Jammu and Kashmir

ভিক্ষে করে হলেও আমি তোমার ঘর বানাবো, আরফাজকে জমির কাগজ দিয়ে ঘোষণা কুলদীপের

জাতীয়

‘‘ভিক্ষে করে হলেও আমি তোমার জন্য একটা ঘর বানাবো। হিন্দুদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার ষড়যন্ত্র কখনও সফল হবে না। আমাদের ভ্রাতৃত্ব চিরকাল থাকবে। তোমার সন্তানদের উন্নতি হোক।’’ সাংবাদিক আরফাজ আহমদ ডাইংয়ের হাতে জমির নথিপত্র তুলে দিয়ে এ কথা বললেন কুলদীপ শর্মা। তখন তাঁর চোখ ভর্তি জল। জম্মুর জুয়েলের বাসিন্দা কুলদীপ শর্মা সমাজকর্মী। জম্মুরই নওয়ালের চান্নি কলোনির বাসিন্দা সাংবাদিক আরফাজের বাড়ি সম্প্রতি বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মোদী-শাহদের হাতে থাকা প্রশাসন। তাই আরফাজের হাতে নিজের জমি তুলে দিলেন কুলদীপ। এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা জম্মুতে সম্প্রীতির অনন্য নজির তৈরি করলেন কুলদীপ শর্মা। বিশেষ করে যখন দিল্লি বিস্ফোরণের জেরে কাশ্মীরের মুসলিমদের ফের সাধারণভাবে সন্ত্রাসবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খুবই সংগঠিতভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, তখন কুলদীপ-আরফাজের এই অনন্য বন্ধুত্বের কথা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজ মাধ্যমে। 
বৃহস্পতিবার বুলডোজার দিয়ে ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে আরফাজের। সম্প্রতি আরফাজ একটি খবর করেন জম্মুর পুলিশ কর্তা এবং মাদক পাচারকারীদের যোগসাজশ নিয়ে। জম্মু ইস্টের একজন এসডিপিও-কে সম্প্রতি বদলি করা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে সীমান্তপার একটি বড় মাদক পাচার চক্রকে ধরে নিরাপত্তা বাহিনী। আরফাজ খবর করেন, সম্ভবত ওই চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ আছে ওই এসডিপিও’র। গত ২৬ তারিখ ওই এসডিপিও-কে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও কেন্দ্রের হাতে থাকা জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসন অভিযোগ অস্বীকার করে। পরের দিনই আরফাজের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। 
আসলে বাড়িটি ৭২ বছরের গুলাম কাদরি ডাইংয়ের। জম্মু ডেভেলপমেন্ট অথরিটি তাঁর একতলা বাড়িটি বুলডোজারে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পরে ধ্বংসস্তূপের উপরে রাখা তক্তপোষে অসহায়ভাবে তাঁর বসে থাকার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। বৃহস্পতিবার তাঁর বাড়িটি প্রশাসন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরে যেন গুলাম কাদরির জীবনের বৃত্ত পূর্ণ হলো। ১৯৯০ -এর দশকে কাশ্মীরে যখন সন্ত্রাসবাদ ক্রমশ বাড়ছে, সেই সময়ে ডোডার ভালেসা থেকে বড় ছেলেকে নিয়ে ২০০ কিমি দূরের জম্মুতে পালিয়ে এসেছিলেন কাদরি। আশঙ্কা ছিল সন্ত্রাসবাদীরা তাঁর থেকে ছেলেকে কেড়ে নেবে। বাধ্য করবে তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদে যোগ দিতে। যেমন এলাকার অন্য যুবদের বাধ্য করেছিল সন্ত্রাসবাদীরা। সেই মানুষটাকে শীতের দিনে বুলডোজারে ঘর ছাড়া করল মোদী-শাহের প্রশাসন। এই ঘটনার খবর এবং ছবি সোশাল মিডিয়ায় দাবানলের থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়। শুধু কুলদীপ সিং নন, প্রতিবেশীরা ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে ঘটনার নিন্দা করে আরফাজদের পাশে দাঁড়ান। পরিস্থিতি এতটাই বিরুদ্ধে চলে যায় যে, শুক্রবার বিজেপি নেতা রবীন্দ্র রায়নাকে ছুটে আসতে হয় গুলাম কাদরির বাড়িতে। হাস্যকরভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় আরফাজদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার কথা জানান। সিপিআই(এম) নেতা মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি সাংবাদিক আরফাজের ঘর বুলডোজার দিয়ে ভাঙার ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, কোনও আগাম নির্দেশ না দিয়ে সাংবাদিকের বাড়ি ভাঙা হয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ রমন ভাল্লাও দেখা করতে আসেন তাঁদের সঙ্গে। 
