Post editorial

রেড ভলান্টিয়ার্স ও আমাদের দুর্বলস্মৃতি

উত্তর সম্পাদকীয়​


তন্ময় ভট্টাচার্য

প্রতারক হিসাবে স্মৃতির দুর্নাম আজকের নয়। অল্প সময়েই ভুলিয়ে দেয় অনেককিছু। অনেকে আবার পুরাতন স্মৃতির কাছে ফিরতেও চান না। বিশেষ করে যা বেদনার, উৎকণ্ঠার। কিন্তু পাঁচবছর— এ কি খুব বেশি সময়? কোভিডে আচ্ছন্ন সেসব দিনকাল— এত সহজে ভুলে যাওয়ার মতো? যে-জীবনশিক্ষা দিয়েছিল সেই কালখণ্ড, তা অস্বীকার করার অর্থ নিজেদের অস্তিত্বকেই এড়িয়ে চলা। 
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে, রাজ্য তথা গোটা দেশেই কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। এবং তা প্রথমবারের চেয়েও মারাত্মক। দেশে তো বটেই, রাজ্যেও অক্সিজেনের অভাব, বিভিন্ন হাসপাতালে বেডেরও। সর্বত্র কাতর ধ্বনি, দুশ্চিন্তা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা। সেই সময়ে যাঁরা দলবদ্ধ হয়েছিলেন, শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি’-পঙ্‌ক্তিটির বিনির্মাণ করে হয়ে উঠেছিলেন সুরাহা, পাঁচ বছর পেরিয়ে তাঁদের আরেকবার ধন্যবাদ জানানো উচিত। সেইসঙ্গে বারংবার লিখে চলা উচিত তাঁদের কথা— সমাজের সঙ্কটে একত্রিত হয়েছিলেন যাঁরা। নইলে কে ভেবেছিল, একুশ শতকের এই স্বার্থসর্বস্ব দিনকালে এমনও ঘটতে পারে!
২০২১, মার্চ-এপ্রিল মে। ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ, ওয়েবসাইট, পোস্ট। সোশাল মিডিয়ার শক্তি সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল আরেকবার। কোনও রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়াই একদল মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন অপরের সাহায্যে। কোন হাসপাতালে কত বেড খালি— চব্বিশ ঘণ্টা ধরে আপডেট দিয়ে চলা। ফোন করে-করে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়া। অক্সিজেনের চূড়ান্ত আকালেও, ঠিক কোথায় খোঁজ করলে সিলিন্ডার পাওয়া যেতে পারে— তার হদিশ। আকাশছোঁয়া দাম যতটা সম্ভব কম করার চেষ্টা। প্রয়োজনে নিজেই সেই সিলিন্ডার নিয়ে হাজির হওয়া রোগীর বাড়িতে। ফুরিয়ে গেলে, প্ল্যান্টে গিয়ে রিফিল করা। কখনও আবার চাঁদা তুলে কিনে ফেলা আস্ত সিলিন্ডারই। রোগী বা তাঁর পরিজনেরাও— যাঁরা সম্পূর্ণ সিস্টেম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, সাহায্য নিচ্ছেন এইসব ফ্রিল্যান্স ভলান্টিয়ারদের। ভলান্টিয়াররা কখনও ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্সের, কখনও নিজেরাই পিপিই কিট পরে হাজির হচ্ছেন কোভিড-আক্রান্তের বাড়িতে। প্রয়োজনে নিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই। সেই রোগী সুস্থ হয়ে ফিরে এলে, উল্লাস। যদি শেষাবধি প্রয়াত হন, বিষাদে ডুবে যাওয়া। ভলান্টিয়ার, রোগী ও পরিজনদের মধ্যে গড়ে উঠছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। শুধু এসবই নয়, যখন প্রাথমিক কোভিড টেস্ট করার উপায়টুকুও কঠিন হয়ে উঠছে, সঠিক পথ বাতলে দিচ্ছেন ওই ভলান্টিয়াররাই। কেউ ঘরবন্দি হয়েই লড়ে চলেছেন দিনরাত, কেউ পথে নেমে। রান্না নেই? বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। ওষুধ দরকার? ‘আছি তো!’ বদ্ধ একটা শহর, জীবন-মরণের টানাপোড়েন আর তার মধ্যেই একদল মানুষের অক্লান্ত লড়াই। দেবদূত বলা চলে?
এ তো গেল তথাকথিত ‘ব্যানারহীন’ ভলান্টিয়ারদের কথা। আরেকদল, ‘রেড ভলান্টিয়ার’, সে-সময়ে যে-ভূমিকা রেখেছিল, তা অস্বীকার করা যায় না কিছুতেই। মূলত এসএফআই ও ডিওয়াইএফআই’র তরুণ-তরুণীরা, ‘রেড ভলেন্টিয়ার’ নাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রাজ্যের সর্বত্র। কখনও নিজেদের সাংগঠনিক জোরে, কখনও আবার পূর্বোক্ত ‘দলহীন’-এর সঙ্গে একজোটে। পরস্পর পরস্পরের সাহায্য নিয়ে পাহাড় জয় করার চেষ্টা। সোশাল মিডিয়া ভরে যাচ্ছে এলাকাভিত্তিক রেড ভলেন্টিয়ারদের ফোন নম্বরে। ‘যে-কোনও প্রয়োজনে ফোন করুন, আমরা আছি।’ রাজ্যজুড়ে গড়ে-ওঠা নেটওয়ার্ক। কেউ ব্যস্ত থাকলে, সঙ্গে-সঙ্গে অপরজনকে রেফার করে দেওয়া। