নতুনপা
শারদ ১৪৩৩
গল্প : কালো জাদু
সুকান্ত মন্ডল
৭ নভেম্বর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
এক গভীর জঙ্গলের বুক চিরে থাকা এক পরিত্যক্ত শ্মশান। আজ কালীপুজোর অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার রাত। সেই শ্মশানের এক কোণে একটা পুরোনো রাধাচূড়া গাছের নিচে পিঁড়ি পেতে বসেছে তান্ত্রিক শিবানন্দ। সামনে জ্বলছে লাল প্রদীপ, ছিটানো রয়েছে সিঁদুর আর বেলপাতা। আর প্রদীপের ঠিক আলো-আঁধারিতে মুখোমুখি রাখা দুটো বস্তু—একটা মানুষের পুরোনো শুষ্ক মাথার খুলি—যার কপালের মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে এক বড় করে ছোঁয়ানো সিঁদুরের লাল টিপ, আর তার ঠিক পাশেই রাখা একটা কালো বিড়ালের শুকিয়ে যাওয়া খাঁচা-হাড়।
চারপাশ নিঝুম। তান্ত্রিক তখন সিদ্ধির লাল জল গিলে চোখ বুজে কী যেন মন্ত্র জপ করছে।
ঠিক সেই নীরবতার মাঝে, প্রদীপের লাল শিখাটা একটু কেঁপে উঠতেই যেন দুটো মৃত সত্তার মধ্যে এক অস্ফুট কথা শুরু হলো।
কালো বিড়ালের হাড়টা হালকা নাড়া দিয়ে মানুষের খুলিটাকে জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁ রে ভাই, তুই তো মানুষ ছিলি। বল তো, মরে গেলে তো মানুষের দেহ হয় চিতায় পুড়ে ছাই হতে হয়, নয়তো কবরের মাটিতে মিশে যেতে হয়। তাহলে তোর এই খুলিটা চিতা বা কবর পেরিয়ে সোজা এই তান্ত্রিকের আস্তানায় এল কী করে? তোকে তাহলে পোড়ানো বা কবর কেউ দেয়নি?”
খুলিটা একটা শুকনো ঠোঁটহীন হাসির শব্দ তুলে দাঁতের কর কর শব্দ করে বলল, “সেটাই তো আসল রহস্য রে ভাই! আমি যখন মারা গিয়েছিলাম, সেটা কি লরির চাকায় পিষে, না কি অন্য কোনোভাবে—তা আর আমার স্পষ্ট মনে নেই! হয়তো কোনো রাতে রাস্তায় মরে পড়েছিলাম, নয়তো বা কোনো অচেনা জায়গায় লাশটা অবহেলায় পড়ে ছিল। জীবিত অবস্থায় আমি ঠিক কে ছিলাম, আমার কোনো জাত বা পরিচয় কিচ্ছু আমার আজ আর মনে নেই। পূর্বজন্ম বা জীবদ্দশার কিচ্ছু আমার আর মনে পড়েনা। শুনেছি মানুষ যখন জীবিত থাকে তার তো আর পূর্বজন্মের কথা মনে থাকে না, তাই মৃত্যুর পরও বা আমার কীভাবে মনে থাকবে যে জীবিত অবস্থায় আমি কী ছিলাম! তবে আমার এই খুলিটার আকার দেখে বোঝা যায় যে আমি একসময় মানুষ ছিলাম! মানুষ হয়তো আমাকে বেওয়ারিশ লাশ বলে মর্গে ফেলে দিয়েছিল, কিংবা কোনো পরিত্যক্ত মাঠে পড়ে পচেছিল দেহটা। সৎকারের বা দাফনের কোনো পাটই আমার কপালে জোটেনি।”
বিড়ালের হাড়টা অবাক হয়ে বলল, “তাহলে তোর এই মাথার খুলিটা পেল কোথায়?”
খুলিটা তিক্ত গলায় হেসে বলল, “পাবে কোথায় আর! এই তান্ত্রিকের দল হয়তো রাতের অন্ধকারে কোনো কবর খুঁড়ে এই কঙ্কাল বা খুলি জোগাড় করে আনে। বেওয়ারিশ মরা মানুষের অবিকৃত খুলিগুলো হয়তো এভাবেই হাতবদল হয়ে তাদের আস্তানায় এসে পৌঁছায়। টাকার লোভ আর ব্যবসার চক্রে মানুষ মৃতদেহ নিয়েও যে কত কী করে, তা আর নতুন কী!”
বিড়ালের হাড়টা একটা শুকনো শ্বাস ফেলে বলল, “কী অদ্ভুত নিয়ম দুনিয়ার! বেঁচে থাকতে যাদের কোনো খোঁজ কেউ রাখেনি, মৃত্যুর পর তাদের এই হাড়-খুলিগুলোই আবার এই মানুষগুলোর ব্যবসার বড় পুঁজি হয়ে ওঠে।”
এমন সময় তান্ত্রিক শিবানন্দ চোখ লাল করে চেঁচিয়ে উঠল, “জয় মহাকাল! খুলি ও হাড় জাগো! কালো জাদু সিদ্ধ হোক!”
কিন্তু তাদের ওপর যখন তান্ত্রিক মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিল, তখন প্রদীপের কাঁপতে থাকা লাল শিখায় মনে হলো—ওই নিঝুম রাতে মৃত হাড় আর খুলি যেন মানুষটির এই অন্ধ ভণ্ডামির খেলা দেখে নীরব হাসিতে ফেটে পড়ল!
Comments :0