ডাঃ ফুয়াদ হালিম
একটি তিক্ত সত্য কথা দিয়ে শুরু করা যাক।
মহারাষ্ট্রের ‘বিড’ নামে এক জেলায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা তাঁদের ঋতুকালীন সময়েও হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ থেকে বিরতি নিতে পারেননি। এর মূল কারণ হলো—কাজের একটি দিন অনুপস্থিত থাকলেই তাঁদের ওপর বিশাল অঙ্কের জরিমানা ধার্য করা হয়। তাই ওই জেলায় আখের ক্ষেতে কাজ করার সময় ঋতুকালীন রক্তপাতজনিত বিড়ম্বনা এড়াতে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা রোধ করতে—এই নারীরা শেষমেশ জরায়ু অপসারণের মতো কঠিন অস্ত্রোপচার করিয়ে নিতে বাধ্য হন।
কয়েক বছর আগে, মহারাষ্ট্রের 'বিড'-এর মতো এলাকাগুলোতে ব্যাপক হারে হিস্টেরেক্টমি বা জরায়ু অপসারণের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। যদিও এই জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, তবুও দেশের গ্রামীণ জেলাগুলোতে এটি এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আর যেসব নারী এই অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যান, তাঁদের অত্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসেও বিভিন্ন আদালত অপ্রয়োজনীয় হিস্টেরেক্টমি বন্ধ করার লক্ষ্যে রায় দিয়েছে। কিন্তু 'বিড'-এর মতোই দেশের অনেক জেলাতেও নারীদের দুর্দশা দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে। হিস্টেরেক্টমি— হলো জরায়ুর আংশিক বা সম্পূর্ণ অংশ অপসারণের অস্ত্রোপচার যা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকিৎসা পদ্ধতি। সাধারণত তখনই এই অস্ত্রোপচার করা হয়, নারীর জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা দুর্বল। এই বিধি রক্ষা করার ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে। উপকরণের খরচ, তার সহজলভ্যতা এবং বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি তার কারণ। পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের সুবিধা এবং নারীদের স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার পণ্যগুলোর প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং নারী ও কিশোরীদের জন্য যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থাও সমানভাবে জরুরি। প্রতি বছর ২৮ মে পালিত হয় সচেতনতামূলক দিবস, যার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী মাসিক বা ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা।
এই গুরুত্ব না থাকলে নারী শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফলে এটি সরাসরি মহিলাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদাকে প্রভাবিত করে। সুতরাং তথ্য পাওয়ার অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে বিভিন্ন সংগঠক, সামাজিক উদ্যোক্তা এবং রাষ্ট্রসংঘ সহ জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত বেশ কয়েকটি সংগঠন এ বিষয়ে নীরবতা ভেঙে বিশ্বব্যাপী এই বিষয়টির দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে।
'ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন না থাকার কারণে আমাদের দেশের মেয়েরা যারা ১৩ থেকে ৫৫ বছর বয়সের, তারা সামাজিক বঞ্চনার শিকার। প্রথমত: স্কুলে যে বালিকারা যায় তারা সমস্যার মধ্যে থাকে কারণ বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই। দ্বিতীয়ত: এই সংক্রান্ত পণ্যগুলি মেয়েদের কাছে উপলব্ধি নেই। ফলে ওই বিশেষ দিনগুলি অকাজের দিনে পরিণত হয় অর্থাৎ স্কুল কামাই হয়ে যায়। তৃতীয়ত: বহু ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মহিলাদেরকে হিস্টেরেক্টমি করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়াও ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মহিলাদের পিরিয়ড বা মাসিকের ক্ষেত্রে তাঁদের অপবিত্র বলে গণ্য করা হয়েছে। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। এর ইঙ্গিত আমরা পাই ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে।
এই ওল্ড টেস্টামেন্টে লেভিশিয়াস চ্যাপ্টারে মূলত তখনকার যে ছোঁয়াচে রোগগুলি ছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত চর্চা রয়েছে। সেই ৩ হাজার বছর আগেই ভাইরাস বাহিত রোগের ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিনের কথা বলা হয়েছে। বহু ভাইরাস ঘটিত সংক্রামনক রোগের ক্ষেত্রে রোগীর জিনিসপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা আছে। গুটি বসন্তের ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আসলে মানব শরীর থেকে যে বিভিন্ন রকম রস বের হয়, তার সবই অপবিত্র বলে ধরা হয়। তাহলে দেখা গেল ২৫০০ থেকে ৩০০০ বছর আগেই এইসব ধারণা আমাদের সমাজে চলে এসেছে। পুরুষ ও মহিলাদের শরীর নিঃসৃত রস সম্পর্কে নিউ টেস্টামেন্টেও একই ধারণা পোষণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান বলছে মেনোপজ শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে হয়। