Editorial

বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই

সম্পাদকীয় বিভাগ

কর্পোরেট পুঁজি আর বৃহৎ মিডিয়ার সাহায্যে বিজেপি এবং তৃণমূলের নেতাদের সংগঠিত বহু রোড শো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দেখেছেন। পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘেরা সেই রোড শো’র বৈভব প্রদর্শন দূর থেকে দেখার মতোই বটে। কিন্তু শনিবার থেকে রাজ্যে শুরু হয়েছে এক অন্য ধরনের যাত্রা। সিপিআই(এম)’র উদ্যোগে কোচবিহারের তুফানগঞ্জ থেকে বের হয়েছে বাংলা বাঁচাও যাত্রা, যা হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে আগামী ১৭ ডিসেম্বর কলকাতার উত্তরে কামারহাটিতে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। হেলিকপ্টার নেই, এয়ার কন্ডিশন টেন্ট নেই, তবুও মানুষের দেওয়া ছোট ছোট অর্থ সাহায্যে, মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণেই বাংলা বাঁচাও যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আলপথ থেকে নদীপথ, একেক জেলায় একেক এলাকায় একেক রকমভাবে পথ এগবে বাংলা বাঁচাও যাত্রা, বহুমাত্রিক হবে তার প্রচার। অজস্র সভা, মিছিল, সমাবেশ, মহা সমাবেশ, ডিজিটাল প্রচার সহ স্থানীয় ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকেও বাহন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে যাত্রার বার্তা। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি থেকে শুরু করে চা শ্রমিকদের দাবি, বিড়ি শ্রমিকদের দাবি, গিগ ওয়ার্কারদের দাবি, কৃষক খেতমজুরদের দাবি, মহিলাদের দাবি সহ পরিবেশ ও বাস্ততন্ত্রকে বাঁচানোর দাবি করা হবে বাংলাকে বাঁচানোর জন্য। মূল যাত্রার পাশাপাশি জেলাগতভাবেও স্থানীয় এলাকাভিত্তিক দাবি তুলে যাত্রা হবে, আবার জেলাভিত্তিক যাত্রা মূল যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হবে। শুধু সমস্যা তুলে ধরাই নয়, মানুষের মধ্য থেকেই বিকল্প ভাবনা তুলে এনে এই যাত্রা বাম গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকেও উত্থাপন করবে।
এইখানেই বাংলার রাজনীতিতে সিপিআই(এম)’র বাংলা বাঁচাও যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। একদিকে রাজ্যের মানুষের জীবন-জীবিকা দুর্বিষহ, রোজগারহীন তো বটেই, শিক্ষা স্বাস্থ্যের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি তীব্র আক্রমণের মুখে। এসআইআর ঘিরে রাজনীতিতে ভোটাধিকার পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ায় মানুষ হয়রান, উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। অথচ কেন্দ্রের শাসকদল এবং রাজ্যের শাসকদল সেই সুযোগে নিজেদের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৌশলে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণে ব্যস্ত। জনজীবনের মূল বিষয়গুলি থেকে নজর ঘোরাতে মন্দির মসজিদ, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী, বাঙালি-অবাঙালি ইত্যাদি ঘিরে ঘৃণা বিদ্বেষের প্রচার চলছে। লুট দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থী থেকে গরিব গ্রামবাসীদের প্রতারণায় ডুবিয়ে রেখে জেল থেকে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসছে নেতা মন্ত্রীরা। এই রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে তৃণমূল এবং বিজেপি নেতাদের স্বার্থসিদ্ধি হতে পারে, বাংলার মানুষ বাঁচার মতো করে বাঁচতে কোনোভাবেই পারবেন না। মানুষকে এই জাঁতাকলে রেখেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে দুই দক্ষিণপন্থী শাসকদল। 
কিন্তু বাংলা বাঁচাও যাত্রা যদি জনজীবনের মূল বিষয়গুলিকে রাজনৈতিক পরিসরের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে এবং এগুলি ঘিরে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে তাহলে লড়াইয়ের ময়দানটাই পালটে যাবে। মেরুকরণের রাজনীতি বজায় রাখতে বিজেপি এবং তৃণমূল নেতারা বারবার ‘খেলা’ দেখানোর হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু বাংলা বাঁচাও যাত্রায় শামিল হয়ে বাংলার মানুষ সেই খেলার মাঠটাই পালটে দিলে তৃণমূল বা বিজেপি’র পক্ষে খেলা মুশকিল হয়ে যাবে। বাংলার মানুষ যদি লাল ঝান্ডা হাতে আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে, বাংলার রাজনীতিতে যদি বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটে তাহলে ঐ দুই দলের সাজানো লড়াই জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবেই। বাংলা তখন আবার দেশকে বাঁচার পথ দেখাতে পারবে।

Comments :0

Login to leave a comment