এদিন গুলাম কাদরি ডাইংয়ের ভাঙা বাড়ির পাশে জড়ো হওয়া প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ৩৫ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন গুলাম কাদরি। এতদিন মনে হয়নি তাঁর বাসস্থানের জমিটি সরকারি জমি? তারাই জানিয়েছেন, যে ছেলেকে নিয়ে জম্মুতে পালিয়ে এসেছিলেন গুলাম কাদরি, সেই ছেলে এখন জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের কর্মী। ভেঙে দেওয়া ঘরের ইট-পাথরের উপরে বসে পুরানো সেই দিনের কথা এদিন শুনিয়েছেন কাদরি। ‘‘সেটা ৯১-৯২ সাল। পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু ছেলে ফিরেছে। দলবেঁধে তারা বিভিন্ন বাড়িতে হানা দিয়ে সুঠাম ছেলেদের জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসবাদে। আমার ছেলের তখন যদিও মাত্র ১২ বছর বয়স। কিন্তু লম্বা-চওড়া চেহারা।’’ এক হিন্দু প্রতিবেশীর জমিতে মুদি দোকান চালাতেন গুলাম কাদরি। সেই দোকান ছেড়ে, স্ত্রী ও অন্য দুই সন্তানকে ছেড়ে বড় ছেলেকে বাঁচাতে সাইকেলে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েন একদিন। কাদরির কথায়, ‘‘৩০ কিলোমিটার রাস্তা সাইকেল চালিয়ে থাথরিতে আসি। সেখান থেকে জম্মুর বাসে চড়ি। হাতে ২০০-৩০০ টাকার বেশি ছিল না। সেটা নিয়ে জম্মুর নারওয়াল মাণ্ডিতে আসি। ভাড়ায় একটা ঘর নিয়ে চটের বস্তাও ভাড়ায় নিয়ে আসি। তারমধ্যেই ছেলেকে নিয়ে শুতাম।’’ স্মৃতিতে ডুবে প্রৌঢ় কাদরি জানালেন পুরনো জম্মু শহর থেকে মাত্র ৫কিমি দূরে হলেও তখন এই এলাকায় হাতেগোনা কয়েকজনই থাকতেন। চারপাশে জঙ্গল ঘেরা। এমনকি সবজি এবং ফলের নারওয়াল মান্ডিও তৈরি হয়েছে পরে। বাড়িওয়ালা ঘর ছাড়তে বলার পরে এক সময় খোলা আকাশের নিচে থেকেছেন বাবা-ছেলে। যেখানে এখন নারওয়াল থানা তৈরি হয়েছে। চাল কিনে দুই জনের জন্য খোলা আকাশের নিচেই খাবার বানিয়েছেন। এরপরে একটি ঠেলা কিনে তার উপরে খাবার তৈরি করে বিক্রি করেছেন। একটা সময়ে ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে তাঁকে দেখে ক্রমে ক্রমে আরও একশো-দেড়শো ঠেলাওয়ালা দোকান করেছেন। তারপর ওখানেই থিতু হয়েছিলেন কাদরি। দুই সন্তান সহ স্ত্রীও ডোডা থেকে চলে এসেছিলেন নারওয়ালেই। ক্রমে জমি কিনে ঘর বানিয়েছিলেন। এখন এত বছর পরে সেই জমি সরকারি আর বাড়ি বেআইনি বলে ভেঙে দিয়েছে জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসন। 
স্থানীয়দের অসন্তোষ আঁচ করে বিজেপি দাবি করছে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নির্দেশে এই কাজ হয়নি, ওমর আবদুল্লা সরকার এই কাজ করেছে। যদিও এর পাল্টা ওমর বলেছেন, তার সরকারকে বদনাম করতে এলজি এই কাজ করছেন। এই টানাপড়েনের মধ্যে যদিও মানুষ দুষছেন বিজেপি সরকারকেই। সেইরকমই একজন কুলদীপ এবং তাঁর মেয়ে তানিয়া শর্মা। তাঁরা বললেন, এইভাবে রাতারাতি কারোকে গৃহহীন করা যায়! দেশের নাগরিক হওয়ার পরেও মানুষকে ঘরহারা করা হচ্ছে। এরপরে তীব্র ক্ষোভের সঙ্গেই কুলদীপ বলেছেন, রাজনৈতিক প্রোপাগ্যান্ডার পরেও, হিন্দু-মুসলিমের লড়াই লাগানোর পরেও জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কুলদীপকে জড়িয়ে ধরে আরফাজের বাবা গুলাম কাদরি বললেন, আমার দুশ্চিন্তা নেই। এইভাবে সবাই আমার পাশে আছে। হাজার হাজার মানুষ আমার ছেলেকে সমর্থন করছেন। এটাই আমার কাছে অমূল্য। আর আমার কী চাওয়ার থাকতে পারে? আজকের ঘটনা দেখাচ্ছে জম্মু-কাশ্মীরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখনও অটুট। আমার ছেলে যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতো, তাহলে প্রাসাদ বানাতে পারতো। এইরকম ছোট্ট ঘরে আমরা থাকতাম না। আমার ছেলে দেশের সংবিধানের জন্য সর্বস্ব দিয়েছে। এটাই আমার গর্ব।

Comments :0

Login to leave a comment