Post editorial on Science

যুক্তি আর বিজ্ঞানে ভয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও যুক্তিবাদী বিশ্ববীক্ষা যদি কারও মননে জায়গা করে নেয় তাহলে সেখানে হিন্দুত্ববাদী অন্ধ বিশ্বাসের কোনও দিনই ঠাঁই হবে না। এই সত্যটা সবার থেকে বেশি জানে আরএসএস-র কর্মকর্তারা। তাই আরএসএস-র মতাদর্শে ঔদার্য যুক্তি ও বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। বিজ্ঞানে ফলকে তারা গ্রহণ করে কিন্তু যে অনুসন্ধিৎসু মন যক্তি তর্কের কষ্ঠি পাথরে যাচাই সত্য করে সত্য ও বাস্তবে গ্রহণ সেই মনকে তারা ভয় পায়। যক্তিবোধহীন কল্পনার ভিত ও অন্ধ বিশ্বাসের উপর দাঁডিয়ে যে আরএসএস-বিজেপি-র হিন্দুত্ববাদ যুক্তিবাদী মন যুক্তির ঘায়ে অনায়াসে তাকে খান খান করে দিতে পারে। তাই যে শিক্ষণ প্রক্রিগায় আগামী প্রজন্মের মনন তৈরি হয় সেখান থেকে সেই সেই বিষয়গুলি ছেঁটে ফেলতে চায় যে গুলি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখাবে। কোন কিছুকে গ্রহণ বা আত্মস্থ করার আগে বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও যুক্তি দিয়ে যাচাই করবে। আসলে জন্ম থেকে আপনা আপনি শিশুদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও যুক্তিবাদী মনন গড়ে ওঠে না। বিদ্যালয় জীবন থেকে আধুনিক শিক্ষণ প্রণালী ও পাঠ্যসূচির মাধ্যমে ভব্যিতের নাগরিকদের সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। এখাই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা যা উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে অনুসৃত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এমন ভাবনা থেকেই। প্রাক স্বাধীনতা যুগে সেই নবজাগরণের কাল থেকে এমন বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিবাদী শিক্ষার লড়াই চলেছে।
আরএসএস সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে না। তারা ধর্মান্ধতাকে আশ্রয় করে ধর্মীয় সংখ্যাগুলিদের নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্মাণ করে। এই মতাদর্শে মুখ্য অস্ত্র মুসলিম বিদ্বেষ। ধর্মীয় সংখ্যা গুরুবাদকে পুষ্ট করতে তারা ভারতীয় সভ্যতাকে হিন্দু ধমেরর আধারে সাজাতে চায়। অর্থাৎ আদি থেকে ভারত হিন্দুদেরই দেশ। আর্যরা বহিরাগত নয়, ভারতীয়। বাকিরা সকলেই বহিরাগত। এইভাবে মন গড়া ধারনাকে সাজিয়ে হিন্দুত্বের মতাদশর নির্মাণ করা হয়েছে। এই মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে পুরান, মহাকাব্য ইত্যাদিকে ইতিহাস বলে চালানোর পাশাপাশি যাবতীয় কাল্পনিক কাহিনিকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। তাই হিন্দুত্ববাদের গৌরবে পৃথিবী সব আধুনিক আবিষ্কার ভারতেই প্রথম হয়েছে বলে ভাবা হয়। যেমন বৈদিক যুগে ভারতে বিমান ছিল। অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে গণে‍‌শের দেহে হাতির মাথা বসানো হয়েছিল। হিন্দু ধর্মের অনুসঙ্গ হিসেবে বেদ, উপনিষদ, পুরানে যা কিছু অবাস্তব, কাল্পনিক তাকে সত্য ও বাস্তব দেখানো হয় অতীতের সাফল্য হিসেবে। মননে অন্ধ বিশ্বাসের চাষ করা সম্ভব হলে টো সহজে মানুষকে বিশ্বাস করানো যায়। মোদীর নেতৃত্বে আরএসএস-বিজেপি সেই কাজটিই করতে চাইছে। তার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে এসেছে বিদযালয়ের পাঠ্যসূচি বদল করে হিন্দুত্ববাদী অন্ধ বিশ্বাস গড়ে তোলার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে প্রথমে জোর দেওয়া হয়েছে ইতিহাস পুনর্লিখনে। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের উপর দাঁড়িয়ে প্রমাণ নির্ভর যে ইতিহাস চর্চা সারা বিশ্বে হয় তাকে বর্জন করে প্রমাণহীন, যুক্তিহীন বিশ্বাসনির্ভর ইতিহাস হিন্দুত্ববাদের পছন্দ। কারণ সেখানে নিজেদের পছন্দ মতো হিন্দুত্ববাদের উপযোগী ইতিহাস বানানো যায়। ইতিহাস বানালেই সবাই সেটা গ্রহণ করবে তেমনটা নাও হতে পারে। তাই শিশু থেকে মানুষকে যুক্তি-বিজ্ঞানহীন অন্ধবিশ্বাসী বানিয়ে তোলার সমান্তরাল প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে পাঠ্যসূচি থেকে সেই সব বিষয় বাদ দেওয়া হচ্ছে যেগুলি বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও যুক্তিবাদী মনন তৈরি করতে সাহায্য করে। ইতিহাসের পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে মোঘল যুগকে। কারণ সেই যুগের প্রকৃত ইতিহাস পড়লে ছেলে-মেয়েরা মুসলিম যুগে ভারতে অনেক সাফল্য ও অগ্রগতির কথা জেনে যাবে। তাছাড়া আরও অনেক কিছু বাদ দেওয়া হয়েছে যেগুলি পড়লে তথাকথিত হিন্দুযুগকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো যাবে। পাশাপাশি হিন্দুযুগকে গৌরবান্বিত করতে অনেক মিথ্যা, বিকৃত ও বানানো ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে ঢোকানো হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের প্রশ্নহীন, যুক্তিহীন, বিজ্ঞান চেতনাহীন বানানোর বিজ্ঞানের সূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিবর্তনবাদকে। বিবর্তনবাদ শিখলে ভগবানের সৃষ্টিতত্ত্ব প্রশ্নের মুখে এসে যায়।
 

Comments :0

Login to leave a comment