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রোগী বা তাঁর পরিজনের কাছে ফোন হাজির। প্রথম দুটি প্রশ্ন— কোভিড রিপোর্ট আছে কিনা ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন কত। তার নিরিখে, পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ। যদি কেউ অসুস্থ না-ও হন, নিতান্তই ঘরবন্দি, প্রয়োজনে তাঁর পাশেও হাজির রেড ভলেন্টিয়াররা। কোভিড টেস্টের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি করা— কোনও দায়িত্বেই পিছপা নন তাঁরা। শহর হোক বা মফস্বল, যে-কোনও সময়েই হাজির। বিশেষ করে রাত্রিবেলা— যখন অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ির ব্যবস্থা করা কঠিন, রেড ভলান্টিয়ারদের দৌলতে কোনও-না-কোনও ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে ঠিকই।
এই দলে সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে নেতৃত্ব— রয়েছেন সকলেই। মানুষজন দু-’ত তুলে আশীর্বাদ করছেন তাঁদের। বিপদের আশঙ্কায় অনেকেরই ভরসা— আর-কেউ না থাকুক, রেড ভলান্টিয়ার্স আছে। প্রত্যেক এলাকায়, প্রত্যেক পাড়ায়। আজ, পাঁচ বছর দূরত্বে দাঁড়িয়ে, নিরপেক্ষ ভাবনায় তর্ক জাগতে পারে— বিধানসভা ভোটের আবহে, রেড ভলান্টিয়ার্সদের সেই সেবা তথা সাহায্য কি নিঃস্বার্থ ছিল, না মনের কোণে প্রচ্ছন্ন আশাও ছিল লুকিয়ে, যে, মানুষ নিশ্চয়ই এসব ল্য করে বামপন্থীদের ভোট দেবেন? হ্যাঁ, সেই আশা বা বিশ্বাস যে ছিল না, সেই দাবি করা মিথ্যা হবে। কিন্তু তা ছিল গৌণ, মুখ্য কারণ মানুষের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো। যদি কাছেপিঠে কোনও নির্বাচন না-থাকত, তাহলেও তাঁরা একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তেন পরিস্থিতি সামলাতে।
মনে পড়ছে বেলঘরিয়া দেশপ্রিয়নগরের রেড ভলান্টিয়ার্সের প্রধানের কথা— ‘আমরা হারলেও কাজ চালিয়ে যাবো। বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও রাজনীতিরই অঙ্গ। জিতি বা হারি— এক্ষেত্রে সেসব কোনও ব্যাপারই না।’ তাঁর কণ্ঠে যে-প্রত্যয় শুনেছিলাম, তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল রাজ্যজুড়েই। হ্যাঁ, দিনশেষে সেই বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা জেতেননি। কমবয়সিরা তাতে মুষড়ে পড়েছেন, অভিমানও ঘিরে ধরেছে সাময়িক, কিন্তু অচিরেই গা ঝাড়া দিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কাজে। নির্বাচনে হারের কারণে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি থেকে সরেননি তাঁরা। বাইশ-তেইশ বছরের এক তরুণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ করা কেন? জবাব এসেছিল— ‘আমরা আন্দোলন করে উঠে এসেছি। লাইফ রিস্ক তো থাকেই। সব জায়গাতেই। এসবে কি ভয় পেলে চলে?’ তরুণটির সেই বক্তব্য আনন্দ দিয়েছিল, আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল নিজেকেই। এমন নিঃস্বার্থ হতে আমিও কি পেরেছি!
ধীরে ধীরে কোভিডের প্রকোপ কমে আসে। আশ্চর্য হয়ে এ-ও দেখলাম, তথাকথিত ব্যানারহীন ভলান্টিয়াররা বা রেড ভলান্টিয়ার্স কখনোই কোভিডকালে তাঁদের লড়াইয়ের কোনও কৃতিত্ব দাবি করেননি, আলাদা করে তা ভাঙিয়ে কোনও সুযোগও নিতে চাননি। বরং চুপচাপ এগিয়ে গেছেন জীবনের অন্যান্য কাজে। বর্তমান নির্বাচনী প্রচারেও, বামপন্থীদের কেউই মনে করিয়ে দিচ্ছেন না পাঁচ বছর আগে কোভিডকালে তাঁদের কাজকর্ম বা অবদান। প্রাধান্য পাচ্ছে সাম্প্রতিক ইস্যুগুলোই। সঙ্কটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতিকে ভোটের ময়দানে ব্যবহার করতে চান না তাঁরা। আর এখানেই, চারপাশের সঙ্কীর্ণ মানসিকতার ঊর্ধ্বে জিতে যায় মনুষ্যত্ব, জেতে বামপন্থা।
বাঙালি ইতিহাস-বিস্মৃতি জাতি— এই দুর্নাম অনেকদিনের। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর আগের এই সংগঠিত উদ্যোগগুলিকেও যদি আমরা ভুলে যাই, নথিভুক্ত না-করি, ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে কি? 
(লেখক একজন সমাজ গবেষক)

Comments :0

Login to leave a comment