Najrul Islam

কবি নজরুল ও তৎকালীন রাজনীতি

সম্পাদকীয় বিভাগ

জিয়াদ আলী
নজরুল শুধু সাহিত্য ও সঙ্গীত সৃষ্টির মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেননি। তাঁর লেখক জীবনের শুরু থেকেই তিনি সাম্যবাদী চেতনার মাধ্যমে দেশবাসীকে নতুন দিশা দেবার চেষ্টা করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ধর্মত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আপসপন্থী মনোভাব কাটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন নতুন ধরনের লেখালেখির মাধ্যমে। দেশপ্রেমের কবিতা ও গান লিখেছেন বিস্তর। একাধিক পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকও ছিলেন। সম্পাদকীয় মন্তব্য, প্রবন্ধ লিখে পরাধীন ভারতবর্ষকে অগ্নিমন্ত্রে জাগিয়ে তোলেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসেও স্বাধীনতার ও শোষণমুক্ত সমাজের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে বার বার। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর জনসভাতে গিয়ে দেশপ্রেমের গান গেয়েছেন। দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আগুন ঝরানো সুর সৃষ্টি করে জঙ্গি ও তেজীয়ান ভাব এনে দিয়েছেন।
নজরুলের জীবনের এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না। আমাদের দে‍‌শের যে-সব লেখক শিল্পীরা পরাধীন ভারতে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের প্রায় সকলেই বিদেশি ব্রিটিশ শাসকদের শাসন আর শোষণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন কোনও না কোনোভাবে। নজরুল সেই প্রতিবাদকে প্রতিরোধ যুদ্ধের জঙ্গি চেতনায় প্রাণবন্ত করেন।
মাইকেল মধুসূদন ছিলেন উনবিংশ শতকের প্রথম সচেতন চলিত গদ্য লেখক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতারও সূচনা করেন। তাঁর ভিতরেও ছিল স্বাদেশিক চেতনা। দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, বিহারীলাল, রঙ্গলাল, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মানিক, সুকান্ত সকলেই লেখক হিসাবে দেশবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু নজরুলের মতো কেউ-ই সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারেননি বা শ্রমের মহিমা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি।
নজরুল ছিলেন একেবারে সোজাসুজি রকমের রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য। রবীন্দ্রনাথকে তিনি মনে মনে গুরু হিসাবে পুজো করতেন। রবীন্দ্রনাথের উদার মানবিকতার আদর্শ নজরুলকে পুষ্ট করে তোলে। গানে, কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে অভিভাষণে ও সামাজিক সংগঠন-কর্মে রবীন্দ্রনাথ দেশের ও বিদেশের লাঞ্ছিত, অবহেলিত, উপেক্ষিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন যে গভীর জীবনবোধ থেকে সারা পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার।

তবে লেখক জীবন ছাড়াও নজরুলের জীবনের আরও বর্ণময় দিক ছিল। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি সৈনিক হিসাবে যুদ্ধের রণকৌশল শিখেছিলেন। এ ঘটনা বাঙালি আর কোনও কবির জীবনে ঘটেনি। ১৯১৭ থেকে তিন বছর করাচির সেনা শিবিরে থাকার সুবাদে নজরুল নানান দেশের মানুষের জীবন সংগ্রামের তাপ-উত্তাপে নিজেকে পুষ্ট করে তোলার সুযোগ পান। নতুন‍‌ চৈতন্যে শাণিত হয়ে ওঠে।
অবিস্মরণীয় বর্ণময় ব্যক্তিত্ব ছিল নজরুলের। উনিশশো বিশ-তিরিশ যুগের বঙ্গবাসীকে তিনি মাতিয়ে তোলেন তার সাহিত্য, সঙ্গীত ও রাজনৈতিক জ্ঞানের দ্বারা।

