JOURNEY — GOMUKHA — SUMAN CHATARJEE — MUKTADHARA — 4th YEAR — 13 JUNE 2026

ভ্রমণ — স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ — সুমন চ্যাটার্জী — মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ১৩ জুন ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  GOMUKHA  SUMAN CHATARJEE  MUKTADHARA  4th YEAR  13 JUNE 2026

ভ্রমণস্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ

             সুমন চ্যাটার্জী 

মুক্তধারা৪র্থ বর্ষ —  ১৩ জুন ২০২৬

 

গঙ্গা, পতিতদ্ধরিণী জলদগম্ভীর বিশাল জলধারা গঙ্গা। আমাদের গাঙ্গেয় অববাহিকায় গঙ্গা এক মধ্যবয়সী গিন্নিমা হলেও আমার অন্তরের গঙ্গা হলো স্রোতস্বিনী তটিনী। এক চপলা নারী, যে পাহাড়ের ধাপে ধাপে নুপুর পরা পা ফেলে ফেলে লাফিয়ে চলে শঙ্কিত হরিণীর মতো। কারণ গঙ্গার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কলকাতার ঘাটে নয়, হরিদ্বারের আরতিতেও নয়। আমার গঙ্গা জন্ম নিয়েছিল বরফের গর্ভে, এক বিশাল নীল-সাদা নীরবতার মধ্যে।

যারা আমার ভ্রমণকাহিনী আগেও পড়েছেন, তারা জানেন, আমার প্রবল পর্বতারোহণের নেশার কথা। সে পাহাড়ের টানে বার বার আমি ফিরে যাই হিমালয়ের কোলে। আর এই নেশার বীজ যার হাত ধরে আমার অন্তরে বুনে দেওয়া হয়েছে, আজকের এই গল্পের প্রধান চরিত্র তিনি, আমার বাবা।

আমার এই ছত্রিশ বছর বয়সে এসে যখনই আমি নতুন কোনো অভিযানের প্রস্তুতি নিই, তখন যে অভিযান আমার গীতা হয়ে ওঠে, আজ সেই অভিযানের গল্প বলব। আজ বলব এক সাধারণ ছাপোষা বাঙালি পরিবারের অসাধারণ অভিযানের অংশ হয়ে ওঠার গল্প। একটা ছোট্ট তেরো বছরের ছেলের ট্রেকার হয়ে ওঠার গল্প। এক মায়ের শাড়িতে ট্রেক করার গল্প। আর সর্বোপরি এক সাধারণ মানুষের অসাধ্য সাধনের গল্প। আজ গল্প গোমুখের।

সালটা ২০০৩। পৃথিবী তখনও অতিমারির অভিঘাতে থমকে দাঁড়াতে শেখেনি। কার্গিল যুদ্ধ শেষ হয়েছে বছর চারেক আগে। মোবাইল ফোন তখনও সবার পকেটে পৌঁছয়নি, ইন্টারনেট ছিল বিলাসিতা, আর ভ্রমণের স্মৃতি বন্দি হতো ফিল্ম-রোলের ক্যামেরায়। আমার বয়স তখন সবে তেরো। বাবা বলল এবার গোমুখ দেখতে যাব। ততদিনে ভূগোলের বই থেকে দুলে দুলে মুখস্ত করে ফেলেছি গঙ্গার উৎস হলো গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমূখ গুহা। আর ঠাকুমার থেকে গল্প শুনেছি ভগীরথের তপস্যা, শিবের জটাজাল, স্বর্গ থেকে নেমে আসা গঙ্গা। এবার সেই চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের সময় এসেছে। সেদিন বুঝিনি, সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক যাত্রা, যা দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও হয়ে থাকবে আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। আমার প্রথম না হলেও সবচেয়ে স্মৃতি বিজড়িত যাত্রা। চোখ বুজলে যেন চোখের সামনে মায়াজাল বিস্তার করে সেই খরস্রতা নদী, সেই পাহাড়ি ঢালু পথ, সেই ঝুরো পাহাড়। মনে হয় যেন আমি আবার বাঁচি এই পথে।

আমরা চলেছি ছয়জন। আমি, আমার বাবা মা, আমার দুই মাসী এবং এক মেসোমশাই। আমার গ্রীষ্মাবকাশের কোনো এক দিন আমরা চড়ে বসলাম উপাসনা এক্সপ্রেসের কামরায়। গন্তব্য হরিদ্বার। হরিদ্বার থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হবে গোমুখের উদ্দেশে।আমরা জাঁকিয়ে বসলাম ট্রেনের কামরাতে। ট্রেন চলুক ট্রেনের মতোই। আমরা ততক্ষণে একটু জেনে নিই গোমুখের ব্যাপারে।

গোমুখ উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ে অবস্থিত গঙ্গোত্রী হিমবাহের প্রান্তভাগ, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,০০০ মিটার (প্রায় ১৩,২০০ ফুট) উচ্চতায়। এখান থেকেই ভাগীরথী নদীর জন্ম, যা পরবর্তীকালে অলকানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়ে গঙ্গা নামে পরিচিত হয়। গ্রীষ্মকালেও গোমুখের আবহাওয়া অনিশ্চিত ও রুক্ষ; দিনের বেলায় তাপমাত্রা সাধারণত ৫ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও রাতের দিকে তা হিমাঙ্কের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে। প্রবল হিমেল বাতাস, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়া এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য। চারদিকে বৃক্ষহীন পাথুরে উপত্যকা, তুষারাবৃত শৃঙ্গ এবং নীলাভ হিমবাহের দৃশ্য এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি ক্ষণস্থায়ী বলে মনে হয়, অথচ প্রকৃতি যেন চিরন্তন। এই চরমভাবাপন্ন পথের পথিক আমরা ছয়জন। ভাবতে ভাবতেই ট্রেন পৌঁছলো হরিদ্বারে।

Comments :0

Login to leave a comment