অরিজিৎ মণ্ডল: শ্রীরামপুর
শেষ এক দশকে আমাদের দেশ তথা রাজ্যে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট রয়েছে। অন্যদিকে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির ফলে বাড়ছে ‘ড্রপ আউট‘। সেখানেও ছাত্রীদের সংখ্যাই বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যৌন হেনস্তা, নিগ্রহের মুখে প্রতিদিন পড়তে হচ্ছে মেয়েদের। তার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হবে এসএফআই-কেই।
এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ছাত্রী কনভেনশনে উদ্বোধনে একথা বললেন অধ্যাপক ডঃ স্বাতী মৈত্র। স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীনা দাস, কল্পনা দত্তদের উত্তরসূরী হয়ে আজকের দিনের লড়াইয়ে ছাত্রীদের ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হুগলীর শ্রীরামপুরে এই ছাত্রী কনভেনশন সংগঠিত হচ্ছে। শনিবার এই কনভেনশনের শুরুতে সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন এসএফআইয়ের রাজ্য সভাপতি প্রণয় কার্য্যী। কনভেনশনে উপস্থিত রয়েছেন এসএফআই সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক শিল্পা সুরেন্দ্রন। শহীদ স্মরণ ও শোক প্রস্তাব পাঠ করে এদিন কনভেনশন শুরু হয়।
কনভেনশনে সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেন এসএফআই রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সোনালী মজুমদার।
উদ্বোধনী ভাষণে স্বাতী মৈত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের ভূমিকা বিস্তার ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, "স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে মূলত বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। লাঠি খেলা, যোগব্যায়াম, সাঁতার কাটার মধ্যে দিয়ে তাঁরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে মেয়েরা। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাসরা একদিকে যেমন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, অন্যদিকে নারী মুক্তির সংগ্রামেও মেয়েদের সংগঠিত করার কাজ চালাচ্ছিলেন।
আজ তাঁদের শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাঁদের লড়াই আত্মস্থ করতে হবে জীবনের সঙ্গে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের ছোট করে দেখানোর প্রবণতা বরাবরই রয়েছে। সমান অধিকারের লড়াই লড়তে হবে আজকে ছাত্রীদেরও।
তিনি বলেন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং শ্রেণি আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি মিলে গিয়ে নারী শোষণের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু হয়। আমরা সেই উত্তরাধিকার বহন করছি, এটা মনে রাখতে হবে। ছাত্র রাজনীতির পরিসর অনেক বৃহৎ। ভাবনার পরিসরও আমাদের বড় করতে হবে। সমাজের সমস্ত সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা, জেদ তৈরি করতে হবে ছাত্রীদেরও।
অধ্যাপক মৈত্র বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০‘-তে স্নাতক স্তর চার বছরের হয়ে যায়। সেখানে ড্রপ আউট বাড়ছে তৃতীয় বছরের পর। ড্রপ আউটের মধ্যে ছাত্রীদের হার বেশি। তাঁদের পাশেও দাঁড়াতে হবে। কঠিন সময়ে ছাত্র রাজনীতিকে বন্ধুত্বের বুনিয়াদ, রাজনীতির বুনিয়াদ দৃঢ় করতে হবে। তবেই এই কনভেনশন সার্থক হবে।
সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পেশ করতে গিয়ে সোনালী মজুমদার বলেছেন, এই ছাত্রী কনভেনশন কোনও আনুষ্ঠানিকতা নয়। আজকের দিনে আমাদের কাছে বড় বিপদ এই যে মনুবাদী আরএসএস বিজেপি রাজ্যেও সরকারে আসীন হয়েছে। আরএসএস-এবিভিপি’র মনুবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন রূপ তৈরি করার জন্য আমরা কনভেনশনে মিলিত হয়েছি। এবিভিপি ইতোমধ্যেই নিদান দিতে শুরু করেছে যে স্লিভলেস জামা পরে কলেজের ভেতর আসা যাবে না। মেয়েরা ছাত্র রাজনীতি করবে না। এই মানসিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ক্যাম্পাসে বিচ্ছিন্ন করতে হবে এই শক্তিকে। মেদিনীপুর কলেজ, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন কলেজে কিভাবে এবিভিপি-র বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছে আলোচনা হবে কনভেনশনে। সেই লড়াই থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্যের সমস্ত ক্যাম্পাসে ব্যারিকেড তৈরি করতে হবে।
সোনালী বলেছেন, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও শুধুমাত্র প্রান্তিক এলাকার মেয়েরাই নয়। শহরাঞ্চলেও নারীরা হেনস্তার শিকার হচ্ছে। যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মুখ ফুটে প্রতিবাদও করতে পারছেন না অনেকে। এদের প্রত্যেকের স্বর হতে হবে এসএফআই-কে। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে রাস্তাঘাট, এমনকি বাড়ির ভেতরেও অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা নিরাপদ নয়। এই ছাত্র কনভেনশন মেয়েদের মন খুলে কথা বলার পরিসর তৈরি করবে। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আইসিসি (ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি) নির্বাচনের জন্যও লড়াই করতে হবে।
Comments :0