Oil and Middle East Crisis

সব কেরামতি ফেল

সম্পাদকীয় বিভাগ

পশ্চিম এশিয়ার সংযুক্ত আরব আমীরশাহি এবং ইউরোপের চার দেশ সফর করে এসে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে জানিয়েছেন বিশ্বের বহু দেশ নাকি ভারতের উন্নয়নে শরিক হতে চায়। এই প্রসঙ্গে তিনি কয়েকটি নমুনাও উল্লেখ করেছেন কিন্তু নমুনাগুলি আকারে আয়তনে এবং গুরুত্বে এতটাই ক্ষুদ্র যে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে সেগুলি হিসাবেই আসে না। আসলে প্রধানমন্ত্রীর এবারের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে নানা মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পাঁচ দেশ সফরে বেরোবার আগে তিনি দেশবাসীকে স্বার্থত্যাগ, আত্মত্যাগ কষ্টস্বীকার, সংযম ইত্যাদি নিয়ে অনেক জ্ঞান বিতরণ করেছিলেন। একদিকে মার্কিন ডলারের তুলনায় টাকার দাম ঝড়ের গতিতে পতন এবং অন্যদিকে রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকায় দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। এইভাবে বিদেশি মুদ্রায় সঞ্চয় কমতে হলে এক সময় এমন অচলাবস্থা তৈরি হবে যে আইএমএফ’র কাছে হাত পাতা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে বিদেশি মুদ্রার খরচ কমাতে মোদী দেশবাসীকে বিদেশি পণ্য অর্থাৎ আমদানি করা পণ্য কিনতে বারণ করেছেন। ভারতীয়রা খাবার তৈরিতে যে ভোজ্য তেল ব্যবহার করে তার ৬০ভাগই আমদানি করতে হয়। আমদানি করতে বিদেশি মুদ্রা দরকার। তাই মোদী বলেছেন খাবারে বা খাদ্য তৈরিতে কম তেল ব্যবহার করতে। অথচ ১২ বছর ক্ষমতায় থেকে আত্মনির্ভরতা স্লোগান দেওয়া মোদী দেশে ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়াতে পারেননি।
তেলের ব্যবহার কমাতে তিনি ট্রেন-বাসে চড়তে, ঘরে বসে কাজ করতে বলেছেন। গাড়ি চড়তে বারণ করেছেন। কেননা ভারত তার প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ তেলই আমদানি করে। তেলের যুদ্ধের আবহে ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে এক ঝটকায় ১১০ ডলারে পৌঁছে গেছে। ফলে তেল কিনতে গিয়ে জলের মতো বেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশি মুদ্রা। এক্ষেত্রে ১২ বছরে মোদী দেশীয় তেল উৎপাদন বাড়াতে পারেননি। বরং কমে গেছে। মানুককে সোনা কিনতেও তিনি নিষেধ করেছেন।
সর্বোপরি দেশের নাগরিকদের অন্তত একবছর বিদেশ সফর না করতে বলেছেন। বিদেশ সফর মানেই দেশ থেকে ডলার চলে যায় বিদেশে। সঞ্চয় কমে যায়। জনগণকে বিদেশ সফরে নিষেধ করে নিজে চার হাজার কোটি টাকায় বিদেশ থেকে কেনা বিলাসী বিমানে চেপে নিজেই বেরিয়ে পড়েছিলেন বিদেশ ভ্রমণে। শেষ করলেন মেলোডি সহযোগে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সঙ্গে একদিন কাটিয়ে। এই নিয়ে বিস্তর সমালোচনা ও রসিকতা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীকে হাজির করতে হয় তিনি বিদেশ সফরে গিয়ে দেশের জন্য অনেক কিছু নিয়ে এসেছেন। বাস্তবে যত বিদেশি মুদ্রা খরচ করে তিনি বিদেশ সফর করেছেন তার ভাগও দেশের জন্য বিনিয়োগ হিসাবে আনতে পারেননি।
ক্ষমতায় এসে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ দিয়ে আত্মনির্ভরতার প্রচার শুরু করেছিলেন। আজও সেটা প্রচারই থেকে গেছে। আত্মনির্ভরতার বদলে বিদেশি নির্ভরতা বরং বেড়েছে। মোদীর নেতৃত্বে বিকশিত ভারতে আমদানি বেড়ে রপ্তানি কমেছে। বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। বৈদেশিক লেনদেনে ক্রমাগত ঘাটতি বাড়ছে। শেয়ার বাজারে নতুন বিদেশি লগ্নি হচ্ছে না। উলটে আগের লগ্নি তারা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষ বিনি‍‌য়োগেও খরা। মোদী ঘনিষ্ঠ ভারতীয় শিল্পপতিরা ভারতে বিনিয়োগের থেকে বিদেশে বিনিয়োগে উৎসাহ। আমেরিকায় অভিবাসনে কড়াকড়ি, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ফলে সঙ্কটের জেরে বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের দেশে পাঠানো বিদেশি মুদ্রার পরিমাণ কমে গেছে। এই অবস্থায় দেশবাসীকে দেশপ্রেম শেখানো আর মেলোডি ছাড়া কী-ই বা করার আছে।

Comments :0

Login to leave a comment