STORY — SOUMADIP JANA — HRIDAYE RAYE JAY EKUSHE — NATUNPATA — 2026 FEBRUARY 21, 3rd YEAR

গল্প — সৌম্যদীপ জানা — হৃদয়ে রয়ে যায় একুশে — নতুনপাতা — ২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২১, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  SOUMADIP JANA  HRIDAYE RAYE JAY EKUSHE  NATUNPATA  2026 FEBRUARY 21 3rd YEAR

গল্প  


 নতুনপাতা

  --------------------------------- 
   হৃদয়ে রয়ে যায় একুশে
  --------------------------------- 

সৌম্যদীপ জানা

 

পুরনো অ্যালার্ম ঘড়িটার অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল বুড়ো করিমের। চৌকি থেকে নেমে দাওয়ায় এসে করিম দেখল পুবের আকাশে সদ্য পাকা কামরাঙ্গার মত রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ফজরের নামাজ ঘোষণাকারী আযানের মায়াময় ধ্বনি।

“আল্লাহু আকবার...... আ...ল্লা....হ”

সব ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গিয়েছে সেহরি। করিমেরও সেহরি করার সময় হল—রুআপজা, খেজুর, পাউরুটি, দুধ আর আগের দিনে তৈরি করা ডিমের ঝোল—এই দিয়ে করিম সেহরি সারবে। কিন্তু খাবারগুলো ছুঁয়েও দেখল না বুড়ো করিম।

দেখতে দেখতে আজান শেষ হলো। আজান শেষ হয়ে গেল, আজকের দিনের মত যে মুখে আর কিছু তোলা যাবে না! তবুও এক টুকরো খাবারও করিম মুখে তুলল না। খেতে ইচ্ছে করছে না যে। তার মনে যেন কী একটা পুরনো কথা আস্তে আস্তে ভেসে উঠছে।

হঠাৎ করে করিম দাওয়ার ওপরে বসে পড়ল। দুটো হাত বুকের কাছে জোড় করে সে কী বলবে ভেবে একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করল—
“ই...হে আল্লাহ!”

কথাটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যেন আপনা আপনি বুড়োর দুই চোখ বন্ধ হয়ে গেল আর মাথার মধ্যে যেন শুরু হলো এক রক্তাক্ত ইতিহাসের বায়োস্কোপ।

হঠাৎ করে করিম দেখতে পেল সে আর বুড়ো নেই। তার পরনে নেই লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ করিমউদ্দিন। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মিলের কালো প্যান্ট আর হাতে প্ল্যাকার্ড, যার উপর লেখা আছে—
“উর্দু নয় বাংলা চাই, বাংলা কথা বলতে চাই!”

তারই মত আরও শত শত সমবয়সী কিংবা জুনিয়র বা সিনিয়র সাদা পাঞ্জাবি পরে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এগিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের দিকে। আজ যে তাদের জমায়েত হওয়ার দিন। আজ যে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। আজ যে তাদের অধিকারের দিন, আজ যে তাদের মুক্তির দিন। যে অরাজকতা এতদিন দেশে চলছে তার শান্তিপূর্ণ অবসানের দিন আজ। আজ যে একুশে ফেব্রুয়ারি।

৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই কোনো বাঙালিই—হিন্দু মুসলমান—পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে সুখী হতে পারেনি। ধর্মের নামে দেশের ভাগাভাগি এ কেমন মগের মুলুক? কোথাকার কে পশ্চিমের লম্বা চওড়া, দাঁতভাঙা উর্দু বলা লোকগুলো কিনা বাংলা শাসন করবে! আবার তারা ঢং করে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের নাম দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তান! করিমের হাসিও পায় আবার কষ্টও হয়। কিন্তু এতদিন সে কষ্টটাকে চেপে রেখেছিল তার বুকের ভিতর। আজ তার মুক্তির দিন।

দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে মাথার উপরে বাজের মত ঘোষণা করল—আজ থেকে রাষ্ট্রভাষা উর্দু, বাংলা আর চলবে না। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত সব চলবে উর্দুতে। বাংলার ছেলে মুখে বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতে পারবে না! গাওয়া যাবে না কবিগুরু কিংবা বিদ্রোহী কবির গান।

এ কেমন কথা?

