সঞ্জিত দে : ধূপগুড়ি
রাজ্যে পালাবদলের পরেই গ্রামে বিজেপির দাপট দেখাতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে পানীয় জল সরবরাহ। পাম্পের গেটে বিজেপির দলীয় পতাকা লাগিয়ে একসঙ্গে দু’টি তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। এমনকি পাম্পের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মীকেও ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রায় চার মাস ধরে পানীয় জল পরিষেবা থেকে বঞ্চিত ধূপগুড়ি ব্লকের গাদং-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ঝাড়শালবাড়ি এলাকার ১৫/২৫৭ নম্বর পার্টের প্রায় ৬০০টি পরিবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৪ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়। তার পরের দিন, অর্থাৎ ৫ মে, ওই এলাকায় পানীয় জল সরবরাহের জন্য থাকা পাম্পের গেটে প্রথমে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ, গেটে দড়ি দিয়ে বিজেপির দলীয় পতাকাও লাগানো হয়। বর্তমানে পাম্পের গেটে দুটি তালা ঝুলছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। এর ফলে বন্ধ হয়ে রয়েছে জল সরবরাহ। স্থানীয় গ্রামবাসী চঞ্চলা শাখারির বক্তব্য ভোটের ফল বেরোনোর আগের দিন পর্যন্ত আমরা নিয়মিত জল পেয়েছি। কিন্তু ৫ মে-র পর থেকেই হঠাৎ জল বন্ধ হয়ে যায়। পাম্পের গেটে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে দুটি তালা মেরে দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাড়িতে জলের কল রয়েছে, কিন্তু সেই কলে এখন আর জল পাওয়া যায়না। বাধ্য হয়ে আয়রনযুক্ত জল খেতে হচ্ছে চাপাকল থেকে। একই দাবি করেছেনন, স্থানীয় বাসিন্দার। তাদের কথায় নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি নিয়মিত পানীয় জল সরবরাহ করা হয়েছে। বহু বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, কল রয়েছে, অথচ জল নেই।
আশি বছর বয়সী বৃদ্ধা প্রফুল্লা সরকার বলেন, ‘‘এই বয়সে এত দূর থেকে জল নিয়ে আসতে হচ্ছে। আগে বাড়ির কলেই জল পেতাম। এখন কখনও অন্যের বাড়ি থেকে জল চাইতে হচ্ছে, আবার কখনও পুকুরের জল ব্যবহার করতে হচ্ছে। পানীয় জল ছাড়া মানুষ কীভাবে থাকবে? মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে।’’ তবে পাম্পের গেটে বিজেপির দলীয় পতাকা কে বা কারা লাগাল, কেন দুটি তালা লাগানো হল এবং পাম্পের দায়িত্বে থাকা কর্মীকে কেন সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, সেই বিষয়ে বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনও উত্তর মেলেনি। একই সঙ্গে ওই কর্মীর বেতন বন্ধ হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জল সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম সমস্যায় পড়া ঝাড়শালবাড়ি এলাকার গৃহবধূ মিনতি সরকার বললেন, ‘‘পানীয় জলের জন্য আমাদের ভীষণ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পাশের বাড়ি থেকে জল নিয়ে আসতে হচ্ছে। অনেক সময় পুকুরের জল ব্যবহার করতে হচ্ছে। ওই জল দিয়ে রান্না, স্নান, ঘরের কাজ সবই করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে লোহার নলকূপের জলও ব্যবহার করছি। এতদিন ধরে জল বন্ধ থাকার পরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।’’ শুধু জল সরবরাহ বন্ধ হওয়াই নয়, পাম্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মীকেও সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
পাম্পের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মী জ্যোতিষ সরকার জানালেন,‘‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এই পাম্পের দেখভালের কাজ করে আসছি। কিন্তু পাম্পে তালা লাগিয়ে দেওয়ার পর আমাকে আর ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আমি আমার কাজটাও করতে পারছি না। কাজ না করতে পারায় আমার বেতনও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আমি চাই দ্রুত পাম্পের তালা খুলে দেওয়া হোক এবং আমাকে কাজে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’’
যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব, বিজেপির দাবি, পানীয় জল সরবরাহ কোনও বিজেপি কর্মী বা নেতৃত্ব বন্ধ করেনি। তাঁদের বক্তব্য, গাদং-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের পাঁচটি পাটের মানুষকে ওই পাম্প থেকে পানীয় জল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুরো কাজ এখনও সম্পূর্ণ না হওয়ায় বর্তমানে একটি গ্রামের মানুষই ওই জল পরিষেবা পাচ্ছেন। সেই কারণে অন্য এলাকার একাংশ মানুষ এসে পাম্পে তালা মেরে দিয়েছেন।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। সরব হয়েছে বিরোধীরাও। সিপিআই(এম) ধূপগুড়ি এরিয়া কমিটির সম্পাদক জয়ন্ত মজুমদার বলেন, ‘‘বিজেপি মানেই বৈষম্যের রাজনীতি। যে এলাকায় মানুষের কাছে পানীয় জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে চার মাস ধরে জল পরিষেবা বন্ধ থাকা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। প্রশাসন এতদিন কেন ব্যবস্থা নিল না, গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানই বা কেন উদ্যোগ নিলেন না—সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বিজেপি যদি জল পরিষেবা বন্ধ না করে থাকে, তাহলে পাম্পে বিজেপির দলীয় পতাকা লাগিয়ে তালা দেওয়ার ঘটনায় দলের নেতৃত্ব কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেটাও স্পষ্ট করতে হবে।’’
বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বলেন, ‘‘বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলাম। কারা পাম্পে তালা মেরেছে, সে বিষয়টি আমাদের জানা নেই। কেউ যদি তালা মেরে থাকে, তাহলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে প্রশাসনকে বলা হবে। প্রয়োজনে পদক্ষেপও করা হবে। আর সেখানে বিজেপির দলীয় পতাকা হয়তো কেউ বা কারা লাগিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই। বিজেপিকে বদনাম করার জন্যও এগুলো করা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’’
তবে পাম্পের গেটে দুটি তালা, বিজেপির দলীয় পতাকা এবং পাম্পকর্মীকে ভিতরে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। কে বা কারা তালা লাগিয়েছে, কেন জল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে এবং পাম্পকর্মীর বেতন বন্ধ হওয়ার বিষয়টি কতটা সত্য—তা প্রশাসনিক তদন্তেই স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।
Comments :0