Bengali Language

ভাষার জন্য গৌরবোজ্জ্বল লড়াই করেছে বাঙালি

বিশেষ বিভাগ ফিচার পাতা

শ্যামল কুমার মিত্র
 

২১এ ফেব্রুয়ারি প্রতিবছর ফিরে ফিরে আসে। কিন্তু এটা তো নিছক আনুষ্ঠানিক পালনের বিষয় নয়, ভাষাকে রক্ষা ও তার বিকাশের জন্য আমাদের কর্তব্যকেও স্মরণ করায়। ভাষার প্রতি ভালোবাসার জন্য যারা শহীদের মৃত্যবরণ করেছেন, তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল লড়াইকে আমরা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে দিতে পারি না।
১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে অসমে ভাষাভিত্তিক জনবিন্যাস ছিল, বাঙালি-৩৯,৫৪,০৩৫, অসমীয়া-১৯,৮৫,৫১৫, পাহাড়ি জনজাতি-১২,৫৩,৬১৩ অন্যান্য ভাষাভাষী ৭,৫৬,১৫০। অর্থাৎ অসমে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ছিল সর্ববৃহৎ ভাষাগোষ্ঠী। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি মহকুমা নিয়ে গঠিত কাছাড় জেলা বরাবর বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার পর অসমেই সর্বাধিক বাংলাভাষী বসবাস করেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত অসম বিধানসভার কাজকর্মে বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে এক ছাত্রসমাবেশে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ বললেন, ‘নিঃসন্দেহে অসম অসমীয়াদের জন্য।’ যার প্রতিক্রিয়ায় মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘অসম যদি হয় অসমীয়াদের জন্য, তবে ভারতবর্ষটা কাদের জন্য?’ 
১৯৫১ সালের জনগণনায় ভাষাবিন্যাস অনুসারে অসমে অসমীয়া ভাষী মানুষের সংখ্যা বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যার দ্বিগুণ করে দেখানো হয়, যা ১৯৩১ সালের জনগণনার ঠিক বিপরীত। ১৯৫১ সালের জনগণনার রিপোর্টকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া হলে, সরকারিভাবে অসম সরকারকে মেনে নিতে হয় যে অসম থেকে এত বিপুল সংখ্যায় বাংলাভাষীদের অসম ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে যে অসমে ভাষাগত বিন্যাস সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেছে। কারণ (১) অসমে সর্ববৃহৎ ভাষাগোষ্ঠী (১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে) বাংলাভাষীরা রাতারাতি বাংলা ভাষা ত্যাগ করে অসমীয়াকে মাতৃভাষা হিসাবে গ্রহণ করেছেন ব্যাপকহারে-এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। (২) ভিন রাজ্যে বসবাসকারী অসমীয়াদের সংখ্যা কার্যত প্রতীকী, তাই ভিনরাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যায় অসমীয়া ভাষী অসমে ফিরে গিয়ে জনসংখ্যায় ভাষাবিন্যাস সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন এমন তথ্যও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ১৯৩১ সালে অসমে বাংলাভাষীরা ছিলেন অসমীয়াভাষীদের সংখ্যার দ্বিগুণ, মাত্র ২০ বছরে অসমীয়া ভাষীরা হয়ে গেলেন বাংলা ভাষীদের সংখ্যার দ্বিগুণ? এর থেকে বোঝা যায় কি বিপুল সংখ্যায় বাংলাভাষীদের অসম ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।  ১৯৫৩ সালে আইন করে বাংলাকে বাদ দিয়ে অসমীয়া ও  ইংরেজিকে রাজ্যভাষার  স্বীকৃতি দেওয়া  হয়।  ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর অসম বিধানসভায় রাজ্যভাষা বিল পেশ করা হয়, ২৪ অক্টোবর তা অনুমোদিত হয়ে আইনে পরিণত হয়, যার ফলে অসমে অসমীয়া একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পায়। জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ অসমীয়া ভাষী। সে সময়ে সরকারি নিয়ম অনুসারে একভাষিক রাজ্য হওয়ার ন্যূনতম শর্ত ছিল জনসংখ্যার অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা হতে হবে সেই (এক্ষেত্রে অসমীয়া) ভাষাকে। ফলে একভাষিক হওয়ার সরকারি নিয়মকে না মেনে অসমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা করা হলো, রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী হিসাবে বাংলাভাষীরা প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হলেন। এই সময়কালে বাঙালি ছেলেমেয়েদের রাজ্য সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়, গোয়ালপাড়া জেলার বাংলামাধ্যম স্কুলগুলিকে অসমীয়া মাধ্যম স্কুলে পরিণত করা হলো। অসম সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে 'বাঙালি খেদাও' আন্দোলনে বাঙালির বাড়ি পোড়ে, বাঙালি খুন হয়, বাঙালি মা-বোনেরা নির্যাতিতা, এমনকি ধর্ষিতাও হন, বাঙালিদের উপর রীতিমত তাণ্ডব চলে, অসমে বাঙালিরা কার্যত অবাঞ্ছিত নাগরিকে পরিণত হন। সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং অন্যতম রাজ্যভাষা হিসাবে বাংলাকে স্বীকৃতির দাবিতে গোটা বরাক উপত্যকায় আন্দোলন শুরু  হয়। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জের এক গণসম্মেলনে তৈরি হয় 'কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ'। সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি সুরেন্দ্রনাথ চৌধুরি তাঁর লিখিত ভাষণে বলেন, ‘এক শ্রেণির সঙ্কীর্ণমনা, প্রাদেশিকতাবাদী ও দূরদৃষ্টিহীন লোক এই রাজ্যবিরোধ ও বিভেদ সৃষ্টি করে আসছেন। অসম রাজ্য যেন শুধু অসমীয়া ভাষাভাষীর, অন্য ভাষাভাষীরা যেন এই রাজ্যে অনভিপ্রেত, অবাঞ্ছিত। তাদের এই মনোভাব অদ্ভুত, অযৌক্তিক এবং দেশের স্বার্থের পরিপন্থী।’
