সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাই এই পরাজয়কে হজম করতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। তার জন্য প্রশাসনিক রীতিনীতি, আদর্শ নির্বাচন বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বেচ্ছাচারী কায়দায় বিরোধী দলগুলিকে বিশেষ করে যারা সংসদে তাঁকে গোহারা হারিয়েছে। সংসদে পরাজয়ের পর গায়ের ঝাল মেটাতে তিনি সরকারি প্রচার মাধ্যম দূরদর্শন এবং সংসদ টিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণের নামে বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।
সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতেই পারেন। তবে সে ভাষণে অবশ্যই আরএসএস বা বিজেপি’র রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে না। সরকারের নীতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সাফল্য ইত্যাদিই থাকবে সেই ভাষণে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ৪০ মিনিটের ভাষণের সিংহভাগ জুড়ে ছিল শাসক দলের রাজনৈতিক বক্তব্য। সেখানে তিনি বিজেপি’র নেতা হিসাবে নাম করে বিরোধী দলকে আক্রমণ করেছে তীব্রভাবে। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমকে বিজেপি’র দলীয় মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেছেন। এটা তিনি কোনও অবস্থাতে করতে পারেন না। বিশেষ করে দুই রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাডু) ভোটের মুখে আদর্শ আচরণবিধি লাগু থাকার সময় এমন কাজ চূড়ান্তভাবে বেআইনি। ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান না করলে এমন ঔদ্ধত্য কোনও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। সংসদে পরাজয়কে ভোটে বিরোধীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার জন্য প্রধামন্ত্রী সচেতনভাবে নির্বাচনবিধি লঙ্ঘন করেছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন প্রতিবন্ধকতা সরকারের প্রধানের থেকে আশা করা যায় না। যাঁর কাজ নিয়মবিধি অনুসরণ করে অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তিনি নিজেই নিয়ম ভেঙে অরাজকতায় উৎসাহ দিচ্ছেন।
যে কথাগুলি তিনি দূরদর্শনে ও সংসদ টিভিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে বলেছেন সেই কথাগুলিই নির্বাচনী প্রচার সভায় দ্বিগুণ তীব্রতায় উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন মহিলা বিল আটকে দিয়ে বিরোধীরা ভ্রূণ হত্যা করেছে। মহিলারা কোনোদিন এদের ক্ষমা করবেন না। এখন প্রশ্ন হলো সংসদে বিরোধীরা যে বিল আটকেছেন সেটা কি মহিলা সংরক্ষণ বিল ছিল নাকি মহিলা সংরক্ষণ বিলের মোড়কে আসন পুনর্বিন্যাস বিল ছিল। এই চরম সত্যকে আড়াল করে প্রধানমন্ত্রী অর্ধসত্য ও বিকৃত তথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন।
বিরোধীরা বার বার সোচ্চারে বলছেন মহিলা বিল নিয়ে তাদের কোনও আপত্তি নেই। তারা একশো ভাগ বিলের পক্ষে। মহিলা বিল আটকানোর কোনও প্রশ্নই নেই। প্রকৃত সত্য হলো ২০২৩ সালেই সম্মিলিত বিরোধীদের পূর্ণ সমর্থনে মহিলা সংরক্ষণ পাশ হয়েছে। মোদীরা চাইলেই ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে সেটা প্রয়োগ করতে পারে। কেউ তাতে বাধা দেবে না, আপত্তিও করবে না। কিন্তু মোদীরা সেটা চাইছে না। মোদীদের কাছে মহিলা বিল থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসন পুনর্বিন্যাস বিল। মোদীদের ক্ষমতা দখলের রাজনীতির স্বার্থে জরুরি পুনর্বিন্যাস বিলে সমস্ত বিরোধীদের চূড়ান্ত আপত্তি আছে। পর্যাপ্ত আলোচনা না করে স্বৈরাচারী কায়দায় একতরফা বিলটি পাশ করাতে চায় বিজেপি। তাই বিরোধীদের প্যাঁচে ফেলে কাজ হাসিল করতে আসন পুনর্বিন্যাস বিলের মোড়ক হিসাবে যোগ করা হয়েছে তিন বছর আগে পাশ হওয়া মহিলা সংরক্ষণ বিলকে। এটা এক ধরনের নিম্নমানের শঠতা। মানুষকে বোকা বানিয়ে বিরোধীদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে ভোটে ফায়দা লোটার নিকৃষ্টমানের কৌশল অবলম্বন করেছেন মোদীরা।
Editorial
দুরাত্মার শঠতা
×
Comments :0