যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা আসলে শিক্ষাঙ্গণে আক্রমণের গোটা মতাদর্শের অঙ্গ। তার লক্ষ্য গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ। ভিন্ন মত জানানোর অধিকারের ওপর আক্রমণ। এ রাজ্যে বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের এই আক্রমণের মোকাবিলায় সব অংশকে একত্রিত করতে হবে বামপন্থীদেরই।
বুধবার কলকাতায় যাদবপুরে বামপন্থী দলগুলির কনভেনশন থেকে এই লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কনভেনশন শুরুর আগে সুকান্ত সেতু এবং পল্লীশ্রী থেকে দুই মিছিল যাদবপুর এইট-বি বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়।
কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার। বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য শতরূপ ঘোষ, সিপিআই(এম-এল) লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার, আরএসপি নেত্রী সর্বাণী ভট্টাচার্য, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা সফিউল হোসেন, সিপিআই নেতা সৈকত গিরি, এসইউসিআই’র পক্ষে তরুণ নস্কর।
বক্তব্য রাখেন যাদবপর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এআইডিএসও’র রেশমিতারা খাতুন, এআইএসএ’র বর্ষা বড়াল, এসএফআই’র অভিনব বসু।
কল্লোল মজুমদার বলেন, ‘‘মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে হবে বামপন্থীদের, সেই কারণেই আজকের এই কনভেনশন।’’ তিনি বলেন, ‘‘ছাত্র শিক্ষকদের ওপর যে আক্রমণ নামিয়ে এনেছে তা রাতের অন্ধকারে করা হচ্ছে। এই যে শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে পদদলিত করার চেষ্টা তার বিরুদ্ধেই আজকের এই কনভেনশন।’’
শতরূপ ঘোষ বলেন, ‘‘এর আগে এক দল লেনিনের মূর্তি ভাঙতে এসেছিল যাদবপুরে। তাদের নিজেদের দলই ভেঙে গিয়েছে। আর বিজেপির ঘোষিত শত্রু লেলিন।’’
বিজেপি নেতারা বলছেন, ভারতের জন্য কী করেছে লেনিন। সে প্রসঙ্গে শতরূপ বলেছেন, ‘‘ভারতের অবিচ্ছেদ্য বন্ধু ছিল লেনিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্বাধীনতার সময় থেকে নতুন ভারতের নির্মাণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভূমিকা রেখেছিল। তার উদাহরণ বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট। কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একথা বলেছিল লেনিনের সোভিয়েত।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের বলছে ‘দিমাগি নকশাল’। আমাদের তো ‘দিমাগ’ আছে, তোমাদের কী আছে।’’
তাঁর মন্তব্য, ‘‘পাচিল টপকে বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে এসেছিল। মেধার ঘরে গাধারা ঢুকলে পাচিল টপকে ঢুকতে হয়।’’ তিনি বলেন, ‘‘যারা সিসিটিভি লাগানোর দাবিতে সরব ছিল আজ তারাই ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করছে না।’’
‘বন্দে মাতরম‘ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘একজন আরএসএস নেতার নাম বলুন যিনি বন্দে মাতরম বলে ফাঁসিকাঠে গেছিলেন। এদের আমরা ভয় পাই না।’’ তিনি বলেন, ‘‘ফুটপাতে দুধ ফোটাচ্ছিলেন মা। তাঁর পেটে লাথি দিলেন মন্ত্রী আগ্নিমিত্রা পাল।’’ তিনি বলেন, ‘‘ওদের ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই। চারদিন আগে যাকে লাথি মেরেছিল তাকেই ঘর গড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সবাই এক হলে মোদী সরকারকেও আমরা হটাতে পারব।’’
সর্বানী ভট্টাচার্য বলেন,
বামফ্রন্টের সময়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল তাকে কোথায় নামিয়ে আনা হয়েছে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। মেধার উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট কারা খুলে দিল তা আমরা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু সেই ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি সরকারকে। হামলায় সহায়তা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক। প্ররোচনা দিয়েছেন যাদবপুরের বিধায়কাই।’’ তিনি বলেন, ‘‘শুভেন্দুবাবু জানেন না কেন যাদবপুর তৈরি হয়েছিল। যাদবপুর বা জেএনইউ-তে মেধা কেনা যায় না, মেধা তৈরি করা হয়। তাই জন্যই ওরা আজ শিক্ষাঙ্গণের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনে।’’
শইফুল হোসেন বলেন, ‘‘একের পর এক শিক্ষাঙ্গণে আক্রমন নামিয়ে আনছে। তাঁরা শিক্ষার উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে যাতে ধর্মের শাসন কায়েম করা যায়। যেভাবে আমাদের মনীষীদের আক্রমন চলছে তার নিন্দা জানাচ্ছি।’’
সৈকত গিরি বলেন, ‘‘যাদবপুর প্রশ্ন করতে শেখায়। আমরা জানতাম যাদবপুরের শিক্ষার্থীরা যত প্রশ্ন করবে তত রাজনৈতিক উৎকর্য বাড়বে। আর বিজেপি বাহিনী মেধার দখল নিতে চায়, কারণ যাতে ইসরোকে আদানির হাতে তুলে দিতে চায়, পেট্রোলে ইতানল যাতে বিনা প্রশ্নে মেশানো যায়। আর প্রশ্ন তুললেই দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘যাদবপুরের বিধায়িকার বিরুদ্ধে হামলায় মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী ২টো কলেজের পরিচালন সমিতিতে বসালেন। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থন রয়েছে।’’ তিনি বলেছেন যে আজ যারা বিরোধীদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলছে তাদের জানা দরকার যে শুভেন্দু অধিকারী মাওবাদী হামলায় সঙ্গী ছিলেন। বহু বামপন্থীদের হত্যা করেছে মাওবাদীরা।
অভিজিৎ মজুমদার বলেন, যাদবপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে , তা জেএনইউ, জামিয়া মিলিয়া-তেও দেখা গেছে। তখন বিজেপির এক নেতা পড়ুযাদের গুলি করতে বলেছিলেন। যাদবপুর , প্রেসিডেন্সি আমাদের গর্ব।’’
তিনি বলেন, ‘‘লেনিনের মূর্তিতে গেরুয়া আবির দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তা আটকানো হয়েছে। এই ধরনের আক্রমণ বারবার আসবে এটা সত্যি। বিজেপি-আরএসএস’র এর পিছনে বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। সেটা তারা ধর্মের মাধ্যমে করছে। সেকথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার।
বুলডোজার রাজ , মব লিঞ্চিং , এনকাউন্টার রাজ এগুলোই তাদের চরিত্র। ’’
Comments :0