ব্যাস, তারপরে এই বাংলার সহস্র দেশপ্রেমিক ছেলের শিরা-ধমনীতে বইতে লাগল বাংলা ভাষার মাধুর্যের স্মৃতি। তারা জীবন দেবে কিন্তু বাংলা ব্যতীত কোনো ভাষায় কথা বলবে না।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় শুরু হল তীব্র প্রতিবাদ। যদিও সশস্ত্র বিপ্লবের কথা তখনও কেউ ভাবেনি। সভা-মিছিল করেই প্রতিবাদ জানানো শুরু হল। কিন্তু কী নীচ হিংস্র বর্বর ওই গদিতে বসে থাকা পাকিস্তান সরকার আর তার চামচারা! শান্তিপূর্ণ মিছিলে কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তীর মঞ্চে পর্যন্ত তারা লাঠিচার্জ করতে কিংবা টিয়ার গ্যাসের সেল ছুড়তে পিছপা হয়নি।

কত তরুণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। কত যুবক চিরকালের মত শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ল পুলিশের লাঠির আঘাতে। কিন্তু এসব কেন?

এসবের একমাত্র কারণ—অজন্ম বাঙালিরা বাংলায় কথা বলেছে, তাও আবার তাদের শাসিত পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে!

হায় ঈশ্বর, বাংলা মায়ের ছেলে কিনা শেষে বাংলা বলতে গিয়েই মার খেল!

সেদিনও এমনই একটা শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিল করিম। সঙ্গে ছিল তার প্রাণের বন্ধুরা—রফিক, আসিফ, মইদুল, বরকত—আরও কত চেনা অচেনা ভাই। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান—
“উর্দু নয় বাংলা চাই, বাংলা কথা বলতে চাই!”

রমনা মাঠের কাছাকাছি চলে এসেছিল করিমদের দলটা। এমন সময় কান ফাটানো একটা সাইরেনের শব্দ! সবাই এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। করিম ছিল মিছিলের একদম সামনের দিকে। হঠাৎ সে দেখল ডান দিকের মেন রোড থেকে তাদের দিকে ছুটে আসছে কয়েকটা পাকিস্তানি পুলিশের জিপ গাড়ি। হুড খোলা জিপের উপর থেকে উঁকি মারছে টুপি পরা কয়েকটা হিংস্র মুখ। হাতে তাদের রাইফেল।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনের জিপটা থেকে এক পুলিশ রাইফেল উঁচিয়ে ধরল মিছিলের দিকে।

গুড়ুম শব্দে কেঁপে উঠল রমনা মাঠ। রফিক লুটিয়ে পড়ল তার মাতৃভূমির প্রান্তরে। করিমের চোখের সামনে তার প্রাণের বন্ধু রফিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাতর আর্তনাদে সেদিন করিমের চোখের সামনে শহীদ হয়ে গেল তার ভ্রাতৃসম রফিক। সেদিন নিজেকে বড় অসহায় লাগছিল করিমের। ওই পিশাচগুলো শুধু ভাষার দোহাই দিয়ে তার চোখের সামনে তার প্রাণের বন্ধুকে মেরে ফেলল!

হায় আল্লাহ, এরা কি মানুষ না মানুষরূপী পিশাচ?

কিন্তু তারা ক্ষান্ত হল না। পুরো মিছিলটার উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে লাগল। ঝরে গেল আরও চারটি প্রাণ—শফিক, জব্বার, বরকত আর সালাম। রক্তে ভেসে গেল রমনা মাঠ। চারদিকে ক্রন্দনরোল।

সেদিন চোখে জল আসলেও নিজেকে আটকে রেখেছিল করিম। কারণ সে জানত—যদি আজ সে ভেঙে পড়ে, তবে আর কোনোদিন বলতে পারবে না—
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”

তারপর পদ্মার উপর দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। কেটে গেছে কুড়ি বছর। ৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে এতদিনের আটকে রাখা চোখের জল বেরিয়ে এসেছিল করিমের। বঙ্গবন্ধুর হাতে উত্তোলিত লাল-সবুজ পতাকার সামনে সেদিন প্রাণভরে কেঁদেছিল সে।

কিন্তু নিয়তি নির্মম। স্বাধীনতার পরও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তাকে কষ্ট দেয়। করিম কখনো ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার মনে করেনি। তার কাছে মুসলিম ছাত্র যেমন প্রিয়, তেমনি পাশের রথীন বাবুর ছেলেমেয়েরাও সমান আদরের।

আজ তাই একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করতে তার মন চায় না। আজ গোটা দুনিয়ায় একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হলেও আসল একুশে উদযাপিত হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা বুড়ো মোহাম্মদ করিমউদ্দিনের হৃদয়ে। করিম জানে—জাতি মরে গেলেও ভাষা রয়ে যায়, মানুষ মরে গেলেও স্বপ্ন রয়ে যায়।

ভোরের প্রথম কাক ডেকে ওঠে করিমের উঠোনের বটগাছটার ডালে। অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে—

“আমি বাংলায় গান গাই,
আমি বাংলার গান গাই,
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।”

Comments :0

Login to leave a comment