চুরুলিয়া হলো সাঁওতাল পরগনার গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া অজয় নদীর আর এক পাড়ে গড়ে ওঠা গরিব অনার্য মানুষের গ্রাম। গাঁয়ের প্রায় সব জমিই জোতদারের দখলে। জন মজুর খাটা বাউরি মানুষগুলো আধখানা ছেঁড়া গামছার মতো কানি-কাপড় পরে দিন কাটায়। দু’বেলা পেটে ভাত জোটে না। অথচ জোতদার পরিবারের সুখ আহ্লাদের শেষ নেই। কয়লা তোলা খনির মজুর আর রেলপথে কাজ করা কুলিরা কঠোর শোষণে কাতর। এইসামাজিক অসাম্য ও অসম ব্যবস্থাই নজরুলের বালক বয়সের মনকে অস্থির করে তোলে। এই অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যই তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায় অন্য এক পৃথিবী, ভিন্নতর স্বাধীন শোষণহীন মাতৃভূমির সন্ধানে। 
ব্যক্তিগত জীবনের দারিদ্র নয়, না খেতে পাওয়াও নয়, চাকরির জন্যও নয় এই অস্থিরতাই তাঁকে করে তোলে কাল্পনিকতার কারিগর, দুরন্ত এক রোমানটিক স্বপ্ন সৈনিক। এই টানেই তাঁর পথ চলা। গতানুগতিকতার ছক ভেঙে। 

নজরুলের কিশোর কালের দিনগুলোও আন্দোলিত হতে থাকে স্থায়ী প্রধান মানুষজনের মুখে শোনা ব্রিটিশ-বিরোধী একরকম বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনার টানাপোড়েনে।

নজরুলের মানবিক চাঞ্চল্যকে উসকে দিয়েছিলেন তাঁর সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের শিক্ষক বিপ্লবী নিবারণচন্দ্র ঘটক। তাঁরাই ১৯১৬-১৭ সালে বাঙালি যুবকদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনিতে ঢুকে অস্ত্রবিদ্যা শেখার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের রণকৌশল শিখে বাঙালি যুবকেরা দেশপ্রেমের টানেই একদিন হাতের বন্দুক ঘুরিয়ে ধরবে ব্রিটিশ শাসকদের দিকে।
নজরুলের রোমান্টিক আবেগ ঠিক এমনটাই চাইছিল। ১৯১৭ সালে বন্ধু শৈলজা নন্দকে নিয়ে দু’জন মিলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য নাম লেখালেন এই উদ্দেশেই। নজরুলের বয়স তখন ১৮ বছর।
সুভাষচন্দ্র বসুও মাত্র ১৬ বছর বয়সে এ রকম বৈপ্লবিক আবেগে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম লেখান। তখন তিনি পড়তেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সুভাষচন্দ্র ছিলেন বনেদি বড়লোক বাড়ির সন্তান। সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় নজরুল প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বা অভাবের তাড়নায়‌ চাকরির জন্যই যে যুদ্ধের সৈনিক হয়েছিলেন বলে কেউ কেউ মন্তব্য করে থাকেন, এ তথ্য একেবারেই ভ্রান্ত। তখন বাংলার বিস্তর যুবক দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধের রণকৌশল শেখার জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ‍‌যোগ দিয়েছিলেন। প্রখ্যাত অভিনেতা শিশির ভাদুড়ি মহাশয়ের ভাইও নজরুলের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেন।
সেনা বাহিনির নিযুক্তি পরীক্ষায় সুভাষচন্দ্রের নাম বাতিল হয়ে যায়। কারণ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ছিল ক্ষীণ। শৈলজানন্দের ব্রিটিশের খেতাব পাওয়া বড়লোক রায় বাহাদুর দাদু কৌশল করে মেডিক্যাাল পরীক্ষায় শৈলজানন্দকে আনফিট সাব্যস্ত করিয়ে নেন। কে জানে সুভাষচন্দ্র যদি সেদিন সেনাবাহিনীতে ঢুকতে পারতেন, তাহলে ভারতের মাটি থেকেই হয়তো তিনি মঙ্গল পান্ডের মতো সেনাবিদ্রোহ ঘটানোর চেষ্টা করতেন। এর জন্য ১৯৪১ সালে গোপনে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে তাঁকে দেশত্যাগ করতে হতো না। কিংবা জার্মানির হিটলার বা জাপানের প্রধানমন্ত্রী তেজোর কাছে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য তাঁর সাহায্য চাইবার দরকারও পড়তো না।
তবে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হবার পর স্কটিশচার্চ কলেজে পড়ার সময় সুভাষচন্দ্র টেরিটোরিয়াল আর্মি ফোর্সে ভর্তি হন। তাঁর ‘ভারত পথিক গ্রন্থে’ এ নিয়ে সুভাষচন্দ্র লিখেছেন:
