West Bengal Election

ডুয়ার্সের মা-বোনেদের জোটেনি ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, নীরব দুই ফুল

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি

ডুয়ার্সের সবুজ দিগন্তে এখন উৎসবের আবহ নেই, বরং ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুরু হয়েছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিজ্ঞাপনী মোড়কে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ বইলেও জলপাইগুড়ি জেলার প্রান্তিক জনপদগুলোতে বাস্তব চিত্রটা বড়ই করুণ। বিশেষত আদিবাসী জনজাতির মহিলা শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সরকারি প্রচারের চাকচিক্য আর শ্রমজীবী মানুষের থালার অন্নের মধ্যে ব্যবধান ঠিক কতখানি।
ধূপগুড়ি থেকে চামুর্চি, বানারহাট থেকে নাগরাকাটা— সর্বত্রই এক বিষণ্ণ ছবি। ভোর হওয়ার আগেই এক মুঠো পান্তা খেয়ে দলবেঁধে গাড়িতে চেপে বসছেন মহিলারা। গন্তব্য শহরের নির্মাণ প্রকল্প বা দূরবর্তী কৃষিজমি। সারাদিন প্রখর রোদে ধান রোপণ, আলু তোলা কিংবা ঢালাইয়ের কাজ শেষে জোটে মাত্র ৪০০ টাকা মজুরি। বর্তমান বাজারে এই মজুরি যে কতখানি নিষ্ঠুর প্রহসন, তা বোঝা যায় যখন দেখা যায় যাতায়াত খরচ বা গাড়ি ভাড়া দিতেই পকেট থেকে খসে যাচ্ছে ১২০ টাকা। দিনশেষে ঘরে নিয়ে যাওয়ার মতো থাকছে মাত্র ২৮০ টাকা। চাল, ডাল, তেলের আকাশছোঁয়া দামের সামনে এই সামান্য উপার্জন দিয়ে সংসার চালানো কার্যত এক অসম্ভব জাদুকরী লড়াই।
এই বঞ্চনা প্রসঙ্গে ধূপগুড়ির বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘তৃণমূল আর বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন আর সিঙ্গেল ইঞ্জিনের লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ গরিব মানুষের জীবন। একদিকে তৃণমূল 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' দিয়ে প্রচারের ঢাক পেটাচ্ছে, অথচ ডুয়ার্সের চা-বাগান ও কৃষি ক্ষেত্রের হাজার হাজার মহিলা আজও ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। সরকারি প্রকল্পের টাকা যাচ্ছে শাসকদলের নেতা আর ঘনিষ্ঠদের পকেটে। আমরা বামপন্থীরা দাবি তুলছি— সস্তা খয়রাতি নয়, চাই কাজের অধিকার এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য। ডুয়ার্সের এই মা-বোনেদের হাড়ভাঙা খাটুনিকে অবজ্ঞা করার জবাব ব্যালট বক্সেই মিলবে।’’


তীব্র অভাবের তাড়নায় এই জনপদগুলোর পুরুষরা ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছেন ভিন রাজ্যে। কেরালা বা বেঙ্গালুরুতে শ্রমিকের কাজে গিয়ে তাঁরা যা পাঠান, তাতেও সবসময় সুরাহা হয় না। ফলে পরিবার সামলানো থেকে শুরু করে অসুস্থ বয়স্কদের দেখাশোনা— সব দায়িত্বই এসে পড়ছে ঘরের মহিলাদের কাঁধে। আদিবাসী পাড়ায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে তীব্র ক্ষোভ। কেউ আবাস যোজনার বাড়ি পাননি, কেউ আবার বার্ধক্য ভাতার আশায় প্রশাসনের দরজায় ঘুরে ক্লান্ত। অভিযোগ উঠেছে, শাসকদলের ঘনিষ্ঠ ও অর্থবানরাই সরকারি তালিকার ওপরের দিকে জায়গা করে নিচ্ছে, আর প্রকৃত অভাবী মানুষ পড়ে আছেন ভাঙা কুঁড়েঘরে।
নাগরাকাটার বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী দিল কুমার ওঁরাও এই সংকটের গভীরে আলোকপাত করে বলেন, বাগানের যে সমস্ত শ্রমিকরা কাজের তাগিদে বাইরে যাচ্ছেন, তাঁদের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে এই শ্রমিকদের জন্য প্রথমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। বর্তমানে মজুরি কম হওয়ায় এবং বাগানের অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় অনেক পুরুষ শ্রমিক ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। সংসার চালানোর জন্য মহিলারাও নির্মাণ শ্রমিকের কাজ বা অন্য বাগানে কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বামফ্রন্ট সরকার এলে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের পুনরায় নিজেদের রাজ্যে এবং বাগানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যদি বাগানে সঠিক মজুরি বা হাজিরা পাওয়া যায়, তবে শ্রমিকরা অন্য কোথাও না গিয়ে বাগানেই কাজ করবেন।


নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। কিন্তু ডুয়ার্সের এই মা-বোনেদের ভাগ্যরেখা বদলায় না। বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চললেও সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে দুই পক্ষই নীরব। বামপন্থীরা পথে নেমে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন একটাই— এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর বঞ্চনার চক্রব্যূহ থেকে কি মুক্তি মিলবে? উত্তর দেবে সময়।

Comments :0

Login to leave a comment