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে হয় না। মানুষের ক্ষেত্রে বায়োজিক্যাল ইভলিউশন বা জৈবিক বিবর্তনের পর আসে সোশাল ইভলিউশন বা সামাজিক বিবর্তন। যেমন দাদু দিদা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা-এঁদের দ্বারা নবজাতকদের লালন পালন হয়ে থাকে যা খুব গুরত্বপূর্ণ। মানুষ যখন চার পা থেকে দু’পা-তে এলো সেক্ষেত্রে ভ্রণের পথ সরু হয়ে গেলো, শিশুর মাথা ঘুরে গিয়ে নিম্নমুখী হলো। অর্থাৎ মায়ের মুখের উল্টো দিকে শিশুর মুখ থাকলো। ঠিক সেই কারণে মানুষের ক্ষেত্রে প্রসবের সময়ে ধাত্রীর বা সহায়িকার প্রয়োজন হয়, যা অন্য প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে হয় না।
সাধারণত মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে ৪৫০ মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল চলে। যে মহিলারা অতিরিক্ত দৈহিক শ্রমের কাজ করেন বা সাধ্যের অতিরিক্ত শ্রম দেন তখন তাঁদের যে পরিমাণ মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল হওয়ার কথা তা হয় না। অনিয়মিত হয়। ফলে ক্যান্সার, অটো ইমিউন ডিজিজ সহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। শ্রমের বাজারে তাঁরা আনফিট বলে ঘোষিত হন। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, কুকুরদের পিরিয়ড হয় না। কারণ তাদের যৌনক্রিয়া হওয়ার পরে জড়ায়ু প্রস্তুত হয় ভ্রুণ গ্রহণে। কিন্তু মানুষের মধ্যে সারা বছর ধরে পিরিয়ড সাইকেল চলে। কোনো সিজনালিটি নেই।
মূলত চারটি প্রজাতির মধ্যে যেমন মানুষ ছাড়াও শিম্পাঞ্জি, গরিলা, ওরাংওটাং এবং বানরের মতো প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের চক্র দেখা যায়। এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির বাদুড়, এলিফ্যান্ট শ্রু, স্পাইনি মাউস- এদের মধ্যে ঋতুস্রাব হয়। ডিমপাড়া থেকে জীবন্ত শিশুকে জন্ম দেওয়ার জন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যে বিবর্তন, তার মধ্যে প্লেজেন্টা বা গর্ভধারণ করে শিশুর পুষ্টিবিধান একটি বৈশিষ্ট। মানব শিশুদের জড়ায়ু এবং ডিমকোষ এবং যৌনাঙ্গ, অন্ডকোষ বা আনুষঙ্গিক যৌনাঙ্গ তৈরি হয়েছে যা সব থেকে প্রাচীন জিন স্ট্রাকচার হক্স জিন- তার পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
হক্স জিন হলো এক বিশেষ ধরনের জিন যা ভ্রূণের বিকাশের সময় প্রাণীর শরীরের গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান নির্ধারণ করে। এটি মাথা থেকে লেজ বা অগ্র-পশ্চাৎ অক্ষ বরাবর শরীরের প্রতিটি অংশের সঠিক বিন্যাস ও বিকাশ ঘটায়। অর্থাৎ প্রাণীজগতের মধ্যে মাথা, বুক পেট ইত্যাদি যে সিকোয়েন্সে থাকে তা নিয়ন্ত্রণ করে, প্রাণীদের দেহ গঠনের নকশা তৈরি করে। সুতরাং এটা বলা যায় যে মানুষের যৌনক্রিয়া, ভ্রুণ গঠন-এর মতোই ঋতুস্রাব- একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রতি বছর বিশ্ব মেস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে দিনটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ঋতুস্রাবের সাথে জড়িত সামাজিক কলঙ্ক পরিবর্তন করা। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ কোটি নারী ও কিশোরীর ঋতুস্রাব হয়। জীবনের এই স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর অংশটিকে প্রায়শই লজ্জাজনক এবং অপবিত্র হিসাবে দেখা হয় যা কাম্য নয়।
দিনটি পালনের জন্য ২৮ মে তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ একটি মাসিক চক্রের গড় ব্যবধান ২৮ দিন। এবং ঋতুস্রাবের সময়কাল পাঁচ দিন স্থায়ী হয়। তাই, তারিখটি ২৮/৫ রাখা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ঋতুস্রাব এবং ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই দিনটি পালন করা হয়। বিশ্বের বহু অঞ্চলে এখনও, 'ঋতুস্রাব' নিয়ে নানা কুসংস্কার ছড়ানো হয়, যার ফলে নারীদের প্রতি অনেক বৈষম্য ও বঞ্চনার ঘটনা ঘটে। সুতরাং এই উদ্যোগটি ঋতুস্রাব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এবং এটিকে স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টা। শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি একটি মানবাধিকারের বিষয়। ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য সমস্যা মেয়েদের, মহিলাদের স্কুলে বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়া কিংবা সমাজে নানা কাজে অংশগ্রহণের অধিকারকে সীমিত করে দিতে পারে, যা তাদের জীবনে উন্নতি করার সুযোগ কমিয়ে দেয়, রুজি রোজগারের ওপর প্রভাব ফেলে।
নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধ ও সংহতি আবশ্যক—যাতে তাদের অধিকার এবং ন্যায়বিচারকে রক্ষা করা যায়। এটি মর্যাদা ও স্বাধীনতারও বিষয়। সঠিক তথ্য এবং সহায়তার অভাবে, মাসিক বা ঋতুস্রাব মেয়েদের জন্য সারাজীবন একটি বড় কলঙ্কের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, তার জন্য সরকারি উদ্যোগ জরুরী।
Comments :0