মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রতিটি বাঙালির কাছে গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন হিসাবে গন্য হয়ে আসছে আজও। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো রফিক,জব্বার,শফিউল,সালাম,বরকত প্রমুখ। ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আগামীকাল শনিবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে ঢাকা সহ সারা দেশে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার অমর একুশে ফেব্রুয়ারির ৭৪ বছর পূর্ণ হবে। শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের জনগণ ভাষাশহীদদের প্রতি স্মৃতির মিনার চত্বরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। একুশের ভোরে সাধারণ মানুষ কালো ব্যাজ পরে প্রভাতফেরির মাধ্যমে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাবেন। ৭৪ বছর পূর্তিতে রাজধানীজুড়ে আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শনিবার বাংদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বয়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এই দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন সহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট ও হরতালের আহ্বান করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই হরতাল কর্মসূচির নেতৃত্ব প্রদান করেন। যার ফলে তাঁর উপর পুলিশি নির্যাতন চালানো হয় এবং ওই দিনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠন করা হয়। সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ২৪ জন নেতৃবৃন্দকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। মুচলেকা দিয়ে অনেকে নিজেদের মুক্ত করলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রতি অটল ছিলেন। এর পর এই আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও ১৯৫২ সালের শুরু থেইে তা ভিন্ন রূপ লাভ করে। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের বঙ্গবন্ধু আটকাবস্থায় গোপনে বৈঠক করে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশনা প্রদান করেন। পাশাপাশি ১৯৫২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জেল হাসপাতালে থেকে কতিপয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডেকে গণপরিষদ ঘেরাও করার পরামর্শ দেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এই আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত সংঘবদ্ধ ছাত্র-জনতাকে কোনোভাবেই দাবিয়ে রাখা যায়নি। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয় রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অগণিত শহিদের রক্তে। ভাষা আন্দোলনের গতিবেগ দমিয়ে রাখতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরীণ রাখে। তবে জেলে অবস্থানকালেই বঙ্গবন্ধু 'রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা' ও 'রাজবন্দীদের মুক্তি'-র দাবিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এক সপ্তাহের অনশন করেছিলেন। ভাষার অধিকার ও রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল লড়াই সংগ্রাম ছিল গৌরবগাঁথা অধ্যায়। দিনটি যথাযথ পালনের সকল প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম দল সমুহ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনে যারা আত্মোৎস্বর্গ করেছিলেন সেই শহীদদের স্বপ্ন আজও বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হয়নি। একুশের চেতনার পথ ধরে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হয়নি। আমাদের দেশে একুশে চেতনার বিপরীত ধারায় শাসন চলছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলি রাজনৈতিক স্বার্থে পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার, জাতিসত্তা অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।’’
Comments :0