আমাদের রাইফেল আনার জন্য আমরা প্রথম যেদিন ফোর্টউইলিয়ামের ভেতর কুচকাওয়াজ করে ঢুকলুম, সেদিন অদ্ভুত এক ধরনের তৃপ্তিবোধ আমাদের হয়েছিল। যেন আমরা এমন একটা কিছুর দখল নিচ্ছি যাতে আমাদের জন্মগত অধিকার আছে। অথচ যা থেকে আমাদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।’
সুভাষচন্দ্র বয়সে নজরুলের চাইতে দু’বছর বড় ছিলেন। কিন্তু ১৯২১-এর পর তাঁরা দু’জনেই স্বাধীনতা সংগ্রামে চিত্তরঞ্জন দাশের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। সুভাষচন্দ্র সভা-সমিতি করতে গেলে নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সভা শুরু হতো নজরুলের আগুন ঝরা গান দিয়ে। তারপর সুভাষচন্দ্র বক্তৃতা করতেন। সুভাষচন্দ্র লিখেছেন নজরুলের গান শুনে জেলের ভিতরেও তিনি চাঙ্গা হয়ে উঠতেন।

কিশোর বয়স থেকেই নজরুলের মনে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার আবেগ জন্ম নেয়। নজরুল ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি‍‌ রেজিমেন্টের সৈনিক হিসাবে করাচির সেনানিবাসে ছিলেন ১৯১৭-১৯২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। এই সেনা নিবাস থেকে তিনি রাশিয়ার ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। করাচির সেনানিবাসে বসেই ‘ব্যথা দান’ ও ‘হেনা’ দু’খানা গল্প ‍ লেখেন। সে গল্পের রুশ বিপ্লবের ‘লালফৌজ’র মহিমা প্রাধান্য পায়। ভারতীয় সাহিত্যের সেই প্রথম  রুশ বিপ্লবের আবেগ প্রতিফলিত হয় এবং তার নজরুলের হাত দিয়ে।
১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙে দেয় ব্রিটিশ সরকার। নজরুল কলকাতায় ফিরে আসে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে মুজাফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে ১৯২০ মার্চ থেকে সাম্যবাদী দল গঠনের চেষ্টা করেন। জনমত তৈরির জন্য ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই নজরুল ও মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সম্পাদনায় বের হয় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকা। তাঁরা মনে করতেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে শ্রমজীবীরা।
শ্রমিক শ্রেণির মানুষরাই যেমন হয়েছে রুশ দেশে তাদের পাশে থাকবে দেশের অগণিত কৃষক। তাই ‘নবযুগ’ পত্রিকায় দেশ-‍‌বিদেশের শ্রমিক ও কৃষকদের লড়াইয়ের খবরকে তাঁরা প্রাধান্য দেয়।  চলতি মুখের কথায় লেখা হতো সেই কাগজে ‍‌বিষয় ও শৈলীতে ‘নবযুগ’ এক নতুন ইতিহাস। মৌলিক উদ্ভাবনা বাংলা সংবাদ পত্রের ইতিহাস সে।
শুধু লেখাজোকা মধ্যেই নজরুলের স্বাধীনতা আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সক্রিয়ভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে থাকেন। শ্রমিক বস্তিতে গিয়ে ঘরোয়া সভা-সমিতিতে অংশ নিতেন।
১৯২১ সালের এপ্রিল মাস। তখন ব্রিটেনের যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলস ভারত ভ্রমণে আসেন। যুবরাজের ভারত আগমনকে কেন্দ্র করে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। হরতাল পালিত হয়। নজরুল তখন দেওঘর থেকে ফিরে এসে কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে প্রমীলা সেনগুপ্তদের বাড়িতে অবস্থান করছেন। নজরুল কু‍‌মিল্লা শহরে গলায় হারমনিয়াম ঝুলিয়ে দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হন।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসেই নজরুল কলকাতায় ৩/৪ তালতলা লেনের বাড়িতে বসে লেখেন ‘বি‍‌দ্রোহী’ কবিতা। সেও বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক মৌলিক সৃষ্টি। চিত্তরঞ্জন দাস  তখন কারাগারে। তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুরোধে ঐ সময়ে  নজরুল লেখেন ‘কারা ভাঙার গান’। চিত্তরঞ্জন দাশের ‘বাংলার কথা’তে ‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট।’  পঙ্‌ক্তি সংবলিত গান খানা  প্রকা‍‌শিত হয়।
