অনিন্দিতা দত্ত : পানিট্যাঙ্কি
আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে অপসারিত করতে লড়াইয়ের নতুন রাস্তা খুঁজে নিয়েছেন মানুষ। এই লড়াই মোদী ও দিদিভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, এই লড়াই বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই। শুক্রবার দার্জিলিঙ জেলা গ্রামীণ এলাকার একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে এমনটাই বলেছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেছেন, কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে উৎখাত করতে, তৃণমূল কংগ্রেস দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যার্থতার বিরুদ্ধে জনগন সোচ্চার। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে দিয়ে লুটেরাদের রাজ্য থেকে হটাতে প্রস্তুত বাংলার মানুষ। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফাঁসিদেওয়া খড়িবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআই(এমএল)’র প্রার্থী সুমন্তী এক্কা এবং মাটিগাড়া নকশালবাড়ি কেন্দ্রের প্রার্থী ঝরেন রায়ের সমর্থনে রাঙ্গাপানি, খড়িবাড়ির পানিট্যাঙ্কি বাজার, নকশালবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে একাধিক জনসভা এবং রাঙ্গাপানি সংলগ্ন ভূজিয়াপানি ও নকশালবাড়ি রথখোলা এলাকায় পৃথকভাবে দুটি রোড শো’তে অংশগ্রহণ করেছেন সেলিম। ছিলেন জীবেশ সরকার, সমন পাঠক, গৌতম ঘোষ, সিপিআই(এম) প্রার্থী ঝরেন রায়, সিপিআই(এমএল)’র প্রার্থী সুমন্তি এক্কা, সিপিআই(এমএল) নেতা অভিজিৎ মজুমদার, বাসুদেব বসু সহ অন্যান্য পার্টি নেতা কর্মীরা। এদিন নকশালবাড়িতে রথখোলা মোড় থেকে শুরু করে খাটানিমা মোড়, পানিঘাটা মোড় হয়ে নকশালবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের সামনে এসে রোড শো’র সমাপ্তি হয়।
সেলিম বলেছেন, ভোটের তালিকায় কার নাম থাকবে আর থাকবে না এই নিয়ে এই নিয়ে এসআইআরের নাম করে গত পাঁচ ছয় মাস ধরে আমাদের রাজ্যে চূড়ান্ত হয়রানি ও বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। ভোটার লিস্টকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপি নকল যুদ্ধ খেলায় মেতেছে। আর লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা মামলা করেছিলাম। সুপ্রিম কোর্টে একটার পর একটা শুনানি হয়েছে। ভোটার লিস্ট করার কথা ছিলো সরকারি অফিসারদের নিয়ে ইলেকশন কমিশনের নেতৃত্বে। কিন্তু তা হয়নি। ভোটার লিস্ট হয়েছে যারা সারা বছর শাসক দলের চুরিতে সাহায্য করেন। ঘুষ নিয়ে কাজ করেন। ভোট চুরিতে শাসকদলকে সাহায্য করে। পাথর, বালি, কয়লা, গরু পাচারের হিস্সেদারির সাথে যুক্ত। অথচ নির্ভুলভাবে ভোটার তালিকা তৈরী করতে পারেনা। স্বচ্ছ্ব ভোটার নিয়ে তালিকা নিয়ে নোংরা রাজনীতি করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে বিজেপি। যারা বংশ পরম্পরা এখানে বসবাস করছেন এমনসব বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে। এক্ষেত্রে ভোটারের দোষ নেই। যারা ভোটার তালিকা তৈরী করেছে তাদের দোষত্রুটি রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে যাদের নাম তাদের মধ্যে অনেক হিন্দু, আদিবাসী, তপশীলি, মতুয়া, উদ্বাস্তু আছেন। বিজেপি তৃণমূল আমাদের দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে ভাঙতে চাইছে। পাশাপাশি মন্দির মসজিদের নাম করে জাতপাত ধর্ম বর্নের ভিত্তিতে ভাগাভাগি করে মানুষের রুটি রুজির ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনে সমস্ত অধিকার কেড়ে নেবার মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ভোটাধিকারের অধিকার হরণ করে জাত, ধর্ম ভাষার নামে বৈষম্যনীতি কায়েম করতে চাইছে কেন্দ্রের সরকার। সেলিম বলেন, গোটা রাজ্যে বিজেপি’র নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদি শক্তির উত্থান সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ঐক্যকে আলাদা করতে চাইছে। চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিকদের বেতন, বন্ধ চা বাগান খোলা, ১০০ দিনের কাজকে ২০০ দিন করা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করে ৬০০ টাকা করার প্রশ্নে আমাদের লড়াই। কিন্তু তৃণমূল বিজেপি যারা সারা বছর কাজের কোন কথা বলেনি, তারাও নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে এখন বলছে চাকরির কথা। মিথ্যে কথা বলছে। মোদী সরকার ২০১৪ তে বলেছিলো বছরে দুই কোটি বেকারের চাকরি দেবে। এখন বলছে ক্ষমতায় আসলে বছরে এক কোটি চাকরি