি বুকভরা ভালোবাসা আর দরদ ছিল।
ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে গড়ে ওঠা প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের আন্দোলনে জড়িয়ে ছিলেন নিবারণ পণ্ডিত। কোচবিহারের প্রত্যন্ত গ্রাম কলের পাড় থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর বিদ্রোহী লেখার আঁচ। কিরকম মানুষ ছিলেন নিবারণ পণ্ডিত! নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি প্রায়ই বলতেন,আমি অবসরভোগীদের জন্য গান বাঁধি না। সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা এবং তাদের সংগ্রাম আমাকে প্রেরণা দেয় গান রচনা করতে। জনসাধারণের কাজ করছি বলে আমি তাদের মতো করে ভাবি,আর আমার গান আর কবিতায় আমি সেই ভাবনার প্রকাশ করি।
আজকের বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের সগড়া গ্রামে ১৯১২ সালের ২৭ফেব্রুয়ারি এই লোকশিল্পীর জন্ম। বাবা মারা যাবার পর তিনি সংসার হাল ধরতে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ছোটবেলা থেকেই ছিল সুরের প্রতি টান। গ্রামের কীর্তন আর কথকতার আসরের এক মগ্ন শ্রোতা ছিলেন তিনি শৈশব থেকেই। এই কীর্তন শুনে শুনেই তিনি নিজেই লিখতে শুরু করলেন। এই করে তাঁর লেখা গান চেয়ে নিয়ে যেত আশপাশের দশ গ্রামের গায়কেরা। তিনি হয়ে উঠলেন গান রচয়িতা। কবির গান লেখায় তাঁর জুড়ি মেলা কঠিন ছিল। আসরে বসেই লিখে দিতেন গানের পদ। শুরুতে তিনি ভক্তিরস আর প্রেমের গান লিখলেও, রূঢ় বাস্তবের মুখে পড়ে লিখতে শুরু করলেন মানুষের গান। এক সময়ে সংসারের জন্য তিনি নিজে বিড়িও বেঁধেছেন। আর কাছ থেকে দেখেছেন মহাজনের শোষণ। প্রতিবাদ গান লিখছে নিবারণ পণ্ডিত সে খবর ছড়িয়ে পডতে সময় লাগেনি। তারপর এল ১৯৪১- এর দাঙ্গা। লিখলেন দাঙ্গাবিরোধী গান। এলেন কৃষকসভা আর কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে। তাঁর লেখা গান যারা গলায় তুলে নিত তাঁরা কৃষকসভার কর্মী। মুখে মুখে গানের লাইন মুখস্ত করাতেন নিবারণ পণ্ডিত। জাপানীদের ভারত আক্রমণের বিরুদ্ধেও গান নিয়ে গর্জে উঠেছিলেন তিনি। লিখলেন পটের সুরে পয়ার ছন্দে জনযুদ্ধের ডাক-ছড়া কবিতা। সেই ছড়া-কবিতা পুস্তিকা আকারে ছেপে হাটে হাটে বিক্রি করতেন সঙ্গীদের নিয়ে।
সিপিআই(এম) কোচবিহার জেলা সম্পাদক অনন্ত রায় বলেন, লোককবি নিবারণ পণ্ডিত কোচবিহার জেলার গর্ব। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুর্ভিক্ষ দেখে যে গান তিনি লিখে গেছেন সেটা আজও মানুষের মনকে নাড়া দেয়। দেশ ভাগের পরেও তিনি পূর্ববঙ্গেই ছিলেন। তাঁর লড়াই আন্দোলনের গান সে দেশের সরকারের মনঃপুত ছিল না। তাঁকে ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তার হতে হয়। সেই বছরে ডিসেম্বর মাসে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি এদেশে আসেন। প্রথমে আলিপুরদুয়ারে। পরে পাকাপাকি ভাবে কোচবিহারের ডাউয়াগুড়ির "কলের পাড়" গ্রামে বসবাস শুরু করেন। এখানে এসেও তিনি বসে ছিলেন না। ছিন্ন মূল মানুষদের নিয়ে লিখলেন,‘বাস্তুহারার মরণ কান্না’ শিরোনামে ছড়া-কবিতা। আর ১৯৫১ সালের ২১ এপ্রিল কোচবিহারে খাদ্যের দাবিতে পুলিশের মিছিলে গুলিতে ৫ জনের মৃত্যুতে গর্জে উঠেছিল নিবারণ পণ্ডিতের কলম। তাঁর লেখা ‘কোচবিহারে খাদ্যের বদলে গুলি’ ছড়া কবিতা বারুদের মতো মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। তাঁর গান শুনতে জড়ো হতেন হাজার হাজার মানুষ। পুলিশ নিবারণ পণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে।
জেলার বিশিষ্ট নাট্যকার দীপায়ণ ভট্টাচার্য বলেন, নিবারণ পণ্ডিত শুধু গান ও গীতি রচনা নয় কবিতা লেখাতেও পারদর্শী ছিলেন না। তিনি কবিতাও লিখতেন। কবিদের জগতেও তাঁর অগ্রগণ্য স্থান হতো। গণনাট্য সঙ্ঘের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। ৭২-এর কালো সন্ত্রাসের দিনে কবির পরিবারও রেহাই পায়নি। প্রাণনাশের চেষ্টাও হয়েছিল। তাঁর বাড়িতে দু’বার হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সেই সময় পুলিশ তাঁকে এবং তাঁর মেয়েকে গ্রেপ্তার করে। আসলে তাঁর কলমকে ইংরেজরা যেমন ভয় পেত তেমনি শাসক কংগ্রেসের কাছে তিনি ছিলেন ভয়ের কারণ। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ,পাকিস্তানের লিগ সরকার আর এদেশের কংগ্রেস সরকারের ভয় ছিল নিবারণ পণ্ডিতের গান কবিতা আর সুর।
রাজ্যে ৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর শিল্পীকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মান জানায়। প্রয়াত শিল্পীর পুত্র রণদেব পণ্ডিত বলেন,দিল্লির কংগ্রেস সরকার বাবাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন দেবার প্রস্তাব দিলে বাবা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আসলে বাবা যে শাসকের শোষণ অত্যাচারে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে সেই সরকারের থেকে কিছু নিতে রাজি হননি। বাবা ৭৫ সাল থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। গণনাট্য সঙ্ঘ বাবার চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে আমার দাদার ভাড়া বাড়িতে নিয়ে রেখেছিলেন। শ্রদ্ধেয় হেমাঙ্গ বিশ্বাস, শান্তিময় গুহ এবং অন্যরা বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাধ্যমত চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বাবা মৃত্যুর কিছুদিন আগে কোচবিহারের বাড়িতে আসেন। কোচবিহারের মানুষ, মাটি, নদী, প্রকৃতির ওপর তাঁর অসম্ভব টান ছিল।
১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর নিবারণ পন্ডিত মারা গেছেন। তাঁর সৃষ্টি করা গান গণনাট্যের আজকের প্রজন্মের কণ্ঠে বেঁচে আছে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা আজও বামপন্থার প্রতি আস্থা রেখে চলেছেন।
 

Comments :0

Login to leave a comment