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুল একেবারে সশস্ত্র বিদ্রোহের ধ্বজা  তুলে বের করলেন অর্ধ্ব সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা। ঐ পত্রিকায় খোলাখুলিভাবে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেওয়া হয়। ১৯২১ সালে উত্তর প্রদেশের চৌরি চৌরায় ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে উৎক্ষিপ্ত জনতার রোষে আগুনে পুড়ে কয়েকজন পু‍‌লিশ মারা যায়। গান্ধীজীর একদম পছন্দ ছিল না  এরকম রক্তাক্ত সংঘর্ষ। তিনি চৌরি চৌরায় আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। গান্ধীজীর এ আচরণে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকও খুবই ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। তিনি  সমালোচনা করেন গান্ধীজী আর কংগ্রেসের অহিংসাবাদী কার্যকলাপের। শরৎচন্দ্র তখন হাওড়া ‍ জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি।  শরৎচন্দ্রের কথা হলো শুধু চরকা দিয়ে স্বাধীনতা আসবে না। চাই যুদ্ধ করা সৈনিক।
স্বভাবতই নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাও ভয়ানকভাবে উৎক্ষিপ্ত হয়ে ‍ ওঠে। ১৩ অক্টোবর তারিখে ধূমকেতু প‍‌ত্রিকার একাদশ সংখ্যায় নজরুল লিখ‍‍‌লেন : ‘‘ সর্ব প্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ টরাজ বুঝি না; কেন না ওই কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে লেখেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও।
বিদেশিদের অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনও বিদেশির ... অধিকার পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে শাসন করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন। তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা পুঁটলি বেঁধে সাগর পাড়ে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তারা শুনবেন না। তাঁদের এতটুকু সুবুদ্ধি হয়‍‌নি এখনও। আমাদেরও এই প্রার্থনা করার। ভিক্ষা করার কূবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।’
ভারতবর্ষে লেখক হিসাবে শুরুতেই প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি লিখিতভাবে এরকম পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। অথচ ইংরেজ সরকারের আইনে এভাবে পূর্ণ স্বাধীনতার কথা শুধু মুখে উচ্চারণ করেছিলেন বলে তার আগের বছর ১৯২১ সালে মওলানা হসরত মোহানীর বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের আদেশ জারি হয়েছিল। নজরুল সেকথা জানতেন। তবুও দুঃসাহসিকতার ডানায় ভর করে নজরুল পূর্ণ স্বাধীনতার কথা কাগজে-কলমে লিখে প্রকাশ করতে ভয় পাননি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তখন তিন ধরনের মতবাদ খুবই প্রাধান্য পেতে থাকে। মডারেট, একসট্রিসিস্ট ও টেরোরিস্ট। গান্ধীজী ১৯১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর মডারেট পন্থী অহিংস-অসহযোগ মতবাদ সম্পর্কে ভারতের ইংরেজ সরকার ততটা উদ্বিগ্নতা অনুভব করতো না। বরং ইংরেজ সরকার তাদেরই বেশি ভয় পেত যারা বোমা পিস্তল দিয়ে ইংরেজ রাজ কর্মচারীদের গোপনে বা প্রকাশ্যে খুন করার চেষ্টা করতে থাকে। তখন ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লব-এ ১৯১৭-র রুশ বিপ্লবের মতো সশস্ত্র বৈপ্লবিক কার্যকলাপ ও ভারতীয় রাজনীতিতে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই অভিযোগেই ইংরেজ সরকার ১৯২৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে কমিউনিস্ট-বিরোধী প্রচার চালাতে থাকে।