১৯৬১ সালের ১৯ মে শুক্রবার সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, বাংলাভাষীদের মাতৃভাষায় পঠন-পাঠনের অধিকার ইত্যাদি দাবিতে ভোর ৪টে থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। ১৮ তারিখের মধ্যে এই আন্দোলনের প্রায় সব শীর্ষ নেতা সহ অসংখ্য কর্মী/ সমর্থক প্রেপ্তার হন। তাতেও আন্দোলন দমানো যায়নি। ১৯ মে গোটা বরাক উপত্যকা সহ সংলগ্ন অঞ্চলে স্বতঃস্ফূর্ত, সর্বাত্মক ধর্মঘট হয়। ঐ দিন রাজপথে মিছিল করার ‘অপরাধে’ মিছিলকারী বাংলাভাষীদের উপর কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ, ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং শেষপর্যন্ত পুলিশের গুলি চালনার ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন কুমারী কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাস, সুনীল সরকার, শচীন্দ্রনাথ পাল, সুকোমল পুরকায়স্থ, সত্যেন্দ্র দেব, ধীরেন্দ্র সূত্রধর, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস এবং তরণী দেবনাথ (মোট ১১জন)। এরপরে বরাক উপত্যকা জনবিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রায় মাসাধিককাল অসমে রাজ্য প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে অসম সরকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়, সরকারি ঘোষণা আসে -(১) কাছাড় জেলা তথা বরাক উপত্যকায় প্রধান সরকারি ভাষা হলো বাংলা, (২) এখানকার সরকারি অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সহ সর্বত্র প্রধান ভাষা হিসাবে বাংলা ব্যবহৃত হবে। শিলচরে ১১ জন ভাষাশহীদের স্মৃতিস্তম্ভ হয়েছে, ১৯৯৪ সালে শিলচরে ১টি বাংলা মাধ্যম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। ২০১১ সালে, ১৯ মে যে স্থানে ১৯৬১ সালে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, সেই স্থানে বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষাশহীদ কুমারী কমলা ভট্টচার্যের মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু আজও অসমে বাঙালির অস্তিত্ব ও অধিকার চূড়ান্ত অবহেলিত। তথাকথিত 'বিদেশি চিহ্নিত করণ' এর নামে অসমের বাসিন্দা বাংলাভাষীদের ওপর নতুন করে ধারাবাহিক সন্ত্রাস ও অত্যাচার নামিয়ে এনেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় মদতে অসমে বাংলাভাষীদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন ও  অত্যাচারের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার নীরব দর্শক। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চালিত নির্বিকল্প অবস্থান 'মনকে বড় পীড়া দেয়। ২০১১ সালে অসমের ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষ চলে গেল। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস বইয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই' ঐতিহাসিক আন্দোলন' একটু জায়গা করে নেওয়ার পক্ষে কি এতই অনুপযুক্ত? আক্ষরিক অর্থে, ১৯ মে’র ভাষাদিবস আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। 
১৯৩৭ সালের ৩ অক্টোবর লখনউ অধিবেশনে মুসলিম লিগ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ‘বাঙালি মুসলিমদেরও রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ ১৯৪৭ সালের ৬ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা দাবি তুললেন, ‘বাংলাভাষী পূর্ববঙ্গে বাংলা চাই।’ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলো, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হলো। তখন পূর্ববঙ্গের উর্দুভাষী মানুষ জনসংখ্যার মাত্র ৭%। পশ্চিম পাকিস্তানেও উর্দুভাষী জনসংখ্যার তুলনায় আরবি, ফার্সি, পস্তু ভাষাভাষীর মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ গোটা পাকিস্তানে উর্দুভাষীরা ছিলেন নিতান্তই সংখ্যালঘু। কিন্তু পাক সরকার বললেন, ‘মুসলমানের ভাষা উর্দু, হিন্দুদের ভাষা বাংলা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য ভাষাভাষীদের এটা মেনে নিতে হবে।’ ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সাংবিধানিক সভায় প্রখ্যাত বিপ্লবী ধীরেন দত্ত দাবি তুললেন, "সেহেতু পূর্ববঙ্গের মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, তাই পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে হবে"। পূর্ববঙ্গে মাতৃভাষা বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতির দাবিতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত বাংলাভাষী মানুষ আন্দোলনে শামিল হলেন। পবিত্র 'ইসলাম' এর নামে বাংলাভাষীদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার পাক-কৌশল ব্যর্থ হলো। ১৯৫২ সালে আরবিক লিপিতে বাংলার বর্ণমালা মেনে নেওয়ার সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন পূর্ববঙ্গবাসী। এই বছরের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে ঘোষণা করলেন, "একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।" ২৭ জানুয়ারি বিক্ষোভে ফেটে পড়ল গোটা পূর্ববঙ্গ। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ পূর্ববঙ্গের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হলো। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিশাল সমাবেশ থেকে ঘোষণা হলো, ২১ ফেব্রুয়ারি গোটা পূর্ববঙ্গে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা ঘোষণার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হবে। ২০ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করলেন পাক সরকার, ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট হলো সর্বাত্মক। প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশি গুলিচালনায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হলো রফিকুদ্দিন আহমেদ, বরকত, আব্দুস সালাম, এবং আব্দুল জব্বারের। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হলো সাফিউর রহমান, আহিউল্লাহ, আব্দুস সালাম এবং আব্দুল জব্বরের। একজন ৯ বছরের শিশুর মৃত্যু হলো পুলিশের গাড়ি চাপা পড়ে। বেশ কিছু মুণ্ডহীন মরদেহ উদ্ধার হয় যাদের পরিচয় জানা যায়নি। পুলিশি লাঠিচার্জে আহত হন অসংখ্য মানুষ। আন্দোলন তাতেও দমানো সম্ভব হয়নি, আন্দোলন উত্তরোত্তর আরও ব্যাপক হতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আবু হোসেনের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ববঙ্গে বাংলাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেন, ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে শহীদ দিবস হিসাবে ঘোষণা করেন, ঐ দিন সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এই ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস 'হিসাবে ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ প্রস্তাবে বলা হয়েছে,"Languages are the most powerful instruments of preserving and developing our tangible and intangible heritage. All moves to promote dissemination of Mother Tongues will serve not only to encourage linguistic diversity and multilingual education but also to develop fuller awareness of linguistic and cultural traditions throughout the world and to inspire solidarity based on understanding, tolerance and dialogue."
১৯৬৪ সালে তামিলনাড়ুতে তামিল ভাষার বদলে হিন্দিকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, ৯ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন, 'চিন্নাস্বামী' নামে এক আন্দোলনকারী তিরুচিরাপল্লি রেল স্টেশনে গায়ে আগুন দিয়ে শহীদ হন, সরকার তীব্র গণআন্দোলন ও গণপ্রতিরোধে পিছু হটে। তামিলনাডুতে হিন্দি আগ্রাসনের প্রয়াস ব্যর্থ হয়, সরকার তামিল ভাষাকে রাজ্যভাষা হিসাবে গণ্য করতে বাধ্য হয়।
বিশ্বে বাংলাভাষীরা সপ্তম বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। মান্দারিন, স্প্যানিশ, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, পর্তুগিজ ভাষায় পরেই বাংলার স্থান। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের মধ্যে থাকা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে বাংলা সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়, ১৯৬১ সালে অসমের বরাক উপত্যকায় সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পায় বাংলা। ১৯৬৪ সালে তামিলনাড়ুতে তামিলভাষা সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পায়। বিস্ময়করভাবে  পশ্চিমবঙ্গে সবশেষে ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে শিক্ষা, গবেষণা, আইন-আদালত-প্রশাসন, চিকিৎসা সহ সব কিছু হয় বাংলায়। পশ্চিমবঙ্গে আজও সর্বত্র ইংরেজি নির্ভরতাই বাস্তবতা। বাংলাদেশ, অসমের বরাক উপত্যকা, প্রবাসী বাঙালি এবং তামিলনাড়ুতে মাতৃভাষার প্রতি যে আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা দেখা যায়, তা পশ্চিমবঙ্গে বাঙালিদের মধ্যেও স্বাভাবিক প্রত্যাশিত। তাই ১৯ মে’কে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এ রাজ্যের বাঙালিদের মাতৃভাষা সম্পর্কে অসংবেদনশীল করে তুলতে দেওয়া যায় না। বিশ্বে ১৮.৯ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানি সত্যেন বসু বলেছিলেন,"যারা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়, তারা বাংলাটাও জানেন না, বিজ্ঞানও বোঝেন না।" কেন পশ্চিমবাংলায় সরকারি কাজকর্মে, বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও ব্যাপক হবে না?
 

Comments :0

Login to leave a comment