দেবে। আবার নির্বাচনের সামনে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। শূন্যপদে নিয়োগ হবে। তবে রেল, পোষ্টঅফিস, ব্যাঙ্ক, প্যারামিলিটারি ফোর্সের শূন্যপদ এখনও পূরন হয়নি কেন? ত্রিপুরা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, বিহার বিজেপি রাজ্যগুলিতে শূন্যপদ পড়ে রয়েছে কেন? নিয়োগ হয়নি কেন? সবটাই ভাঁওতা। আমরা ভাঁওতার কথা বলি না। ডবল ইঞ্জিনের সরকারের সময়ে প্রতিদিন দেখছি মনিপুরের জাতিদাঙ্গা। উত্তরপ্রদেশের নয়ডাতে কিভাবে ন্যূনতম বেতন চাইলে শ্রমিকদের ওপর জুলুম করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মীরাটে ব্যবসায়ীদের দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
সেলিম বলেন, বুলডোজার রাজনীতির বিরুদ্ধে আমরা। দুই সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, মানুষ মারা নীতি, দুর্নীতি ও লুটতরাজের বিরুদ্ধে সকলের সমান অধিকারের দাবিতে লাল ঝান্ডা হাতে বামপন্থীরা ধারাবাহিকভাবে লড়াই সংগ্রামে রয়েছে। বামপন্থীরাই মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে, পরিবেশ নিয়ে কাজ করে, আদিবাসীদের স্বার্থে কাজ করে ভাষা, ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সবাই এককাট্টা হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত জনস্বার্থবিরোধী দুই সরকারকে পরাজিত করতেই হবে। বাংলাকে বাঁচাতেই হবে। বাংলা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আর বাংলার মানুষের ঐক্যকে সংহত করে বাঁচাতে হবে বাংলাকে। বামপন্থীরা শ্রমিক কৃষক, খেতমজুর, দিনমজুর, ছাত্র যুব মহিলাদের সুবিধার প্রশ্নে রাজনীতি করে। সব কিছু লুটে খাওয়াদের বিরুদ্ধে খেটে খাওয়াদের লড়াই করে।
নির্বাচনের মুখে মোদী উত্তরবঙ্গে এসে চা বাগিচা নিয়ে কথা বলছেন। সেই প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, চা শিল্পে যে অরাজকতা ও দৈন্যদশা চলছে বর্তমান রাজ্য সরকারের মত মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারও সে সব বিষয়ে সমান উদাসীন। অনাহারে বন্ধ চা শ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল দেখেও মোদী সরকার রাজ্য সরকারের মতোই নীরব ছিলো। তখনই কেন্দ্র সরকারের বড় ভূমিকা নেওয়া উচিৎ ছিলো। আসলে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারই চা বাগিচার মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করতেই ব্যস্ত। আমরা তিল তিল করে রাজ্যটাকে গড়েছিলাম। মমতা ব্যানার্জি রাজ্যটাকে লুটেপুটে শেষ করে দিয়েছে। নতুন করে রাজ্যটাকে গড়তে হবে। তারজন্য মানুষের ঐক্যকে আরো দৃঢ় করতে হবে। বাইরে থেকে কেউ এসে যেন ভোট লুট করতে না পারে। এবারের লড়াই রাজ্যকে রক্ষা করার লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি—র গোপন বোঝাপড়া সাধারণ মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছেন। ওরা নির্মান করতে পারে না। ওরা ভাঙতে জানে। রাজনীতি হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, স্কুল, কলেজ হাসপাতাল, গনপরিবহন, ট্রেনের জন্য। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান সর্বত্রই লুটের রাজত্ব চলছে। পরিবেশের আইন পালটে দিয়েছে মোদী সরকার। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
সেলিম বলেন, দেশে যে দক্ষিনপন্থী শক্তির উত্থান ঘটেছে তাতে করে স্থায়ী কাজকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক কাজ করানো হচ্ছে। অধ্যাপক পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োগ করা হচ্ছে। সরকারের কাজ স্টেট বাস, রেল , এয়ারপোর্ট , হাসপাতাল, স্কুলকলেজ, বাঁধ তৈরী, কারখানা গড়া, ছেলেমেয়েদের হাতে কাজ দেওয়া, সুষ্ঠু নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, অস্থায়ীদের স্থায়ী করা, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়মিতকরন করা, মিড ডে মিলে পুষ্টিকর খাবার বিতরন করা। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোকেই বেঁচে দিচ্ছে। দুই সরকার তাদের কাজ না করে ঢাকঢোল পিটিয়ে ধর্মের কাজ করছে। আমরা চাই রাজনীতি হোক ভোট হোক কাজ ও শিক্ষার দাবিতে। সেলিম বলেন, বিজেপি তৃণমূলের জমানায় আয় কমবে ব্যায় বাড়ছে। তাই চারিদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব। নতুন বামপন্থার উত্থান ঘটেছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। আমাদের আয়ের নিশ্চয়তার জন্য আয়ের স্রোত বাড়াতে দিকে দিকে বামপন্থীদের জয়ী করতে হবে।
Comments :0