নজরুলের অন্যতম সুহৃদ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকেও এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ১৯২৪ সালে।
কিন্তু তার আগেই ধূমকেতু পত্রিকার ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ তারিখের সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমন’ নামে একটা শ্লেষাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগে নজরুলের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের করে ইংরেজ সরকার। ঘটনাটা এতই গুরুত্ব লাভ করে যে ইউরোপ থেকে মানবেন্দ্রনাথ রায় চিঠি লিখে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকে প্রস্তাব দেন নজরুলকে ইউরোপে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। তাতে পু‍লিশের হাতে ধরা পড়া থেকে নজরুল বেঁচে যেতে পারেন বলে মানবেন্দ্রনাথ অভিমত প্রকাশ করেন। 
নজরুল সেই প্রস্তাব গুরুত্ব দেননি। শুধু কলকাতা ছেড়ে তখন নজরুল কুমিল্লায় চলে যান। কুমিল্লা থেকেই নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর তারিখে। নজরুলকে কুমিল্লার জেলখানায় একটা রাত কাটাতে হয়। সেখান থেকে কলকাতা নিয়ে এসে নজরুলকে আনা হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। সুইনহোর কোর্টে তাঁর বিচার শুরু হয়। বিচারালয়ে ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি তারিখে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নজরুল যখন জেলখানায় সে সময়ে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের লেখা ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যমালা উৎসর্গ করেন নজরুলের নামে। এ ঘটনায় বোঝা যায় নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাকে রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন। তা না হলে ইংরেজ সরকারের কারাগারে বন্দি একজন কবির নামে রবীন্দ্রনাথ একখানা বই উৎসর্গ করতে সাহস পেতেন না। এ ঘটনা থেকে রবীন্দ্রনাথেরও দুঃসাহসিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
নজরুল হুগলী জেলে ৩৯ দিন অনশন আন্দোলন করেন বন্দিদের সঙ্গে জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে। তখনও রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নৈতিকভাবে সমর্থন জানান। পরে নজরুলের বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ শিলঙ থেকে নজরুলের নামে একটা টেলিগ্রাম পাঠালেন তাতে তিনি বলে give up hunger strike, our literature claims you.
নজরুল শুধু কবিতা লেখা ও সঙ্গীত রচনার জন্য রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য হয়ে ওঠেননি। নজরুলের ... স্বতঃস্ফূর্ততা ও আপসহীন স্বাধীনতার লড়াই রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। এই আপসহীন মনোভাবের জন্যই রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রের জন্য গান্ধীজীকে চিঠি লেখেন এবং গান্ধী-সুভাষ বিরোধের প্রেক্ষিতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ এক ঘণ্টার ওপর গোপন আলোচনায় মিলিত হন।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার অগ্রগামী ধারক ও ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে আপসহীন নির্ভীক সৈনিক হিসাবে নজরুলের ব্যক্তিত্ব অতুলনীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর হয়ে আছে। তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অভিভাষণ ও গান এখনও শোষণহীন সমাজ গঠনে ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে মানবিক অনুপ্রেরণার অতুলনীয় সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিকতাকে নতুনতর ব্যঞ্জনা ও উপকরণে ঋদ্ধ এবং সম্প্রসারিত করতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment